উপন্যাস        :         তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে
লেখিকা        :          নৌশিন আহমেদ রোদেলা
গ্রন্থ             :         
প্রকাশকাল   :         
রচনাকাল     :         

লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলার “তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশিত হবে। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি তার ফেসবুক পেজে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা

তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা (পর্ব - ৬)

বিকেলের পর থেকেই আকাশের রং বদলে যেতে শুরু করেছিলো। ধূসর মেঘগুলো যেন ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে একটা অশুভ অন্ধকারের জন্ম দিচ্ছে, আর সেই অন্ধকারের ছায়া এসে পড়ছে তপোবনের প্রতিটি গাছের গায়ে, প্রতিটি জানালার কাঁচে, এমনকি মানুষের মনেও।

বাড়ির ভেতর অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না, কিন্তু প্রত্যেকেই জানে—আজকের রাতটা আর পাঁচটা রাতের মতো হবে না।

তপু নিজের ঘরে বসে আছে। টেবিলের উপর ছড়ানো খাতা, কলম, আর সেই ঘুঙুরটা—যেটা সে আবার তুলে এনেছে। মিতু অনেকবার নিষেধ করেছে, কিন্তু তপু শুনেনি। বরং আরও মনোযোগ দিয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঘুঙুরটা নিঃশব্দে পড়ে আছে, কিন্তু তপুর মনে হচ্ছে—এটা নিঃশব্দ না। খুব গভীরে কোথাও যেন একটা চাপা শব্দ হচ্ছে… যেন কারো হাঁটার ছন্দ… কারো অপেক্ষা।

তপু ধীরে ধীরে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিলো ঘুঙুরটা।

মুহূর্তের মধ্যে শরীরের ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো।

চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠলো আগুন, দৌড়, আতঙ্ক…

কিন্তু এইবার দৃশ্যটা আরও পরিষ্কার।

মেয়েটা শুধু দৌড়াচ্ছে না—সে কারো নাম ধরে ডাকছে।

“রুদ্র ভাইয়া… বাঁচাও…”

তপুর বুক ধক করে উঠলো। চোখ হঠাৎ খুলে গেলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

“রুদ্র…” — সে ফিসফিস করে বললো।

মানে—
রুদ্র ওই ঘটনার অংশ ছিলো।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো মিতু। তার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।

“তপু, আমি তোকে বলেছি এটা ছুঁয়ো না—”

কথা শেষ করার আগেই থেমে গেলো সে। তপুর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে ফেললো—কিছু একটা হয়েছে।

“তুই আবার কিছু দেখেছিস?”

তপু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।
“এইবার মেয়েটা… রুদ্র ভাইয়ার নাম ধরে ডাকছিলো।”

মিতুর মুখের রং পাল্টে গেলো।
“মানে?”

“মানে… রুদ্র ভাইয়া শুধু ওই ঘটনার মতো দেখতে না… সে ওই ঘটনার অংশ ছিলো।”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বাইরে হঠাৎ বজ্রপাত হলো, আলো এসে ঝলসে দিলো জানালার কাঁচ।

মিতু ধীরে ধীরে বললো,
“আমাদের এখনই রুদ্র ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করতে হবে।”

তপু তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো।
“তুমি ভুলে যাচ্ছো—এখানে কোনো নেটওয়ার্ক নেই।”

“তাহলে বড় মামাকে বলতে হবে—আজই শহরে যেতে হবে।”



(ঢাকা — একই সময়)

রুদ্র আজ অস্বাভাবিকভাবে অস্থির।

ঘরের ভেতর পায়চারি করছে। সিগারেটের পর সিগারেট শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা কমছে না।

মারিয়া চুপচাপ তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ রুদ্র থেমে গেলো। মাথা চেপে ধরলো দুই হাতে।

“শুরু হয়ে গেছে…” — দাঁতে দাঁত চেপে বললো সে।

মারিয়া এগিয়ে এলো এক পা।
“কি শুরু হয়েছে?”

রুদ্র ধীরে ধীরে মাথা তুললো। চোখ লাল, ক্লান্ত, কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর এক সত্য জমে আছে।

“আমি ভেবেছিলাম… আমি ওকে রেখে চলে আসলে সব শেষ হয়ে যাবে।”

সে হেসে উঠলো—একটা শূন্য, তিক্ত হাসি।

“কিন্তু ও অপেক্ষা করছিলো… এতদিন ধরে।”

“কে?” — মারিয়ার গলা এবার আগের চেয়ে একটু নরম।

রুদ্র ধীরে ধীরে বললো—

“ওর নাম ছিলো… নিশি।”

ঘরের বাতাস জমে গেলো।

“ও ছিলো ওই জঙ্গলের একমাত্র মানুষ… যে আমাকে বিশ্বাস করেছিলো।”

রুদ্র জানালার দিকে তাকালো, যেন অনেক দূরের কোনো সময় দেখছে।

“সেদিন… আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম—আমি ফিরে আসবো।
আমি ওকে নিয়ে যাবো ওই জঙ্গল থেকে।”

তার গলা কেঁপে উঠলো।

“কিন্তু আমি ফিরিনি…”

মারিয়া চুপ করে শুনছে।

“আর ও…”
রুদ্র চোখ বন্ধ করলো।

“ও একা পড়ে গিয়েছিলো ওদের হাতে।”



(তপোবন — রাত)

রাত নেমেছে।

আজকের রাতটা আগের চেয়ে আরও ভারী। বাতাসে এক ধরনের গন্ধ—পচা পাতা, ভেজা মাটি, আর… অজানা কিছু।

তপু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে সেই ঘুঙুর।

মিতু পেছনে দাঁড়িয়ে, স্পষ্ট ভয় নিয়ে।

“তপু… প্লিজ, এটা করিস না।”

তপু ধীরে ধীরে বললো,
“আজ ও আসবে।”

“তুই কীভাবে এত নিশ্চিত?”

তপু উত্তর দিলো না।

ঠিক তখনই—

রিম… ঝিম… রিম… ঝিম…

ঘুঙুরের শব্দ।

এইবার আরও স্পষ্ট, আরও কাছে।

দু’জনেই স্থির হয়ে গেলো।

জঙ্গলের অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটা ছায়া।

ছোট্ট… ভেজা… মাথা নিচু।

ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে।

তপুর বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু সে পিছু হটলো না।

মিতু কাঁপা গলায় বললো,
“তপু… ভেতরে আয়…”

কিন্তু তপু দাঁড়িয়ে রইলো।

ছায়াটা আরও কাছে এলো।

তারপর—

ধীরে ধীরে মুখ তুললো।

একই ফাঁকা চোখ।

একই কান্না জমে থাকা মুখ।

কিন্তু এইবার—

সে সরাসরি তাকালো তপুর দিকে।

আর খুব ধীরে, খুব ভাঙা কণ্ঠে বললো—

“রুদ্র… কোথায়…?”

তপুর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো।

মিতু চিৎকার করে উঠলো—
“তপু!”

কিন্তু তপু যেন সম্মোহিত।

সে এক পা এগিয়ে গেলো।

“তুমি… নিশি?”

ছোট্ট অবয়বটা মাথা কাত করলো।

তারপর—

হঠাৎ করেই তার মুখ বিকৃত হয়ে গেলো।

চোখের শূন্যতা রক্তিম হয়ে উঠলো।

আর এক অমানবিক চিৎকারে বলে উঠলো—

“ও আমাকে রেখে গেছে!!!”

এক মুহূর্তে বাতাস প্রচণ্ড হয়ে উঠলো। গাছগুলো কাঁপতে লাগলো। লন্ঠনের আলো নিভে গেলো।

অন্ধকারের ভেতর শুধু শোনা গেলো—

ঘুঙুরের বিকৃত, দ্রুত শব্দ…

আর এক শিশুর ভয়ংকর কান্না।

চলবে ...

৭ম পর্ব পড়তে এখানে ট্যাপ/ক্লিক করুন


লেখক সংক্ষেপ :
তরুণ লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। তবে জানতে পারলে তা অবশ্যই কবিয়াল পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন