কবিতা          :         যোনিতল-অধিষ্ঠিত শস্যসভ্যতার অন্ধ-উপাখ্যান
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ২ এপ্রিল, ২০২৬ ইং

কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘যোনিতল-অধিষ্ঠিত শস্যসভ্যতার অন্ধ-উপাখ্যান’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

যোনিতল-অধিষ্ঠিত শস্যসভ্যতার অন্ধ-উপাখ্যান || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
যোনিতল-অধিষ্ঠিত শস্যসভ্যতার অন্ধ-উপাখ্যান || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ



যোনিতল-অধিষ্ঠিত শস্যসভ্যতার অন্ধ-উপাখ্যান || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


সেকি পেয়েছিল?
চিত্রলিপির শিরায় শিরায় যত ইতিহাস জমাট বেঁধেছে—তাতে কোনো গান নেই, কোনো সুর নেই—আছে কেবল পাথরের নীরব দংশন, আর আদিম প্রশ্নের ছাই। শস্যের নামে কতিপয় আনন্দ উড়ে গেছে মৃগতৃষ্ণার মরুবেলাভূমিতে—যেখানে জলের প্রতিশ্রুতি থাকে, কিন্তু জল থাকে না; আর কতিপয় আনন্দ আটকে ছিল অন্ধ জোছনায়—যেন আলো আছে, অথচ দৃষ্টি নেই; যেন চাঁদ আছে, অথচ চাঁদের ভাষা মৃত। পৃথিবীর বুক তখন ছিলো কেবল গিরিখাতের মতো শূন্য—তার ভিতরে ঝুলে ছিল মানুষের আদি ক্ষুধা, পশুর মতো নগ্ন, দেবতার মতো দুর্বোধ্য।

সেকি আজও আছে—সে কামাতুর যৌবন, যে যৌবন শরীর নয়, এক ধ্বংসাত্মক ঋতু; যে যৌবন কেবল ভোগের আর্তি নয়, বরং রক্তের ভিতর বাজতে থাকা বিদ্যুৎ-সংগীত! আজও কি আছে সে যুবতী—যার চোখে তৃষ্ণা নয়, তৃষ্ণার কফিন; যার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে গোপন আগুনের নথি; যার নিঃশ্বাসে রাত কেঁপে ওঠে, আর নক্ষত্রেরা লজ্জায় নিজেদের আলো গুটিয়ে নেয়? সে যুবতী যেন মাটির ভিতর লুকিয়ে থাকা এক নিষিদ্ধ বসন্ত—যাকে ছুঁলেই পৃথিবী নিজের শালীনতা হারিয়ে ফেলে।
আর আজও কি আছে সে যুবক—যে প্রথম উত্থিত শিশ্নে হাত বুলিয়ে ভেবেছিলো,
এ কোনো কাম নয়—এ তো ভবিষ্যৎ?

সে বুঝতে পারেনি, তার স্পর্শ তখন কেবল শরীরের ওপর নয়—সভ্যতার শিকড়ের ওপর। সে ভেবেছিলো তার উত্থান কোনো অপরাধের পতাকা নয়—এ এক সন্তান-সম্ভাবনার কুঁড়ি; এক কোমল মাথার পূর্বাভাস; এক কান্নার আগাম ঘোষণা, যা একদিন পৃথিবীর সমস্ত নীরবতাকে কেটে ফেলবে। তার ভিতরে তখন পুরুষ ছিল না—ছিল এক অন্ধ দেবতা, যে নিজেরই জন্মের রাস্তা খুঁজছিল।

তারপর অতঃপর—পৃথিবী এসে নত হয়েছিলো নারীর যোনিতলে।
সে নত হওয়া ছিলো কোনো প্রেমের ভঙ্গি নয়—সে ছিলো ইতিহাসের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ। রাজমুকুট খুলে রাখা হয়েছিলো যোনির দরজায়, সমস্ত পুরুষতন্ত্রের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছিলো একটিমাত্র গোপন গহ্বরের কাছে—যেখানে অন্ধকারও উর্বর, যেখানে রক্তও পবিত্র, যেখানে যন্ত্রণা পর্যন্ত জন্মের মতো মহৎ। যোনি তখন কেবল শরীরের অঙ্গ ছিল না—যোনি ছিল সভ্যতার গর্ভগ্রন্থি; ছিল পৃথিবীর আদিম সংসদ; ছিল প্রাণের শস্যভাণ্ডার।
সেদিনের পর থেকে পুরুষ বুঝেছিলো—ক্ষুধা কেবল পেটের নয়।
ক্ষুধা কখনো কখনো আত্মার।
ক্ষুধা কখনো কখনো অস্তিত্বের।
আর সেই অস্তিত্বের আহার নারী—তার স্তনের দুধে নয় শুধু, তার শরীরের আশ্রয়ে; তার চোখের মমতায়; তার গর্ভের গোপন আলোয়।
সেদিনের পর থেকে কখনো কোনো পুরুষ অনাহারে মরে নি—
কারণ নারী হয়ে উঠেছিলো অন্নপূর্ণার ছায়া, পৃথিবীর শেষ ভাতঘর, বেঁচে থাকার শেষ অজুহাত। পুরুষ যখন ভেঙে পড়েছিলো দুঃখের কাঁটাতারে, নারী তাকে তুলে নিয়েছিলো তার উরুর নরম আশ্রয়ে—যেন উরু নয়, যেন দুটি নদীর মাঝখানে গড়ে ওঠা একটি শান্ত দেশ; যেখানে যুদ্ধ থেমে যায়, মৃত্যুও কাঁদতে ভুলে যায়।
চিত্রলিপিতে গান লেখা নেই—ঠিক।
কারণ গান লেখা থাকে না পাথরে, গান লেখা থাকে না শাসকের ঘোষণায়।
গান লেখা থাকে নারীর শরীরের গোপন অক্ষরে—যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস একেকটি শ্লোক, প্রতিটি স্পর্শ একেকটি মহাকাব্য, প্রতিটি রক্তক্ষরণ একেকটি মহামন্ত্র।
শস্যের নামে যে আনন্দ উড়ে গিয়েছিলো মৃগতৃষ্ণায়—সে ফিরে এসেছিলো নারীর গর্ভে।
অন্ধ জোছনায় যে আনন্দ আটকে ছিলো—সে আলো পেয়েছিলো নারীর অন্ধকারে।
কারণ নারীর অন্ধকার কোনো শূন্যতা নয়—সে অন্ধকার সৃষ্টির আঁতুড়ঘর।
তাই পৃথিবী বারবার মাথা নত করে—নারীর যোনিতলে।
কারণ সেখানে কোনো পরাজয় নেই—সেখানে কেবল জন্মের বিজয়।
সেখানে ধর্ম নেই—সেখানে জীবন আছে।
সেখানে শাস্ত্র নেই—সেখানে শ্বাস আছে।
সেখানে রাজনীতি নেই—সেখানে রক্তের রাজ্য।
আর এই রক্তের রাজ্যে,
মানুষ বারবার ফিরে আসে—
ক্ষুধার শেষ ব্যাকরণ হয়ে,
প্রেমের শেষ সংজ্ঞা হয়ে,
সভ্যতার শেষ উপাখ্যান হয়ে।
পৃথিবী জানে—যুদ্ধ দিয়ে রাজ্য বানানো যায়,
কিন্তু যোনি ছাড়া সভ্যতা বানানো যায় না।
মন্দিরে ঈশ্বরকে রাখা যায়,
কিন্তু যোনিতলেই ঈশ্বর জন্ম নেয়—নগ্ন, নীরব, অথচ চিরজীবী।
আর তাই—
যেদিন পৃথিবী প্রথম নত হয়েছিলো নারীর যোনিতলে,
সেদিন থেকেই ক্ষুধা পিছু হটেছিলো,
অনাহার লজ্জায় আত্মগোপন করেছিলো,
আর পুরুষ বুঝেছিলো—
তার বেঁচে থাকার সর্বশেষ অন্ন
নারী নামক এক অনন্ত আশ্রয়।
সেদিনের পর থেকে—
কখনো কোনো পুরুষ অনাহারে মরে নি।
কারণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাদ্য হলো—ভালোবাসার শরীর।
আর সেই শরীরের নাম—নারী।


আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন