উপন্যাস : তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে
লেখিকা : নৌশিন আহমেদ রোদেলা
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল :
লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলার “তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশিত হবে। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি তার ফেসবুক পেজে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
![]() |
| তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা |
তপোবনে যখন সন্ধ্যা নামে || নৌশিন আহমেদ রোদেলা (পর্ব - ৯)
সকালের আলো উঠলেও তপোবনের সেই বাড়িতে কোনো স্বস্তি নামলো না।
রাতের ঘটনার পর সবকিছু যেন বদলে গেছে। বাতাসে এখনও সেই ঠান্ডা ছোঁয়া, দেয়ালের কোণে কোণে অদৃশ্য উপস্থিতির চাপা অনুভূতি। যেন বাড়িটা আর শুধু ইট-কাঠের নয়—এটা এখন একটা জীবন্ত, শ্বাস নিতে থাকা সত্তা… যার ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু বছরের জমে থাকা আর্তনাদ।
মিতু প্রায় সারারাত জেগে কাটিয়েছে। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগেছিলো বটে, কিন্তু ঘুম ভাঙতেই আবার সেই আতঙ্ক ফিরে এসেছে। তপু বরং অদ্ভুতভাবে শান্ত। তার চোখে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে গেছে এক গভীর উপলব্ধি।
সে জানে—
এই গল্পের শেষ না দেখে সে এখান থেকে যেতে পারবে না।
রুহুল আমিন সকালের নাস্তার টেবিলে বসে আছেন, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। তার মুখে সেই পুরনো সৈনিকের গাম্ভীর্য ফিরে এসেছে। চোখে সতর্কতা।
“আজই শহরে যেতে হবে।” — হঠাৎ বললেন তিনি।
মিতু যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো,
“হ্যাঁ বড় মামা, আমরা এখান থেকে চলে যাই—”
“চলে যাওয়ার জন্য না।” — তাকে থামিয়ে দিলেন তিনি।
তপু মাথা তুললো।
“আমাদের একজনকে এখানে আনতে হবে।”
তপুর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটলো।
“রুদ্র।”
(তপোবনের পথে — দুপুর)
বৃষ্টি নামছে হালকা। পাহাড়ি রাস্তা পিচ্ছিল।
একটা জিপ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের দিকে।
স্টিয়ারিংয়ে রুহুল আমিন। পাশে বসে আছে রুদ্র। পেছনে মারিয়া।
গাড়ির ভেতর অস্বস্তিকর নীরবতা।
রুদ্র জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখে সেই পুরনো জায়গার প্রতিচ্ছবি ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। প্রতিটা গাছ, প্রতিটা বাঁক—সবকিছুই তার চেনা।
কিন্তু সেই চেনা জায়গাটাই আজ সবচেয়ে ভয়ংকর।
মারিয়া চুপচাপ বসে আছে, কিন্তু তার চোখ সবকিছু লক্ষ্য করছে। সে বুঝতে পারছে—এই জায়গার সাথে রুদ্রর সম্পর্ক খুব গভীর, খুব ব্যক্তিগত।
“ওখানে কী হয়েছিল?” — হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো সে।
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে বললো—
“ওটা শুধু একটা দুর্ঘটনা ছিলো না…”
গাড়ির ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।
“ওরা শুধু নিশিকে মারে নি…
ওরা একটা পুরো গ্রাম শেষ করে দিয়েছিলো।”
মারিয়ার চোখ সরু হয়ে এলো।
“কেন?”
রুদ্র ঠান্ডা গলায় বললো—
“কারণ তারা জানতো… এই জঙ্গলের নিচে কী আছে।”
(তপোবন — বিকেল)
বাড়ির সামনে জিপ থামতেই তপুর বুক ধক করে উঠলো।
সে দৌড়ে বাইরে এলো।
রুদ্রকে দেখেই থেমে গেলো।
কয়েক সেকেন্ড—
কেউ কিছু বললো না।
শুধু দু’জনের চোখে চোখ পড়লো।
তপু ধীরে বললো—
“তুমি জানো… তাই না?”
রুদ্র তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়লো।
“আমি দেরি করে ফেলেছি…”
মিতু পেছন থেকে এসে দাঁড়ালো। তার চোখে স্পষ্ট ক্ষোভ।
“তুমি কথা দিয়েছিলে, তাই না?” — সরাসরি বললো সে।
রুদ্রর চোখে ব্যথা ঝিলিক দিলো।
“হ্যাঁ…”
“তাহলে তুমি ফিরলে না কেন?”
রুদ্র কোনো উত্তর দিলো না।
কারণ সে জানে—
এই প্রশ্নের কোনো অজুহাত নেই।
ঠিক তখনই—
হঠাৎ করে বাতাস ঠান্ডা হয়ে গেলো।
আকাশ মেঘে ঢেকে গেলো মুহূর্তের মধ্যে।
চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
তারপর—
রিম… ঝিম… রিম… ঝিম…
ঘুঙুরের শব্দ।
সবাই একসাথে ঘুরে তাকালো।
জঙ্গলের দিক থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে সেই ছায়াগুলো।
একটা… দুইটা… অনেকগুলো…
আর মাঝখানে—
নিশি।
এইবার সে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট।
তার মুখে কোনো কান্না নেই।
শুধু শূন্যতা… আর প্রতীক্ষা।
সে সরাসরি তাকালো রুদ্রর দিকে।
দীর্ঘ… ভারী… নিঃশব্দ সেই দৃষ্টি।
রুদ্র এক পা সামনে এগিয়ে গেলো।
তার গলা শুকিয়ে গেছে।
“নিশি…”
নিশির চোখে এক মুহূর্তের জন্য ঝিলিক এলো।
সে ধীরে বললো—
“তুমি… এসেছো…”
রুদ্রর বুক কেঁপে উঠলো।
“আমি দুঃখিত…” — তার কণ্ঠ ভেঙে গেলো।
নিশি মাথা কাত করলো।
“তুমি… দেরি করেছো…”
তার কণ্ঠে অভিযোগ নেই—
শুধু সত্য।
হঠাৎ—
পেছনের সব ছায়া একসাথে কাঁপতে শুরু করলো।
বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।
মাটি কেঁপে উঠলো হালকা।
নিশির চোখ ধীরে ধীরে বদলে গেলো।
শূন্যতা ভরে উঠলো এক অদ্ভুত, ভয়ংকর শক্তিতে।
“তারা… সবাই অপেক্ষা করছিলো…”
তার কণ্ঠ এখন আর শুধু শিশুর না—
অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে কথা বলছে।
“তুমি ফিরবে বলে…”
রুদ্র ধীরে বললো—
“আমি ওদের থামাতে পারিনি…”
“তুমি চেষ্টা করোনি!” — হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো নিশি।
এক মুহূর্তে চারপাশে ঝড় শুরু হলো।
গাছগুলো দুলতে লাগলো।
মিতু তপুর হাত শক্ত করে ধরলো।
নিশি ধীরে ধীরে হাত তুললো।
তার সাথে সাথে পেছনের সব ছায়াও হাত তুললো।
“তুমি প্রতিশ্রুতি ভেঙেছো…”
রুদ্র চোখ বন্ধ করলো।
“…আমি জানি।”
“তাহলে…” — নিশির কণ্ঠ হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেলো—
“তোমাকে থাকতে হবে।”
মাটির নিচ থেকে হঠাৎ কালো ধোঁয়ার মতো কিছু উঠতে লাগলো।
তপুর চোখ বড় হয়ে গেলো।
“ওটা কী—?”
রুহুল আমিন গম্ভীর গলায় বললেন—
“ওটা… ওদের কবর না…”
তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো—
“ওটা একটা ফাঁদ।”
রুদ্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সে জানে—
এইবার পালানোর সুযোগ নেই।
ধীরে ধীরে বললো—
“…ঠিক আছে।”
মিতু চমকে উঠলো,
“তুমি কী বলছো?!”
রুদ্র তাকালো না।
তার চোখ শুধু নিশির উপর।
“আমি থাকবো।”
নিশির ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হাসি ফুটলো।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও আছে—
অশেষ দুঃখ।
তপু চিৎকার করে উঠলো—
“না! এটা শেষ না! আমরা কিছু একটা করতে পারি!”
রুদ্র ধীরে মাথা নাড়লো।
“না… কিছু গল্পের শেষ এভাবেই হয়।”
চলবে ...
১০ম পর্ব পড়তে এখানে ট্যাপ/ক্লিক করুন
লেখক সংক্ষেপ :
তরুণ লেখিকা নৌশিন আহমেদ রোদেলা সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায়নি। তবে জানতে পারলে তা অবশ্যই কবিয়াল পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন