শিরোনাম : মায়ের ছায়ায় বন্দী এক পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি
লেখক : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ : Sons and Lovers
গ্রন্থ লেখক : D.H. Lawrence
প্রকাশকাল : ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
রচনাকাল : ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
![]() |
| Sons and Lovers: মায়ের ছায়ায় বন্দী এক পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি |
‘Sons and Lovers’ Book Review
মায়ের ছায়ায় বন্দী এক পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
D.H. Lawrence-এর Sons and Lovers : কাহিনি ও ফ্রয়েডীয় বিশ্লেষণ
D.H. Lawrence-এর Sons and Lovers একটি শ্রমজীবী পরিবারের জীবনকথা। উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে Morel পরিবার—খনিশ্রমিক Walter Morel, তার স্ত্রী Gertrude Morel এবং তাদের সন্তানরা, বিশেষ করে Paul Morel। বাহ্যিকভাবে এটি একটি পারিবারিক উপন্যাস হলেও এর ভেতরের স্তরে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় সম্পর্কের জটিল মনস্তত্ত্ব, ভালোবাসা-ঘৃণার দ্বন্দ্ব এবং অবচেতন আকাঙ্ক্ষার গভীর সংঘাত।
উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় Walter Morel ও Gertrude Morel-এর বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েন। Walter-এর রুক্ষ, অশিক্ষিত ও কঠোর জীবনযাপন Gertrude-কে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ধীরে ধীরে তিনি স্বামীর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজের আবেগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রকে সন্তানদের দিকে, বিশেষ করে Paul-এর দিকে স্থানান্তর করেন। এই স্থানান্তরই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়, কারণ এখান থেকেই শুরু হয় এক গভীর ও নিয়ন্ত্রণকারী মা-ছেলের আবেগিক সম্পর্ক।
Paul ছোটবেলা থেকেই মায়ের প্রতি অত্যন্ত সংযুক্ত হয়ে পড়ে। মায়ের অনুভূতি, সিদ্ধান্ত এবং উপস্থিতি তার মানসিক গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক শুধু ভালোবাসার সীমায় থাকে না; বরং এক ধরনের অবচেতন নির্ভরতা ও মানসিক অধিকারবোধে রূপ নেয়। ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণ অনুযায়ী একে Oedipus Complex-এর সাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়, যেখানে শিশুর প্রাথমিক আবেগ মায়ের প্রতি কেন্দ্রীভূত থেকে যায় এবং পরবর্তী সম্পর্কগুলোকে প্রভাবিত করে।
এই মানসিক কাঠামোর প্রভাবেই Paul-এর প্রেমজীবন বিভক্ত হয়ে পড়ে। Miriam-এর সাথে তার সম্পর্ক গভীর, সংবেদনশীল এবং আধ্যাত্মিক। সে Miriam-কে ভালোবাসলেও সেই ভালোবাসা কখনোই বাস্তব ও শারীরিক পরিপূর্ণতায় পৌঁছায় না, কারণ অবচেতনভাবে সে তাকে “মাতৃসদৃশ পবিত্র সত্তা” হিসেবে কল্পনা করে। ফলে এই সম্পর্ক এক ধরনের দূরত্ব ও অসম্পূর্ণতায় শেষ হয়।
অন্যদিকে Clara-র সাথে তার সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন—এখানে শারীরিক আকর্ষণ প্রবল, কিন্তু মানসিক সংযোগ অনুপস্থিত। এই দুই সম্পর্কের বিপরীত অভিজ্ঞতা Paul-এর ভেতরের দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে—একদিকে মাতৃ-নির্ভর আবেগ, অন্যদিকে স্বাধীন সম্পর্ক গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা।
এই পারিবারিক কাঠামোর আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র Walter Morel, যাকে Paul প্রায়শই ঘৃণার চোখে দেখে। পিতা এখানে শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতীক, যিনি মায়ের ভালোবাসার উপর তার অবচেতন “অধিকার” কে চ্যালেঞ্জ করেন। ফলে পিতার প্রতি তার ঘৃণা আসলে পারিবারিক ক্ষমতা ও ভালোবাসার দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
উপন্যাসের সবচেয়ে করুণ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো Gertrude Morel-এর অসুস্থতা ও মৃত্যু। ধীরে ধীরে মৃত্যুপথযাত্রী মাকে Paul নিজ হাতে মরফিন প্রদান করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়—যা বাহ্যিকভাবে এক মানবিক ট্র্যাজেডি হলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এটি এক ধরনের বিচ্ছেদের চেষ্টা। সে অবচেতনভাবে মায়ের সাথে গড়ে ওঠা অদৃশ্য মানসিক শেকল ছিন্ন করতে চায়।
কিন্তু এই বিচ্ছেদ তাকে মুক্ত করে না। Gertrude-এর মৃত্যুর পর Paul কোনো মানসিক স্থিরতা লাভ করে না; বরং সে প্রবেশ করে এক গভীর অস্তিত্বগত শূন্যতায়। কারণ তার আত্মপরিচয়, আবেগ এবং ভালোবাসার কেন্দ্র এতদিন সেই মাতৃ-নির্ভরতার সাথেই যুক্ত ছিল। সেই কেন্দ্র হারিয়ে সে এক ধরনের মানসিক ভাঙনের মধ্যে পড়ে যায়।
ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, Sons and Lovers কেবল একটি পারিবারিক গল্প নয়; এটি একটি অমীমাংসিত Oedipus Complex-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সাহিত্যিক গবেষণা। এখানে ভালোবাসা, ঘৃণা, আকাঙ্ক্ষা এবং বিচ্ছেদ একে অপরের সাথে জটিলভাবে জড়িয়ে গিয়ে মানব-মননের অন্ধকার ও সংবেদনশীল দিক উন্মোচন করে।
এইভাবে Sons and Lovers কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি মানব-মনস্তত্ত্বের সেই বাস্তবতার সাহিত্যিক দলিল, যেখানে সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অবচেতন আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং আত্মপরিচয়ের ভাঙন।
যে কোনো রিভিউ পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন