চিঠি        :          ইতিহাসের গর্ভ থেকে উচ্চারিত এক নাম: বঙ্গবন্ধু ও এক জাতির অন্তর্লিখিত আত্মকাব্য
প্রকাশকাল :     ১৭ মার্চ, ২০২৬


ইতিহাসের গর্ভ থেকে উচ্চারিত এক নাম: বঙ্গবন্ধু ও এক জাতির অন্তর্লিখিত আত্মকাব্য || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
ইতিহাসের গর্ভ থেকে উচ্চারিত এক নাম: বঙ্গবন্ধু ও এক জাতির অন্তর্লিখিত আত্মকাব্য || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ 



ইতিহাসের গর্ভ থেকে উচ্চারিত এক নাম: বঙ্গবন্ধু ও এক জাতির অন্তর্লিখিত আত্মকাব্য || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ 


জাতির প্রতি এক পত্র

প্রিয় স্বদেশ,
১৭ মার্চ—তারিখটি যেন কেবল কালের পৃষ্ঠায় অঙ্কিত একটি সংখ্যা নয়; বরং এটি এক সুদীর্ঘ গর্ভধারণের পর ইতিহাসের প্রসববেদনা থেকে জন্ম নেওয়া এক নামের উন্মোচন। সেই নাম—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—যেন কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং নদীমাতৃকার বুকফাটা জোয়ার, মাটির গভীরে ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরির ধৈর্য, আর অবদমিত উচ্চারণের এক সম্মিলিত বিস্ফোরণ।

১৯২০ সালের এই দিনে, টুঙ্গিপাড়া—একটি নরম, কাদামাখা ভূগোল—তাকে পৃথিবীর কাছে সমর্পণ করেছিল। যেন এক নিরীহ গ্রাম তার মাটির ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছিল এমন এক বীজ, যার বৃক্ষে একদিন একটি রাষ্ট্র আশ্রয় নেবে। তিনি জন্মেছিলেন কোনো বজ্রধ্বনি নিয়ে নয়, বরং শিশিরের মতো নীরবে—কিন্তু তাঁর ভেতরে সময় ধীরে ধীরে জমা করছিল ঝড়ের উচ্চারণ।

স্বদেশ,
তুমি কি কখনো অনুভব করেছো—একজন মানুষের কণ্ঠস্বর কীভাবে একটি ভূখণ্ডের শিরায় শিরায় রক্তসঞ্চালনের কাজ করতে পারে? ৭ই মার্চের ভাষণ—সেই বিকেলটি ছিল যেন এক অদৃশ্য বজ্রপাত; আকাশ ফাটেনি, কিন্তু মানুষের ভেতরের ভীতির প্রাচীর ভেঙে গিয়েছিল। তাঁর বাক্যগুলো ছিল না কেবল শব্দ, ছিলো আগুনের দানা— যা প্রতিটি হৃদয়ে গিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার অদম্য ক্ষুধা।

তিনি রাজনীতির কারিগর ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক মাটির ভাস্কর—যিনি কাঁদামাটি দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক জাতির আত্মপরিচয়। তাঁর প্রতিটি উচ্চারণ যেন শস্যবীজ, যা রোপিত হয়েছিল রক্তসিক্ত জমিতে, এবং সেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল এক পতাকা।

কিন্তু শোনো, স্বদেশ— সমস্ত উপমার ভেতর দিয়েও একটি নির্মম সত্য উঁকি দেয়: তিনি ছিলেন মানুষ। তিনি আকাশ ছিলেন না, বরং আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্লান্ত বৃক্ষ— ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে যার ডালপালা ভেঙেছে, তবুও যার শিকড় কখনো মাটি ছেড়ে যায়নি। তারপর— এক ভোর, যেন সূর্য ওঠার আগেই আলোকে হত্যা করা হলো—১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনাটি যেন কোনো রাজনৈতিক অধ্যায় নয়, বরং একটি জাতির নিজের ছায়াকে ছুরি মেরে ফেলার মতো এক আত্মবিরোধী দৃশ্য।

স্বদেশ, তুমি কি এখনো সেই রক্তের দাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছো? নাকি সময়ের ধুলা তাকে ঢেকে দিয়েছে, আর আমরা ভুলে গেছি— এই মাটি একদিন কেঁপে উঠেছিল নিজেরই পিতার পতনে?

আজ, এই জন্মদিনে, আমি কোনো ফুলের তোড়া নিয়ে আসিনি— আমি এনেছি কিছু প্রশ্ন, যেগুলো উত্তরহীন থাকলে স্বাধীনতাও এক প্রকার অসম্পূর্ণ বাক্য হয়ে থাকে। তুমি কি এখনো তাঁর স্বপ্নকে ধারণ করো? নাকি আমরা কেবল তাঁর নামকে ব্যবহার করি, যেন ইতিহাস একটি সুবিধাজনক অলংকার? তিনি আমাদের একটি দেশ দিয়েছিলেন— যেন এক জ্বলন্ত প্রদীপ, যা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন— “এটি নিভতে দিও না।”

কিন্তু স্বদেশ, প্রদীপ রক্ষা করা কি কেবল দায়িত্ব, নাকি তা এক অন্তহীন সাধনা? তিনি আজ নেই— তবুও তিনি আছেন, যেন বাতাসের মতো—অদৃশ্য, কিন্তু অপরিহার্য; যেন নদীর মতো—অবিরাম, কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে; যেন একটি অসমাপ্ত কবিতা— যার প্রতিটি লাইন আমরা এখনো লিখে চলেছি।

ইতি—
তোমারই অন্তর্গত, এক অনির্বচনীয় ঋণের ভাষ্যকার।


মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস



লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন