কবিতা          :         অধরোষ্ঠের নীচে শেকলবন্দী জীবন
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ইং

কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘অধরোষ্ঠের নীচে শেকলবন্দী জীবন’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

অধরোষ্ঠের নীচে শেকলবন্দী জীবন || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
অধরোষ্ঠের নীচে শেকলবন্দী জীবন || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


অধরোষ্ঠের নীচে শেকলবন্দী জীবন || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


যে তোমাকে বাঁচার অনুমতি দিল না, আবার মরার মুক্তিও দিল না—
তাকে তুমি খুঁজে ফেরো ভাঙা পেন্ডুলামের ছায়ার ভিতর,
যেখানে সময় দাঁড়িয়ে থাকে যেন পরিত্যক্ত ভ্যাটিকানের এক পুরোনো ঘন্টাধ্বনি।
তাকে খুঁজতে গিয়ে তুমি উঠে পড়ো শুকনো ক্যাটাকোম্বের মুখে,
যেখানে প্রতিধ্বনি পর্যন্ত কঙ্কালের দাঁত হয়ে ঝরে পড়ে।
তোমার আঙুলের ডগায় জমে থাকা স্মৃতির ছাই ছুঁয়ে গেলে
পুরোনো গথিক চার্চের জানালার মতো রঙিন হয়ে ওঠে তার মুখ—
কখনো ল্যাভেন্ডারের বিষণ্ণ গন্ধে,
কখনো মধ্যরাত্রির ঠান্ডা তুষারবাতাসে।
তোমার চোখের পাতায় আঁচড় কেটে চলে যায় অদৃশ্য এক অ্যামাজন,
আর সেই নদীর ঢেউয়ে ভাসতে থাকে তার নাম—
একটা অর্ধেক উচ্চারণ, একটা অসমাপ্ত অভিশাপ,
যেন গ্রিক মন্দিরের ভাঙা স্তম্ভে খোদাই হওয়া অর্ধেক ভবিষ্যৎ।
অলিভ পাতায় নয়, এবার তাকে তুমি খুঁজে পাও পোড়া চিঠির কিনারায়,
যেখানে আগুনও শেষ পর্যন্ত সব শব্দকে হত্যা করতে পারে না।
কাগজের শিরা হয়ে তোমার হাতের রেখা ছড়িয়ে পড়ে—
রক্তের মতো নয়, বরং বরফের মতো স্বচ্ছ ও ধারালো,
যেন নরওয়ের গ্লেসিয়ারের ভিতর বন্দী প্রাচীন কোনো আর্তনাদ।
সে রেখা তোমাকে টেনে নেয় এক ভেনিসের খালের দিকে,
যেখানে দাঁড় টানে কেবল ক্লান্ত নাবিক,
আর জল বয়ে চলে কারও অনুপস্থিতির নোনা গন্ধ নিয়ে—
যেন আটলান্টিকের ঢেউয়ে ভাসমান এক মৃত প্রেমপত্র।
সমুদ্রতীরের শহরে সন্ধ্যাগুলো কাঁধে করে বয়ে আনে কুয়াশার কফিন,
মেট্রোর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে ভেঙে যায় প্রার্থনার মেরুদণ্ড।
কাঁচের টাওয়ারগুলো দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দ—
যেন নিউ ইয়র্কের আকাশে পেরেক ঠোকা শোক।
একটা ড্রাগনফ্লাই নয়—
এবার তোমার কপালের দিকে উড়ে আসে লন্ডনের এক ধূসর পাখি,
তার ডানায় লেখা থাকে অস্থিরতা,
তার চোখে জমে থাকে সম্পর্কের সীসার মতো ঠান্ডা বিষ।
একটা মার্বেলের মূর্তির কাছে এসে তুমি থেমে যাও—
সেই পাথরটা যেন কারও জিভ,
যে আজও উচ্চারণ করতে পারেনি তোমার নাম,
যেন রোমান কোলসিয়ামের ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা শেষ আর্তচিৎকার।
সেই চিরগোধূলির দেশ—
যেখানে দিন আর রাত পরস্পরের গলা টিপে বাঁচে,
সেখানে পড়ে থাকে অরোরা-বোড়িয়ালিসের রঙমাখা মহাশূন্য,
রঙের নাম নেই—কেবল শ্বাসের ছাপ আছে,
যেন মহাকাশে জমে থাকা কোনো নীল নীরবতার ধুলো।
সেই শূন্য তোমার নখের যোগ্য নয়,
তবু তোমার বুকের ভিতর সে ঝরে পড়ে
লোহার কাঁটার মতো, ছাইয়ের তুষারের মতো।
পরিত্যক্ত কটেজ, ভাঙা কেবিন, ধসে পড়া অ্যাপার্টমেন্ট—
দরজা-জানলা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,
ভেতরে পড়ে থাকে ফেলে দেওয়া কোটের মতো কিছু স্মৃতি—
যেখানে মানুষ ছিল, অথচ মানুষ নেই।
মাঠে নয়—
এখানে ঘাসের উপর শুয়ে থাকে জন্মের ছায়া,
তার কাঁধে জমে থাকে শৈশবের ধুলো,
তার পায়ে আটকে থাকে মায়ের মুখের আধখানা আলো,
যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো প্যারিসিয়ান পোস্টকার্ড।
তোমার এলোমেলো চুল কে আর দেখে?
এই পৃথিবী তো চোখ রাখে কেবল পালিশ করা কফিনের দিকে,
কেবল ঝকঝকে সমাধিফলকের দিকে।
তুমি যখন হাসো—হাসিটাও কাঁদে,
যখন কাঁদো—কান্নাটাও মরতে পারে না।
তোমার চুলে আটকে থাকে আকাশের গুটিকয়েক ধূসর পালক,
তারা তোমাকে দেখে পালায়,
কারণ তোমার কপালে লেখা থাকে একটানা অনাহার—
যেন আফ্রিকার খরার মানচিত্র তোমার কপালে আঁকা।
সে রেখেছে এঁকে জানালার এক পাশে তোমার মৃত্যু,
আরেক পাশে অক্ষর-জীবন।
মৃত্যুটা সেখানে নিঃশব্দ, পরিচ্ছন্ন,
সাদা কাফনের মতো নয়—
বরং হাসপাতালের সাদা করিডোরের মতো,
যেখানে আলোও রোগীর মতো নিঃশ্বাস ফেলে।
কিন্তু জীবনের অক্ষরগুলো কাঁপে,
তাদের গায়ে লেগে থাকে পুরোনো ওয়াইনের গন্ধ,
তারা ভাঙা টাইপরাইটারের মুখে কাঁদতে থাকে
যেন প্রতিটি শব্দই শেষবারের মতো ছাপা হচ্ছে।
তোমার চোখের ভিতর তখন রাত ঢুকে পড়ে
কোনো পুরোনো কোর্টরুমের সাক্ষীর মতো,
সে বলে—
তোমার বেঁচে থাকা অপরাধ,
তোমার মরে যাওয়াও অপরাধ।
তোমার শ্বাসগুলোকে তাই আটকে রাখা হয়েছে
অদৃশ্য শিকলের গিঁটে গিঁটে,
যেন বন্দী জাহাজের কারাগারে রাখা সমুদ্র।
যে তোমাকে বাঁচতেও দিল না, মরতেও দিল না—
তাকে তুমি কোন অধরোষ্ঠে তুলে বাজাও তৃষ্ণার বীণা?
কোন ঠোঁটে তুলে রাখো সেই বিষাক্ত স্মৃতি,
যা চুমুর মতো লাগে—কিন্তু আসলে ব্লেড?
যেন গ্লাসের উপর ছুটে আসা ঠোঁট
আর ভেতরে ভেতরে কেটে ফেলা রক্তের নদী।
তুমি কি তাকে ডেকে বলো—
এসো, আমার শিরার ভিতর বসে থাকো,
আমার বুকের ভিতর ঘুমিয়ে পড়ো,
আমার সমস্ত ভালোবাসাকে ধ্বংস করে
আমার শূন্যতাকে সাম্রাজ্য বানাও?
যে তোমাকে বাঁচতে দেয়নি, মরতেও দেয়নি—
সে কি মানুষ?
নাকি সে এক আসক্তি,
এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসের কারাগার,
একটা অসমাপ্ত নাম—
যার শেষ অক্ষরটা এখনও তোমার গলায় আটকে আছে
কাঁটার মতো,
প্রার্থনার মতো,
অভিশাপের মতো,
যেন ইউরোপের কোনো পুরোনো কবরস্থানে
ভাঙা লাতিন শিলালিপির শেষ শব্দ।


আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন