উপন্যাস        :         তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে
লেখিকা        :          নৌশিন আহমেদ রোদেলা
গ্রন্থ             :         
প্রকাশকাল   :         
রচনাকাল     :         

লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলার “তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশিত হবে। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি তার ফেসবুক পেজে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা

তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা (পর্ব - ৭)

রাতটা যেন হঠাৎ করেই উন্মত্ত হয়ে উঠলো।

বাতাসের গতি এক মুহূর্তে কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। চারপাশের গাছগুলো এমনভাবে দুলতে শুরু করলো যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তাদের শেকড় ধরে ঝাঁকাচ্ছে। বারান্দার কাঠের দরজা, জানালার কাঁচ—সবকিছু কেঁপে উঠছে এক অদ্ভুত, অশুভ ছন্দে। লন্ঠনের আলো বহু আগেই নিভে গেছে। এখন চারপাশে কেবল অন্ধকার… আর সেই অন্ধকারের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক।

তপু দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই জায়গাতেই—যেখানে কয়েক মুহূর্ত আগে সে নিশিকে দেখেছে।

কিন্তু এখন—কেউ নেই।

শুধু হাওয়া।

আর সেই ভয়ংকর নীরবতা।

মিতু দৌড়ে এসে তপুর হাত ধরে টান দিলো,
“ভেতরে আয়! এখনই ভেতরে আয় তপু!”

তপু যেন কিছুক্ষণ বুঝতেই পারছিলো না সে কোথায় আছে। তার চোখ এখনও স্থির, নিস্তব্ধ, যেন সে এখনও সেই ফাঁকা চোখের দৃষ্টি থেকে বের হতে পারেনি। নিশির সেই প্রশ্ন—“রুদ্র কোথায়?”—বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তার কানে।

“তপু!” — এবার প্রায় চিৎকার করে উঠলো মিতু।

তপু চমকে উঠলো। যেন ঘোর ভাঙলো। সে ধীরে ধীরে পেছনে সরে এলো, তারপর হোঁচট খেতে খেতে ভেতরে ঢুকে পড়লো।

দরজা বন্ধ করতেই বাইরে থেকে হঠাৎ একটা তীব্র শব্দ হলো—
ধাম!

মনে হলো কেউ যেন দরজায় আছড়ে পড়লো।

মিতু আতঙ্কে কেঁপে উঠলো। দু’হাত দিয়ে তপুর বাহু চেপে ধরে ফিসফিস করে বললো,
“ও… ও কি আমাদের ফলো করছে?”

তপু কোনো উত্তর দিলো না। তার মাথার ভেতর এখন অন্য কিছু ঘুরছে—
নিশি।
রুদ্র।
আর সেই প্রতিশ্রুতি—যেটা রাখা হয়নি।

কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে আবারও নীরবতা নেমে এলো। বাতাস ধীরে ধীরে শান্ত হলো। কিন্তু সেই শান্তি স্বস্তির না—বরং আরও ভয়ংকর। যেন ঝড় থেমে যাওয়ার পরের সেই মুহূর্ত, যখন বোঝা যায়—সবকিছু এখনও শেষ হয়নি।

তপু ধীরে ধীরে বললো,
“…ও আমাদের ক্ষতি করতে আসেনি।”

মিতু অবিশ্বাসে তাকালো,
“তুই কীভাবে এটা বলছিস? ওটা কী ছিলো দেখেছিস তুই?”

তপু এবার মিতুর দিকে তাকালো। তার চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।

“ও শুধু একটা জিনিস চায়—রুদ্র।”


(ঢাকা — গভীর রাত)

রুদ্র আজ আর ঘরের ভেতর থাকতে পারছে না।

সে বারবার দরজার দিকে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। যেন তার শরীর এখানে, কিন্তু মন অনেক দূরে—একটা জঙ্গলে, একটা অতীতে, যেটা থেকে সে কখনো বের হতে পারেনি।

মারিয়া এবার এগিয়ে এলো। তার স্বাভাবিক যান্ত্রিক ভাবের মাঝে আজ হালকা একটা কৌতূহল, এমনকি উদ্বেগও মিশে গেছে।

“আপনি যদি সব জানেন, তাহলে পালাতে চান কেন?” — শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো সে।

রুদ্র থেমে গেলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললো—

“কারণ আমি জানি… যদি আমি ওর সামনে আবার দাঁড়াই—
এইবার আমি বাঁচবো না।”

“ও মানে নিশি?”

রুদ্র মাথা নাড়লো না, কিন্তু তার চোখই সব বলে দিলো।

“আমি ওকে মেরে ফেলিনি…” — হঠাৎ বললো সে।

মারিয়া চুপচাপ শুনছে।

“কিন্তু আমি ওকে বাঁচাতেও পারিনি।”

তার গলা ভারী হয়ে এলো।

“সেদিন রাতে… আমি দেরি করে ফেলেছিলাম।”


(রুদ্রর স্মৃতি)

আষাঢ়ের রাত।
ঠিক আজকের মতোই বৃষ্টি।

জঙ্গলের ভেতর ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট নিশি—ভেজা, কাঁপা, কিন্তু চোখে বিশ্বাস।

“তুমি আসবে তো?” — কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেছিলো সে।

রুদ্র মাথা নেড়েছিলো।
“আমি কথা দিচ্ছি।”

নিশি হেসেছিলো।
সেই হাসিটা ছিলো নিষ্পাপ, বিশ্বাসে ভরা।

কিন্তু—

সেই রাতেই রুদ্রকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
সে ফিরতে পারেনি।

আর যখন ফিরেছিলো—

সব শেষ।

কুঁড়েঘর পুড়ে ছাই।
চারপাশে রক্ত।
আর সেই ঘুঙুর…


(বর্তমান — তপোবন)

রাত প্রায় শেষের দিকে।

তপু আর মিতু ঘুমায়নি। দু’জনেই বসে আছে। মাঝে মাঝে বাইরে তাকাচ্ছে।

হঠাৎ—

দূরে, জঙ্গলের ভেতর, একটা আলো দেখা গেলো।

হালকা… দপদপ করছে।

তপু চোখ সরু করলো।
“ওটা কী?”

মিতু কাঁপা গলায় বললো,
“আগুন?”

“না…” — ধীরে বললো তপু,
“ওটা… কারো হাতে ধরা আলো।”

দু’জনেই স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো।

আলোটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।

আর তার সাথে—

আবারও সেই শব্দ।

রিম… ঝিম… রিম… ঝিম…

কিন্তু এইবার শব্দটা একটার না।

একাধিক।

যেন অনেকগুলো পা একসাথে হাঁটছে।

মিতুর গলা শুকিয়ে গেলো।
“তপু… ও একা না…”

তপুর বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।

আলোটা আরও কাছে এলো।

এবার স্পষ্ট দেখা গেলো—

একটা না…

দুইটা না…

অনেকগুলো ছোট ছোট ছায়া।

সবাই একইভাবে হাঁটছে।
সবাইয়ের পায়ে ঘুঙুর।

আর তাদের মাঝখানে—

নিশি।

তপু ফিসফিস করে বললো—
“…ও একা ছিলো না কখনো।”

মিতুর চোখে আতঙ্ক জমে উঠলো।
“তারা কারা?”

তপু উত্তর দিলো না।

কারণ সে বুঝে গেছে—

এটা শুধু একটা মেয়ের গল্প না।

এটা একটা গণহত্যার গল্প।

হঠাৎ—

সবগুলো ছায়া একসাথে থেমে গেলো।

নিশি ধীরে ধীরে মাথা তুললো।

তার চোখ এবার সরাসরি তাকালো তপুর দিকে।

আর খুব ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বললো—

“ওকে নিয়ে আয়…”

তপুর শরীর কেঁপে উঠলো।

“…কাকে?”

নিশির ঠোঁট ধীরে ধীরে বাঁকলো।

একটা ভাঙা, বিকৃত হাসি।

“রুদ্রকে…”

চলবে ...

৮ম পর্ব পড়তে এখানে ট্যাপ/ক্লিক করুন


লেখক সংক্ষেপ :
তরুণ লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। তবে জানতে পারলে তা অবশ্যই কবিয়াল পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন