কবিতা          :         ভালোবাসার ব্যাকরণ
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং

কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘ভালোবাসার ব্যাকরণ’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

ভালোবাসার ব্যাকরণ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
ভালোবাসার ব্যাকরণ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


ভালোবাসার ব্যাকরণ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


তুমি কি জানো — একটা মানুষ কতটা নীরবে পুড়ে?
না, জানো না। কারণ কুরুক্ষেত্রের আগুন দিয়ে চলে যাওয়ার পর কেউ ফিরে তাকায় না, ছাই হয়ে যাওয়া দেখতে।
আমি দ্রৌপদী ছিলাম না, যে পাঁচজনের মাঝে নিজেকে ভাগ করে দেব। আমি ছিলাম শুধু একজনের, সম্পূর্ণ, নিবেদিত, নিঃশর্ত। কিন্তু তুমি আমাকে দেখলে ধৃতরাষ্ট্রের চোখে, জন্মান্ধ হয়ে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আলো দেখতে পাওনি, অথচ দাবি করেছ ভালোবাসার।

আমার প্রিয় রং কী, জিজ্ঞেস করোনি কোনো দিন। আমায় কী পরলে সুন্দর লাগে, ভাবোনি একবারও। আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি একটা খোলা বইয়ের মতো, আর তুমি পাতা না উল্টেই রেখে দিয়েছ তাকের কোণে। ধুলো জমেছে। তুমি দেখোনি।

সারাদিন শেষে আমি ঘরে ফিরতাম কর্ণের মতো, বুকভরা যোগ্যতা নিয়ে, তবু অপ্রাপ্তির ভার কাঁধে। কর্ণ সারাজীবন যুদ্ধ করেছে স্বীকৃতির জন্য, আমি অপেক্ষা করেছি শুধু একটু যত্নের জন্য। তোমার কণ্ঠস্বর, তোমার একটা প্রশ্ন, "কেমন আছো?" এইটুকুই আমার মরুভূমিকে সবুজ করে দিতে পারত। কিন্তু তুমি মেঘ হয়েও বৃষ্টি হওনি। ছায়া দিয়েছ, কখনো ভিজিয়ে যাওনি।

আমি অপেক্ষা করেছি। একলব্যের মতো, গুরু সামনে না থেকেও পূজা করেছি, অনুশীলন করেছি, নিজেকে গড়েছি শুধু তোমার জন্য। আর তুমি? তুমি একলব্যের বুড়ো আঙুলটাই চেয়ে নিলে, আমার সবটুকু উৎসর্গ নিলে, বিনিময়ে দিলে শূন্যতা।

তোমার অভাবে আমার কেমন লাগে, একটিবারও কি মাথায় এসেছে?

মনে পড়ে অভিমন্যুর কথা? চক্রব্যূহে ঢোকার বিদ্যা জানত, বেরোনোর পথ জানত না। আমিও তেমনই তোমার ভালোবাসায় ঢুকেছিলাম সাহস নিয়ে, কিন্তু বেরোনোর পথ কেউ শেখায়নি। চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছিল তোমার অবহেলা, তোমার না-দেখা, তোমার নিরুত্তর রাত্রিগুলো, আর আমি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছি, একা, কাউকে না জানিয়ে।
ভালোবাসারও একটা ব্যাকরণ আছে।

ব্যাসদেব যেমন মহাভারত লিখেছিলেন,
প্রতিটি চরিত্রকে তার প্রাপ্য গভীরতায় দেখেছিলেন,
কারো যন্ত্রণা অদেখা রাখেননি।
কিন্তু তুমি আমার মহাভারতে ব্যাসদেব হওনি।
তুমি হয়েছিলে শকুনি,
শুধু চাল চেলেছ, কখনো বুঝতে চাওনি
পাশার ঘুঁটির নিচে একটা জীবন্ত হৃদয় পিষে যাচ্ছে।
সবচেয়ে তীব্র যন্ত্রণা জানো কোনটা?
গান্ধারী সারাজীবন চোখে পট্টি বেঁধেছিলেন,
স্বেচ্ছায়, ভালোবাসায়।
আমিও তেমনই নিজের যন্ত্রণা ঢেকে রেখেছিলাম,
তোমাকে আঘাত না দিতে।
কিন্তু গান্ধারীর অন্তত স্বীকৃতি ছিল,
তাঁর ত্যাগ দেখেছিল কেউ।
আমার ত্যাগ দেখার মতো চোখ তোমার ছিল না।
এখন আর মিছে আসার অপেক্ষায় থাকি না।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।
রথ থেমে গেছে।
কৃষ্ণ গীতা বলে চলে গেছেন।
শুধু বুকের ভেতর একটা পোড়া ভূমি পড়ে আছে,
যেখানে তোমার যত্নের ফসল ফলার কথা ছিল।
এখন সেখানে শুধু ছাই,
আর ছাইয়ের নিচে তবুও একটুখানি উষ্ণতা।
সেটাই আমার সবচেয়ে বড় লজ্জা।
সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আমি ভালোবেসেছিলাম,
মহাভারতের মতো বিশাল করে,
আর তুমি পড়োনি,
একটা পাতাও না।


আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন