মুক্তমত         :        অস্তিত্বের মর্মমূলে কুঠারাঘাত: ২৫শে মার্চের বিদীর্ণ কালরাত্রি
লেখক           :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ 
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২৪ মার্চ, ২০২৬
রচনাকাল     :         ২৫ মার্চ, ২০২৬

অস্তিত্বের মর্মমূলে কুঠারাঘাত: ২৫শে মার্চের বিদীর্ণ কালরাত্রি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
অস্তিত্বের মর্মমূলে কুঠারাঘাত: ২৫শে মার্চের বিদীর্ণ কালরাত্রি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


অস্তিত্বের মর্মমূলে কুঠারাঘাত: ২৫শে মার্চের বিদীর্ণ কালরাত্রি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ



ইতিহাসের নির্মমতম অধ্যায়গুলোর মধ্যে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ এক অন্ধকার মহাকাব্য—যেখানে একটি জাতির অস্তিত্বকে পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিহ্ন করার নীলনকশা বাস্তবায়নের সূচনা হয়েছিল। এই রাত কেবল একটি তারিখ নয়; এটি ছিল বাঙালি জাতিসত্তার বিরুদ্ধে পরিচালিত এক সুসংগঠিত, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্ন প্রকাশ।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন উপলব্ধি করল যে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা আর কোনো প্রকার রাজনৈতিক প্রতারণা বা আইনি জালে আবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়, তখন তারা বেছে নেয় ইতিহাসের এক জঘন্যতম সামরিক অভিযান—‘অপারেশন সার্চলাইট’। এর লক্ষ্য ছিল সুস্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী: একটি জাগ্রত জাতির চেতনাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া, তার মেধা ও মননের উৎসগুলোকে নির্মূল করা, এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের সম্ভাবনাকেই অঙ্কুরে বিনষ্ট করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—যা ছিল বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রাণকেন্দ্র—সেই রাতেই পরিণত হয় হত্যাযজ্ঞের প্রধান মঞ্চে। ট্যাঙ্কের গর্জন, মেশিনগানের অবিরাম শব্দ, আর আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হতে থাকে জ্ঞান, যুক্তি ও মুক্তচিন্তার প্রতীকসমূহ। শিক্ষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে একটি জাতিকে মেধাশূন্য করে দেওয়ার যে অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তা ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দৃষ্টান্ত।

কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—নৃশংসতা কখনো স্থায়ী শাসনের ভিত্তি হতে পারে না। ২৫শে মার্চের সেই বর্বরতা বাঙালির চেতনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের আগুন জ্বালানোর অনুঘটক। রক্তে ভেজা সেই রাতের প্রতিটি আর্তনাদ, প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি শহীদের নিঃশ্বাস একত্রিত হয়ে রচনা করেছিল মুক্তির অনিবার্য অঙ্গীকার।

যে অন্ধকার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই অন্ধকারের গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে যে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হয়, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল ২৫শে মার্চের নৃশংসতার বিরুদ্ধে ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী জবাব।

আজ, এই দিনটি আমাদের জন্য কেবল শোকের নয়, আত্মসমালোচনারও। সেই রাত আমাদের শিখিয়েছে—একটি জাতির শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার চেতনায়; তার ভূখণ্ডে নয়, তার আত্মমর্যাদায়। তাই ২৫শে মার্চের স্মরণ মানে কেবল অতীতের ক্ষতচিহ্নে ফিরে যাওয়া নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতি এক দৃঢ় অঙ্গীকার—যেন কোনো অপশক্তি আর কখনোই এই বাংলার আকাশে অমানবিকতার কালো ছায়া বিস্তার করতে না পারে।

রক্তস্নাত সেই কালরাত্রি আমাদের ভীত করেনি; বরং আমাদের দাঁড়াতে শিখিয়েছে। সেই দাঁড়িয়ে ওঠার ইতিহাসই আজকের বাংলাদেশ—একটি অদম্য, অবিনাশী, এবং চিরপ্রতিরোধী জাতির নাম।




মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com



 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস



লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন