কবিতা : জলছায়ার দক্ষিণে কামনাকবর
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘জলছায়ার দক্ষিণে কামনাকবর’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| জলছায়ার দক্ষিণে কামনাকবর || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
জলছায়ার দক্ষিণে কামনাকবর || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
বাড়ির ঠিক পাশ ঘেঁষে কেটে যাচ্ছিল দু’খানা কালো বিড়াল—নিঃশব্দ অথচ রাজকীয়, যেন অন্ধকারের দুইটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা। আর তাদের একটু দূরে, গলির ভাঙা বাতাসে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল একখানা বাদামি রঙা কুকুর—কি মহামোহ মুখখানা তার!
মনে হচ্ছিল, শত শতাব্দী পরে সে কারো চোখে চোখ ফেলেছে—আর সেই চোখের ভিতর দিয়ে একখানা পুরনো পৃথিবী ফিরে এসেছে।
ঠিক তখনই, হুট করে হাতে থাকা বাটিটা গড়িয়ে গেল।
মাটিতে পড়ে থাকা শব্দটা ছিলো যেন আমার ভিতরের কোনো হাড় ভেঙে যাওয়ার আওয়াজ। বহুদিন হলো আমার ডান হাতের অসারতা বেড়েছে—কখন যে হাতটা আমার নষ্ট হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না।
যা ইচ্ছে তাই হয়, আর যা হয়—তার দায়ও যেন আমার ঘাড়েই এসে বসে।
বাটিটা গড়াতেই দু’খানা কালো বিড়াল আর একখানা বাদামি কুকুর একইসাথে খেতে আরম্ভ করলো।
একই বাটিতে তিনটা প্রাণ, তিনটা ক্ষুধা—তিনটা ভিন্ন পৃথিবী।
তবে আরম্ভের শুরুতেও কিছু বিষয়ের আরম্ভ থাকে—কিছু অভিশাপ, কিছু আশীর্বাদ, কিছু অদৃশ্য ইশারা।
আমি এগোলাম…
দু পা এগোতেই দেখি গলির মোড়ে জল জমেছে।
গত রাতের বৃষ্টি বোধ হয়।
কিন্তু এই জল শুধু বৃষ্টির ছিলো না—এটা ছিলো পুরনো কান্নার জমাট স্মৃতি, পায়ের নিচে পড়ে থাকা গোপন দীর্ঘশ্বাস।
জলে চোখ যেতে না যেতেই দেখি—
দু’খানা কালো বিড়াল আর একখানা বাদামি কুকুরের ঠিক দক্ষিণ দিক বরাবর হুট করে জলের ছটায় আরেকখানা অলিভ রঙের অবয়ব ভেসে উঠলো।
কেমন যেন অচেনা… তবু চেনা।
একটা ছায়া, একটা শরীর, একটা নামহীন আত্মা—জলের বুকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশ্বাস।
আমি তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ।
কিছু দৃশ্য বুঝতে সময় লাগে না—রক্ত লাগে।
বুঝলাম, ওটা জল না…
ওটা আমার ভিতরের কোনো পুরনো চিৎকারের প্রতিচ্ছবি।
আর তখনই আমার মনে হলো—
এই তিনটা প্রাণ আসলে ক্ষুধা নয়,
এরা আমার ভাগ্য, আমার শরীর, আমার পাপ—একসাথে খেতে বসেছে।
কালো বিড়াল দুটো যেন আমার অন্ধকার চিন্তা,
আর বাদামি কুকুরটা—আমার নিষ্পাপ আকাঙ্ক্ষা,
যে আজও ভালোবাসতে চায়, অথচ জানে না কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম।
আমার ডান হাত কাঁপছিল।
আমার চোখের ভিতর জল ছিল, কিন্তু সেটা বৃষ্টির না।
আমি বুঝলাম—আমি আজও মানুষের মতো করে বাঁচতে পারিনি,
আমি আজও মানুষের মতো করে মরতে শিখিনি।
আর শেষমেশ, হঠাৎ করে মনে হলো—
আমি কোনো খাবার ফেলিনি,
আমি আসলে নিজের হৃদয়ের বাটি উল্টে দিয়েছি।
আর এই পৃথিবী—এই গলি—এই জল—এই তিনটা প্রাণ—
সবাই সেই হৃদয়ের পড়ে যাওয়া অংশ খেয়ে নিচ্ছে।
আমি তখন বুঝলাম,
আমি বেদনার তিলাওয়াত করে এসেছি কামনার মাজারে।
যেখানে প্রার্থনা আর পাপ একই কাতারে দাঁড়ায়,
যেখানে ক্ষুধা আর প্রেম একই থালায় খায়,
আর যেখানে মানুষ—নিজেকে হারিয়ে ফেলে
একটা অলিভ রঙের ছায়ার মতো…
জলের ছটায় ভেসে ওঠে, আবার মিলিয়ে যায়।
আর আমি?
আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকি—
একটা ভাঙা ডান হাত নিয়ে,
একটা জমে থাকা গলির জল দেখে,
আর নিজের ভিতরের মাজারে
নিঃশব্দে কবর দিই আমার শেষ স্বাভাবিকতাটুকু।
আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন