কবিতা          :         মুখ ঢাকার ইতিহাস
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         

কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘মুখ ঢাকার ইতিহাস’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
মুখ ঢাকার ইতিহাস || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
মুখ ঢাকার ইতিহাস || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


মুখ ঢাকার ইতিহাস || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


বাবার মুখ বাঁচাতে গিয়ে
আমি আমার নিজের মুখটা
কোথায় রেখেছিলাম ;
মনে নেই।
জেলগেটের সামনে দাঁড়িয়ে
পাঁচ বছর আগের সেই দুপুরে
আমি প্রথম বুঝেছিলাম ;
কিছু কিছু লজ্জা
নিজের না হলেও
বহন করতে হয়,
নিজের শরীরেই।
রাষ্ট্র যেদিন মিথ্যা দিয়ে
একজন নির্দোষ মানুষকে
শিকলে বাঁধল —
সেদিন থেকে
আমিও বাঁধা পড়লাম
এক অদৃশ্য শিকলে।
বাবার গায়ে যে অত্যাচার
জেলের অন্ধকারে হয়েছিল,
সেই ব্যথার প্রতিধ্বনি
আমার হাড়েও বাজত —
দূর থেকে,
নীরবে,
প্রতিরাতে।
সেই গন্ধটা এখনো মনে আছে।
থানার করিডোরের সেই
বাসি ভাতের গন্ধ,
ঠান্ডা তরকারির গন্ধ,
মানুষের অপেক্ষার গন্ধ —
যে গন্ধে মিশে থাকে
অনেক পরিবারের
না বলা কান্না।
আমিও কাঁদিনি।
কাঁদলে মুখ দেখা যায়,
আর সেদিন
মুখ দেখানোর অনুমতি ছিল না
আমার।
বাইরে তখন লেলিহান কুকুরের দল।
আমার শরীরকে
চিবিয়ে খেতে চাইত যারা —
তাদের মুখের সামনে
বারবার দাঁড়িয়েছি,
বারবার বেঁচে ফিরেছি।
আর প্রতিবার বেঁচে ফিরে
একটু একটু করে
বাবা হয়ে উঠেছি আমি নিজেই।
বাবা তখন জেলের ভেতরে,
আর আমার ভেতরে
বাবা একটা বড় মাংসপিণ্ড হয়ে
বসে আছেন —
তাঁর নিঃশ্বাস আমার বুকে,
তাঁর যন্ত্রণা আমার মেরুদণ্ডে।
বাবা বেরিয়ে এলো
জেলের ভেতর থেকে —
রোদে চোখ কুঁচকে,
একটু রোগা,
একটু অন্যরকম।
আদালত বলল —
বেকসুর খালাস।
যেন এই দুটো শব্দ দিয়ে
মুছে ফেলা যায়
জেলঘরের অন্ধকার,
টর্চারের দাগ,
মিথ্যা মামলার অপমান।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
বাবা মুক্ত হলো।
কিন্তু আমি?
আমার ভেতরে
রাষ্ট্র যে দাগগুলো দিয়ে গেছে —
সেগুলো কোনো আদালত
খালাস করে না।
সেই থানার করিডোর,
সেই জেলগেটের লোহা,
সেই লেলিহান মুখগুলো,
সেই একা একা বাবা হয়ে ওঠার রাতগুলো —
এসব মুছবে কে?
কোন রায়ে?
কোন তারিখে?
বাবার মুখ বাঁচল।
পরিবারের মান বাঁচল।
শুধু আমি জানলাম —
সেদিন থেকে
আয়নার সামনে দাঁড়ালে
একটু বেশি সময় লাগে
নিজেকে চিনতে।
কারণ রাষ্ট্র শুধু
বাবাকে জেল দেয়নি —
রাষ্ট্র আমাকেও
একটা জেল দিয়েছিল।
সেই জেলের
কোনো গেট নেই,
কোনো মুক্তির তারিখ নেই,
শুধু দাগ আছে ;
যা আমি
সারাজীবন
বুকের ভেতর
একা বহন করব।


আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন