কবিতা : ফ্র্যাকচার্ড আইডেন্টিটি
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৮ মার্চ, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ২৭ মার্চ, ২০২৬ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘ফ্র্যাকচার্ড আইডেন্টিটি’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| ফ্র্যাকচার্ড আইডেন্টিটি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
ফ্র্যাকচার্ড আইডেন্টিটি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
মা-হারানো একখানা চড়ুই একদিন আমার জানালার প্রান্তে এসে আশ্রয় নিয়েছিল—তার ক্ষুদ্র শরীরের ভিতর যেন অনাথত্বের সমগ্র মহাকাব্য কাঁপছিল, ডানার ভাঁজে জমে ছিলো পরিত্যক্ত বিকেলের দীর্ঘশ্বাস, আর চোখের গভীরে ঝুলে ছিলো অচেনা শূন্যতার নিঃসীম নীল; বাসা-হারানো জুবুথুবু কাকটি জানালার কার্নিশে বসেছিল কালো বিষাদের এক নীরব প্রতিমূর্তি হয়ে—যেন তার পালকের প্রতিটি স্তরে স্তরে জমে আছে হারিয়ে যাওয়া ঠিকানার করুণ ইতিহাস, আর বাবলা সড়ক ধরে প্রতিদিন এক জীর্ণ, বিবর্ণ বেড়াল এসে দাঁড়াতো আমার দরজার সম্মুখে—ক্ষুধার শীর্ণতা তার দেহে এমনভাবে উৎকীর্ণ ছিলো যেন অস্তিত্বের উপর আঁচড় কাটা এক নিষ্ঠুর স্বাক্ষর; আমি প্রত্যক্ষ করতাম, পরাজিত প্রাণেরা আসে, অনাথ শ্বাস আসে, ঘরহীনতার করাল ছায়া আসে—কিন্তু কোনো বিধ্বস্ত মানুষ আসে না, কোনো চূর্ণ-বিক্ষত হৃদয় আসে না; অথচ প্রতিদিন ভাঙারি ওয়ালার কণ্ঠে শুনেছি সেই শীতল, নির্মম উচ্চারণ—“ভাঙা কিনবো”—আর ঠিক সেই স্বরে, সেই নির্মম বাজারি দরদামের অনুকরণে আমার বুকেও জন্ম নিয়েছিল এক বিভীষিকাময় আকাঙ্ক্ষা—একখানা ভাঙা মানুষ, একখানা ক্ষয়িষ্ণু হৃদয়, একখানা পতিত আত্মা আমার হোক, যে আমার শূন্যতার উপর দাঁড়িয়ে আমার নিঃসঙ্গতাকে অন্তত কিছুটা অর্থ দেবে; ঠিক তখনই হঠাৎ আমার চেতনায় যেন সত্যের তীক্ষ্ণ শলাকা বিদ্ধ হলো, আমি উন্মত্তের মতো দৌড়ে গিয়ে আয়নায় অবলোকন করলাম—যাকে কিনতে চেয়েছি, যার জন্য এত আয়োজন, সে তো আমি নিজেই, আমার মুখে ফাটলের রেখা, আমার হাসিতে ভাঙা কাঁচের ঝিলিক, আমার চোখে দগ্ধ স্বপ্নের ছাই; মুহূর্তে দৃষ্টি নেমে গেল নাভির দিকে—দেখলাম আমার ভিতর থেকে উদ্গত হচ্ছে আরেকখানা ভাঙা মানুষ, অনাগত এক অস্তিত্বের কোমল কান্না, যার ভাগ্যে ইতোমধ্যেই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা লিপিবদ্ধ; অতঃপর দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো বাবার মুখে—তার চোখে ক্লান্তি ও ত্যাগের এক গভীর অনুবাদ, আর আমি উপলব্ধি করলাম, আমি এখনো সম্পূর্ণ ভগ্ন নই, আমি এখনো টিকে আছি ঠিক যতটুকু সংযোগ বাবা ও অনাগত আমির মধ্যবর্তী সেতুবন্ধনে অবশিষ্ট আছে ততটুকুতে—আমি সেই সংযোগ, আমি সেই ক্ষয়িষ্ণু সেতু, আমি সেই আধভগ্ন প্রাচীর, যে প্রাচীর ভাঙতে ভাঙতে তবু ছায়া দেয়, কারণ পৃথিবী ভাঙা মানুষকে ক্রয় করতে আসে না; ভাঙা মানুষকে অবশেষে নিজের ভগ্ন বুক দিয়েই নিজেকে আগলে রাখতে হয়।
আপনার পছন্দের কবিতার নাম কমেন্টে জানান
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন