কবিতা : লাঙ্গলের ধার দিয়ে কাটা শ্বাস
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৬ মার্চ, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ২৬ মার্চ, ২০২৬ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘লাঙ্গলের ধার দিয়ে কাটা শ্বাস’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| লাঙ্গলের ধার দিয়ে কাটা শ্বাস || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
লাঙ্গলের ধার দিয়ে কাটা শ্বাস || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
একটা একটা শ্বাস আজ আমার কাছে কোনো সাধারণ বাতাস নয়—এ যেন মৃত্যুর গোপন কেরোসিন, বুকের ভিতর ঢুকে ঢুকে আমাকে ধীরে ধীরে জ্বালিয়ে দেয়। আমি শ্বাস নেই, কিন্তু মনে হয় শ্বাসটা কেউ আমার গলার ভিতর দিয়ে টেনে বের করে নিচ্ছে—যেন কোনো অদৃশ্য জল্লাদ, নিঃশ্বাসের রশিতে আমার আত্মাকে ঝুলিয়ে রাখছে। একাকীত্ব আজ কেবল নিঃসঙ্গতা নয়, এ এক রক্তচোষা পোকা—যে আমার বুকের শিরায় শিরায় ঢুকে গিয়ে প্রতিটি অনুভূতির শিকড় কামড়ে ধরে, তারপর নিঃশব্দে বলে যায়, “তুমি আর কারো নও, তুমি কেবল নিজের শূন্যতার।” আমি অনুভব করি, আমার চারপাশে অন্ধকার নয়—আমার ভিতরেই একটা অনন্ত গোধূলি জন্ম নিয়েছে, যেখানে আলো এসে মরতে মরতে থেমে যায়। মানুষ দূরে নয়—মানুষ আমার কাছেই, অথচ আমি তাদের মাঝেও একটা পরিত্যক্ত নদীর মতো, যার জল শুকিয়ে গেছে, কেবল পাড়ে পাড়ে পড়ে আছে ফাটলধরা নীরবতা।
আমি নিজেকে তখন দেখলাম জ্যান্ত মৃগেল মাছের মতো—যার পিঠ বরাবর তীক্ষ্ণ কোনো অস্ত্র নিখুঁতভাবে ছেদ করে বেরিয়ে গেছে। সে ক্ষত দিয়ে রক্ত নয়—বেরিয়ে আসছে আমার সমস্ত স্নেহের জল, সমস্ত আশার ঢেউ, সমস্ত বিশ্বাসের উষ্ণতা। মাছ যেমন পানির মধ্যে থেকেও হঠাৎ বুঝে ফেলে—তার জন্য জল আর জল নেই, জল হয়ে গেছে কেবল শীতল শাস্তি—ঠিক তেমনই আমি মানুষের মধ্যে থেকেও বুঝে ফেললাম, ভালোবাসা আর ভালোবাসা নেই, সম্পর্ক হয়ে গেছে কেবল হিমশীতল শ্বাসরোধ। আহত মাছের কানকো যেমন বারবার জাপটে ওঠে, ছটফট করে নিজের শরীরকে আঁকড়ে ধরে, যেন বলতে চায়—“আমি এখনো আছি, আমি এখনো বেঁচে আছি”—আমিও ঠিক তেমনই বুকের উপর হাত রেখে, ভেতরের হাড়ে হাড়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজেকে আশ্বাস দিলাম, “আমি আছি… আমি আছি…” কিন্তু সেই বাক্যগুলো ছিলো ভাঙা শামুকের খোলস—যার ভিতরে আর কোনো সমুদ্র নেই, কেবল কান্নার শূন্য প্রতিধ্বনি।
তারপর আমি দেখতে পেলাম মাটির বুকের ভয়ংকর নাটক—দাঁতালো লাঙ্গলের নখর যখন জমির শিরা চিরে দেয়, তখন এক অবোধ কেঁচোর খণ্ডিত দেহ এদিক-ওদিক লাফাতে থাকে। আহা! সেই লাফগুলো কি লাফ? না, ওগুলো মৃত্যুর ব্যাকুল হেঁচকি—মাটির বুক থেকে উঠে আসা শেষ আর্তি। কেঁচোর শরীর ভাগ হয়ে যায়, কিন্তু তার প্রাণ ভাগ হয় না; তার আকুতি, তার বেঁচে থাকার অবুঝ ইচ্ছা—সেটা খণ্ডিত হয় না। সে টুকরো টুকরো হয়েও ছটফট করে, কারণ জীবন শেষ মুহূর্তেও নিজেকে ছাড়তে শেখে না। তার রক্ত নেই, তবু তার দেহের ভেজাভাবটা যেন মাটির চোখের জল। মনে হয় পৃথিবীটা একটা বিশাল চাষের মাঠ, আর আমরা সবাই সেখানে কেঁচোর মতো—জীবনের মাটিতে লুকিয়ে থাকা নরম প্রাণ, যাকে যে কোনো মুহূর্তে কোনো ধারালো বাস্তবতা টুকরো করে দিতে পারে।
আমি ভাবলাম—কেঁচোরও তো হয়তো সন্তান আছে! হয়তো মাটির নিচে কোথাও ছোট্ট কেঁচো সন্তান কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে আসবে, রোষে ফেটে পড়বে, লাঙ্গল কামড়ে ধরবে, দাঁত বসাবে, প্রতিশোধ নেবে! মনে হলো—এইবার বুঝি ক্ষুদ্রতা তার সমস্ত ক্ষোভ নিয়ে বিশাল হয়ে উঠবে! কিন্তু না… কেঁচোর কামড় তো লাঙ্গলের কাছে কেবল বাতাসের মতো। লাঙ্গল তো লোহা, লাঙ্গল তো নিয়ম, লাঙ্গল তো নির্মম সভ্যতা—যে মাটিকে চাষ করে, কিন্তু মাটির কান্না শোনে না। কেঁচোর শেষ কামড়টা তাই হয়ে ওঠে নিছক এক ব্যর্থ বিদ্রোহ;মৃত্যুর আগে জীবনের প্রতি শেষ প্রেমপত্র। সেই কামড়ের মধ্যে ছিলো প্রতিজ্ঞা, কিন্তু ছিলো না ক্ষমতা। ছিলো সাহস, কিন্তু ছিলো না বিজয়। ছিলো শুধু করুণ সত্য—যে সত্য বলে, “আমি মরছি, তবু আমি একবার লড়লাম।”
ঠিক সেইখানেই আমি নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখতে পেলাম—আমি নিজেই সেই কেঁচো। আমি নিজেই সেই ছিন্নভিন্ন দেহ। আমি নিজেই সেই ক্ষুদ্র প্রাণ, যাকে জীবনের লাঙ্গল বারবার চিরে দিয়েছে। আমার স্বপ্নের উপর দিয়ে লাঙ্গল গেছে, আমার ভালোবাসার উপর দিয়ে লাঙ্গল গেছে, আমার আত্মসম্মানের উপর দিয়ে লাঙ্গল গেছে। আমি কতবার টুকরো হয়েছি—কিন্তু মানুষ তা দেখেনি, কারণ আমার ক্ষতগুলো ছিলো ভিতরের, আমার রক্তপাত ছিলো নীরব। আমি হাসির মুখোশ পরে থেকেছি, অথচ ভিতরে ভিতরে প্রতিদিন মরেছি—যেমন মাটির নিচে কেঁচো মরেও মাটির ওপরে কোনো শব্দ ওঠে না।
কিছু সময় আগে আমি শেষবারের মতো বাঁচার চেষ্টা করেছিলাম। আহা, সে চেষ্টা ছিলো কী ভয়ংকর সুন্দর! যেন ডুবে যেতে থাকা মানুষ শেষবারের মতো সূর্যের দিকে হাত বাড়ায়। যেন পাখি ডানা ভাঙার পরও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন জ্বলতে থাকা প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগমুহূর্তে আরও একটু আলো দিতে চায়। আমি দাঁতে দাঁত চেপে জীবনকে কামড়ে ধরেছিলাম—ভেবেছিলাম, এইবার হয়তো বাঁচবো, এইবার হয়তো আমি নিজেকে উদ্ধার করবো। কিন্তু জীবন তো লাঙ্গল,তার গায়ে আমার দাঁতের দাগ পড়ে না। জীবন তো নিষ্ঠুর মাঠ—সে শুধু ফসল চেনে, সে কেঁচোর কান্না চেনে না।
তবু আমি চেষ্টা করেছি,এটাই আমার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্য। কারণ আমার সেই চেষ্টা ছিলো আমার শেষ প্রেম, আমার শেষ প্রতিবাদ, আমার শেষ উচ্চারণ;যে উচ্চারণ বলেছিলো, “আমি মরতে চাই না।” কিন্তু পৃথিবী বড় নিষ্ঠুরভাবে হাসে। পৃথিবী আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার না চাওয়াটা আমার নিয়মের কাছে কোনো মূল্য রাখে না।” আর আমি তখন আবার আহত মাছের মতো কাঁপতে কাঁপতে নিজের কানকো জাপটে ধরি, নিজের অস্তিত্ব আঁকড়ে ধরি, এবং ফিসফিস করে বলি;
“আমি বেঁচে আছি…”
কিন্তু এই “বেঁচে থাকা” যেন এক বিশাল কবরের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা।
এ যেন অন্ধকারের গর্ভে আলো খোঁজা।
এ যেন কান্নাকে গিলে হাসি হয়ে থাকার অভিনয়।
আমি এখনো শ্বাস নিই, কিন্তু প্রতিটা শ্বাস যেন বুকের ভিতর একটা করে কফিন বানায়।
আমি এখনো হাঁটি, কিন্তু প্রতিটা পা ফেলা যেন নিজেরই কবরের উপর মাটি চাপা দেওয়া।
আমি এখনো কথা বলি, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন গলার ভিতর আটকে থাকা একেকটা ছুরি।
আর এই ভয়াল একাকীত্ব—এ যেন আমার শরীরের উপর দিয়ে চলে যাওয়া এক অদৃশ্য লাঙ্গল,
যে আমাকে প্রতিদিন চাষ করে, প্রতিদিন কেটে নেয়,
আর শেষে আমার ভিতর থেকে জন্ম দেয়
শুধু শূন্যতার ফসল;শুধু নীরবতার শস্য—শুধু দীর্ঘশ্বাসের কাঁটা।
আমি আজও নিজেকে আশ্বাস দিই,
কিন্তু সে আশ্বাস আসলে কোনো বাঁচার গান নয়!
এটা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলা এক শেষ বাক্য!
একটা আহত মাছের শেষ জল!
একটা খণ্ডিত কেঁচোর শেষ কামড়
একটা মানুষের শেষ চেষ্টা
“আমি বেঁচে আছি…
আমি বেঁচে আছি…
আমি… বেঁচে আছি…”
আপনার পছন্দের কবিতার নাম কমেন্টে জানান
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন