মুক্তমত : নারীর পরিচয় সংকট: পিতৃতন্ত্রের শেকল ভাঙ্গবে কবে?
লেখক : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
রচনাকাল : ১৫ এপ্রিল, ২০২৬
![]() |
| নারীর পরিচয় সংকট: পিতৃতন্ত্রের শেকল ভাঙ্গবে কবে? || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
নারীর পরিচয় সংকট: পিতৃতন্ত্রের শেকল ভাঙ্গবে কবে? || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
আমাদের সমাজে একটি মেয়ে জন্মানোর আগে থেকেই তার জন্য নির্দিষ্ট একটি ছাঁচ তৈরি করা থাকে। যা মেয়েটিকে সময়ের পরিক্রমায় নানান রুপে পরিচয় করিয়ে দেয়। জন্মের পর ঐ ছাঁচে মাপমতো বসিয়ে ফেলতে পারলেই মেয়েটি হয়ে ওঠে ‘ভালো মেয়ে’। মেয়েটি বড় হতে হতে ছাঁচটিও বদলায়— বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সে হয়ে ওঠে ‘ভালো ছাত্রী’, বিয়ের পর ‘ভালো বউ’, তারপর ‘ভালো মা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু লক্ষণীয় যে মেয়েটির এই জীবনচক্রে কোথাও ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে পরিচয় করানোর দায় যেনো কারোই নেই। সেখানে ‘নিজের মতো করে বাঁচতে পারা একজন স্বাধীন মানুষ’—তো অনেক দূরের বিষয়।
এটাই এই উপমহাদেশের নারীদের সবচেয়ে গভীর সংকট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় অনেক কিছু বদলেছে। মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, চাকরি করছে। কিন্তু একটু ভেতরে গেলেই দেখা যায়, কাঠামো সেই আগেরটাই আছে— শুধু পোশাক বদলেছে।
এই সংকটের শেকড় খুঁজতে গেলে পেছনে ফিরতে হবে। কৃষিভিত্তিক সমাজে পুরুষরা তাদের সম্পত্তি নিজ বংশের ভেতর ধরে রাখতে নারীর শরীর ও চলনের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতো। তাদের বিয়ে দেয়া হতো নিজ বংশেরই কোনো পুরুষের সাথে। যেমন- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক মেয়েকেই বাধ্য হয়ে চাচাতো ভাইদের স্বামী রুপে গ্রহণ করতে হতো। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু দূরের চাচা গোত্রিও পুরুষকেও অনিচ্ছায় গ্রহণ করতে হতো। আর যদি কোনো মেয়ে অল্প বয়সে বিধবা হয়, তাহলেতো কথাই নেই — ৮০ বছরের বৃদ্ধও তখন সুপাত্র, শুধু বংশের হলেই চলবে। বলা যায় নারী তখন আর কেবল মানুষ ছিল না— ছিল ‘পুরুষের বংশীয় সম্পদ রক্ষার প্রতীক’। তার ইচ্ছা, স্বপ্ন বা পছন্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ছিলো ‘পরিবারের মর্যাদা’।
ঔপনিবেশিক আমলে এই ধারণা আরও পোক্ত হলো। সেসময় ‘ভদ্রমহিলা’ ধারণাটি তৈরি হলো, যেখানে ঘরের ভেতরে থাকাকেই ‘সভ্যতা’ বলে চিহ্নিত করা হলো। ঘরবন্দী থাকাকে মহিমান্বিত করতে নানান উপমার সংস্কৃতির মোড়কে মোড়ানো হতো নারীকে। যা এখনো চলমান।
সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নারী প্রত্যক্ষভাবে লড়েছেন, সংগঠিত করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই লড়াকু নারীকে ‘বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ‘ইজ্জত হারানো’ নারী হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। যিনি সাহস দেখিয়েছিলেন, তাকে করুণার পাত্রী বানানো হলো। এটা কেবল অবিচার নয়— এটা ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
বর্তমান সময়ে নারীর শিক্ষার হার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু অনেক পরিবারে মেয়েদের শিক্ষা এখনো ‘আত্মবিকাশের পথ’ নয়— বরং বিয়ের বাজারে ভালো দাম পাওয়ার ‘অলংকার’। ডিগ্রি আছে, কিন্তু স্বায়ত্তশাসন নেই। সনদ আছে, কিন্তু কণ্ঠস্বর নেই।
এই দেশের কোটি কোটি নারী প্রতিদিন রান্না করছেন, সংসার সামলাচ্ছেন, সন্তান মানুষ করছেন— কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কোনো আর্থিক স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রীয় হিসাবে এই শ্রম অদৃশ্য। অথচ এই অদৃশ্য শ্রমের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে পুরো সমাজ ব্যবস্থা। যে কাজ ছাড়া সমাজ চলে না, সেই কাজের স্বীকৃতি নেই— এটা কেবল অর্থনৈতিক অবিচার নয়, এটা পিতৃতন্ত্রের একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক কৌশল। ফলে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিক্ষিত নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েও বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন না। কারণ কাঠামো তাঁকে সে সুযোগ দিচ্ছে না। ডিগ্রি আছে, কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা নেই; জ্ঞান আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। এই দ্বন্দ্বের ভেতরে বসবাস করতে করতে একজন নারীর মনে যে বিষণ্নতা তৈরি হয়, তা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয় — এটা একটি রাজনৈতিক ক্ষত।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো— দীর্ঘদিনের সামাজিকীকরণের ফলে নারী নিজেই অনেক সময় এই বন্দিত্বকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তিনি অজান্তেই নিজেরতো বটেই, অন্য নারীর স্বাধীনতার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ান। শাশুড়ি যখন বউকে ‘মেয়েমানুষের এত সাহস থাকবে কেন’ বলেন, সে শাশুড়ি একসময় নিজেও একই শৃঙ্খলে বাঁধা ছিলেন। এটা ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা নয়— এটা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট নিয়ে বঞ্চিত মানুষের করুণ লড়াই। যারা কখনো পূর্ণ ক্ষমতা পাননি, তারা যেটুকু পাওয়া যায়— সেটুকুর জন্য লড়েন। পুরুষতন্ত্র এইভাবে নারীকে দিয়েই নারীকে দমন করার কাজটি করিয়ে নেয়।
ডিজিটাল দুনিয়া হয়তো নারীকে নতুন একটি মুক্তির পথ দেবে বলে মনে করা হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। সামাজিক মাধ্যমে ‘পারফেক্ট সংসার’, ‘আদর্শ স্ত্রী’, ‘সুন্দর সাজানো রান্নাঘর’— এই প্রদর্শনীর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নারী আরও বেশি করে পণ্যে পরিণত হচ্ছেন। এখানে সৃজনশীলতায়, মেধায় বা সাহসিকতায় সাফল্য মাপা হয় না— বরং কতটা আকর্ষণীয়ভাবে একটি ঐতিহ্যবাহী নারীর ভূমিকা পালন করা যাচ্ছে, তা দিয়ে। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় হাজারো অচেনা মানুষের চোখের সামনে নারী প্রতিনিয়ত নিজেকে ‘উপস্থাপন’ করছেন— কিন্তু সেই উপস্থাপনের ভাষা ও ছাঁচটি তৈরি করে দিচ্ছে সেই পুরনো পিতৃতান্ত্রিক প্রত্যাশাই। খাঁচার শিক এবার ধাতব নয়, পিক্সেলের তৈরি।
বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষায় আইন আছে। সংবিধানে সমতার কথা লেখা আছে। কিন্তু আইন আর বাস্তবতার মাঝখানে যে বিশাল খাদ, সেটাই আসল সমস্যা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক লজ্জার ভয়, আর্থিক নির্ভরশীলতা — এই তিনটি মিলে আইনকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। অনেক নারীর কাছে বিয়ে এখনো একটি ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কৌশল’—স্বাধীন ইচ্ছার প্রকাশ নয়। যতদিন শ্রমবাজারে নারী সমান মজুরি পাবেন না, যতদিন একা চলা নারীর জন্য সামাজিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবে, ততদিন এই ‘পছন্দ’ আসলে বাধ্যবাধকতাই থাকবে।
মূলত আমাদের সমাজে নারীর সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য তিনটি জিনিস দরকার। প্রথমত, গৃহস্থালি শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এই শ্রম যদি জাতীয় হিসাবে দৃশ্যমান হয়, তাহলে নারীর অবদান অর্থনৈতিকভাবে বৈধতা পাবে— এবং তার মর্যাদা বাড়বে। দ্বিতীয়ত, নারীর প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা — সমান মজুরি, সম্পত্তিতে অধিকারের প্রকৃত প্রয়োগ এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য শিশু সেবার পরিকাঠামো। তৃতীয়ত, বিবাহের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবা। বিয়ে হবে দুইজন স্বাধীন মানুষের সমান অংশীদারিত্ব — একজনের উপর অন্যজনের নির্ভরতার চুক্তি নয়।
পরিশেষে বলতে হয়, নারীর মুক্তি মানে কেবল একটি প্রথা ভাঙা নয়। এটা মানে শত বছরের চাপিয়ে দেওয়া সেই বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসা, যেখানে বলা হয়েছে — তুমি আগে ভালো মেয়ে-বউ-মা, তারপর মানুষ। যতদিন পর্যন্ত একটি মেয়েকে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার আগে ‘ভালো বউ’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শেখানো হবে, ততদিন এই দেশের উন্নয়ন হবে কেবল সংখ্যায়, প্রাণে নয়। একজন নারীর প্রকৃত জন্ম হয় তখনই, যখন সে সমাজের দেওয়া ছাঁচ ভেঙে নিজের পরিচয় নিজে লিখতে শেখে। সোনার খাঁচা যত দামীই হোক, শেষ পর্যন্ত সেটা একটি বন্দিশালাই। মুক্তি সেই আকাশে, যেখানে একজন নারী কোনো প্রতীক নন, কোনো ভূমিকা নন — শুধুই একজন রক্ত-মাংসের স্বাধীন মানুষ।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন