উপন্যাস : তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে
লেখিকা : নৌশিন আহমেদ রোদেলা
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল :
লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলার “তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশিত হবে। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি তার ফেসবুক পেজে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
![]() |
| তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা |
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা (পর্ব - ৮)
রাতটা যেন শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না।
জঙ্গলের অন্ধকার আজ অন্যরকম—ঘন, ভারী, নিঃশ্বাসরুদ্ধ করা এক অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে তপোবনের সেই জীর্ণ দোতলা বাড়ি, আর তার বারান্দায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তপু আর মিতু। তাদের সামনে, দূরে জঙ্গলের প্রান্তে, অল্প আলোয় দৃশ্যমান সেই ভয়ংকর মিছিল—ছোট ছোট ছায়াগুলোর নিঃশব্দ অগ্রযাত্রা।
ঘুঙুরের শব্দ এখন আর একক নয়—একটা সম্মিলিত, বিকৃত সুরে বেজে চলেছে।
রিম… ঝিম… রিম… ঝিম…
প্রতিটা শব্দ যেন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনো ইতিহাসকে টেনে তুলছে উপরে।
মিতুর আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে অজান্তেই তপুর হাত শক্ত করে ধরে আছে। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে এসেছে।
“তপু… ওরা আমাদের দিকে আসছে…” — তার গলা প্রায় শোনা যায় না।
তপু উত্তর দেয় না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে সামনে—নিশির উপর।
একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছে তার ভেতরে। ভয় আছে, কিন্তু তার থেকেও বড় কিছু আছে—জানার তীব্র ইচ্ছে।
ছায়াগুলো ধীরে ধীরে আরও কাছে এলো।
এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—ওগুলো শুধু ছায়া না।
প্রতিটা অবয়বই ছোট্ট… শিশু… কিন্তু তাদের শরীরের ভঙ্গি অস্বাভাবিক। কেউ মাথা কাত করে হাঁটছে, কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে পা, কারো হাত অদ্ভুতভাবে বাঁকা।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর—
তাদের কারো চোখ নেই।
অথবা… চোখ থাকলেও সেটা ফাঁকা, প্রাণহীন।
নিশি মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
তার চুলগুলো ভেজা, এলোমেলো। মুখে মাটি লেগে আছে। কিন্তু চোখ—
সেই চোখ দুটো আজ সম্পূর্ণ আলাদা।
সেখানে আর শুধু শূন্যতা নেই—সেখানে আছে অভিমান, প্রতিশোধ, আর অসীম কষ্ট।
তপু ধীরে ধীরে এক পা সামনে এগিয়ে গেলো।
মিতু আঁকড়ে ধরলো,
“না! তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
তপু খুব আস্তে বললো,
“ও আমাদের কিছু বলতে চায়…”
“ওটা কিছু না! ওটা… ওটা মানুষ না!” — প্রায় কেঁদে ফেললো মিতু।
তপু এবার তার হাতটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিলো।
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু অদ্ভুতভাবে দৃঢ়—
“হয়তো ও মানুষ না… কিন্তু ও একসময় ছিল।”
ঠিক তখনই—
নিশি এক পা সামনে এগিয়ে এলো।
তার সাথে সাথে পেছনের সব ছায়াও একসাথে নড়লো।
মনে হলো যেন তারা সবাই এক শরীর, এক ইচ্ছার অংশ।
নিশির ঠোঁট কাঁপলো। তারপর খুব ধীরে বললো—
“ও… আসবে?”
তপুর বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো।
“রুদ্র?”
নিশি মাথা কাত করলো। যেন নামটা শুনে সে কিছু মনে করার চেষ্টা করছে।
তারপর হঠাৎ করেই তার মুখ বিকৃত হয়ে গেলো। চোখের ভেতর লালচে ছায়া নেমে এলো।
“ও… কথা দিয়েছিলো…”
তার কণ্ঠে হাহাকার।
“ও বলেছিলো… ও আমাকে নিয়ে যাবে…”
পেছনের ছায়াগুলো হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে উঠলো। তাদের শরীরগুলো কাঁপতে লাগলো, যেন তারা সবাই একই স্মৃতিতে জেগে উঠেছে।
নিশি আবার বললো—
“কিন্তু ও আসেনি…”
হঠাৎ—
চারপাশের বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেলো কয়েক ডিগ্রি।
মিতু কেঁপে উঠলো।
নিশির চোখ ধীরে ধীরে তপুর দিকে উঠলো।
“তুমি… ওকে আনবে?”
তপু কিছু বলার আগেই—
হঠাৎ করে সব আলো নিভে গেলো।
বাড়ির ভেতরের লন্ঠন, বাইরে থাকা ক্ষীণ আলো—সব।
অন্ধকার।
সম্পূর্ণ, দমবন্ধ করা অন্ধকার।
আর সেই অন্ধকারের ভেতর—
হঠাৎ একসাথে চিৎকার করে উঠলো সবগুলো শিশু।
একটা বিকৃত, হৃদয়বিদারক, অমানবিক চিৎকার।
মিতু চিৎকার করে তপুর হাত ধরে ফেললো।
“তপু!!!”
তপু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সে অনুভব করতে পারছে—
ওরা এখন খুব কাছে।
খুব… খুব কাছে।
তার কানের কাছে যেন কেউ ফিসফিস করে বললো—
“ওকে নিয়ে আয়…”
(ঢাকা — একই সময়)
রুদ্র হঠাৎ করেই বিছানা থেকে উঠে বসলো।
তার বুক ধড়ফড় করছে। কপালে ঘাম।
সে বুঝতে পারছে—
কিছু একটা তাকে ডাকছে।
অনেক বছর পর… আবার।
সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলো। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো।
“না…” — ফিসফিস করে বললো।
“আমি আবার সেখানে যাবো না…”
কিন্তু তার ভেতরের আরেকটা কণ্ঠ বলছে—
“তুমি না গেলে… ওরা থামবে না।”
মারিয়া দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে।
আজ সে প্রথমবারের মতো দ্বিধায় পড়েছে।
“আপনি কোথায় যেতে চান?” — শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলো সে।
রুদ্র ধীরে ধীরে মাথা তুললো।
চোখে সেই পুরনো আগুন ফিরে এসেছে।
“তপোবন।”
মারিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো।
তারপর বললো,
“ওটা কি বিপজ্জনক জায়গা?”
রুদ্র হালকা হেসে উঠলো।
“বিপজ্জনক শব্দটা খুব ছোট হয়ে যাবে…”
সে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে গেলো।
“ওটা এমন একটা জায়গা… যেখানে মানুষ শুধু মরে না—
অপেক্ষা করে।”
(তপোবন — রাত)
আলো ফিরে এসেছে।
কিন্তু—
বারান্দায় কেউ নেই।
না নিশি…
না সেই ছায়াগুলো।
শুধু ঠান্ডা বাতাস… আর অস্বস্তিকর নীরবতা।
মিতু কাঁপতে কাঁপতে বললো,
“…ওরা কোথায় গেলো?”
তপু উত্তর দিলো না।
সে ধীরে ধীরে নিচে তাকালো।
বারান্দার মেঝেতে কাদামাটির দাগ।
ছোট ছোট পায়ের ছাপ।
আর সেই ছাপগুলো—
ঘরের ভেতরের দিকে যাচ্ছে।
তপুর বুক ধক করে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বললো—
“…ওরা চলে যায়নি আপা।”
মিতুর গলা শুকিয়ে গেলো।
“তাহলে?”
তপু মাথা তুললো।
চোখে ভয় আর উপলব্ধির মিশ্র ছাপ।
“ওরা এখন… আমাদের সাথে আছে।”
চলবে ...
৯ম পর্ব পড়তে এখানে ট্যাপ/ক্লিক করুন
লেখক সংক্ষেপ :
তরুণ লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। তবে জানতে পারলে তা অবশ্যই কবিয়াল পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন