মুক্তমত         :        ধানমণ্ডি ৩২: নীরবতা কি রাষ্ট্রের সম্মতি
লেখক           :         শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রচনাকাল     :         ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬



ধানমণ্ডি ৩২: নীরবতা কি রাষ্ট্রের সম্মতি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
ধানমণ্ডি ৩২: নীরবতা কি রাষ্ট্রের সম্মতি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব

ধানমণ্ডি ৩২: নীরবতা কি রাষ্ট্রের সম্মতি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব



ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি কেবল একটি স্থাপনা ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্মকথার দৃশ্যমান দলিল, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। সেই বাড়িতে আগুন দেওয়া, ভাঙচুর চালানো কিংবা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি বাংলাদেশ, একটি জাতির ইতিহাস, স্মৃতি ও চেতনাকে আঘাত করার শামিল।

যারা এই বাড়িতে আগুন দিয়েছে, তারা হয়তো ভেবেছে একটি রাজনৈতিক প্রতীক মুছে ফেললেই ইতিহাস বদলে যাবে। বাংলাদেশকে মুছে দেয়া যাবে। কিন্তু ইতিহাস ইট-পাথরে আটকে থাকে না। ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, সাহসে, এবং প্রতিরোধে। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি ছিল সেই স্থান, যেখান থেকে ছয় দফার রূপরেখা তৈরি হয়েছে, যেখানে গণআন্দোলনের কৌশল নির্ধারিত হয়েছে, যেখান থেকে ২৫ মার্চের কালরাতে স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছে। সেই বাড়ি পোড়ানো মানে কেবল একটি স্থাপনা নয়, আমাদের স্বাধীনতার পথচলার সাক্ষীকেই আক্রমণ করা।

পাকিস্তানি দালাল ও স্বাধীনতাবিরোধী মানসিকতার লোকেরা বরাবরই চেষ্টা করেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করতে, বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করতে। তারা জানে, ইতিহাসের ভিত্তি দুর্বল করতে পারলে জাতিকে বিভ্রান্ত করা সহজ হবে। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ। এটি নিছক ভাঙচুর নয়, এটি স্মৃতি-রাজনীতির এক নগ্ন প্রকাশ।

বিশ্ব ইতিহাস বলছে, ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করে কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত জার্মানির বার্লিনে কাইজার উইলহেম মেমোরিয়াল চার্চ আজও ধ্বংসস্তূপের অংশ সংরক্ষণ করে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতি ও আত্মসমালোচনার প্রতীক হিসেবে। আফগানিস্তানে বামিয়ান বুদ্ধ ধ্বংসের ঘটনা কিংবা সিরিয়ায় পালমিরা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডকে বিশ্বসভ্যতা ‘সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে দেখেছে। কারণ একটি জাতির ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস মানে তার সাংস্কৃতিক অস্তিত্বে আঘাত।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি আলাদা নয়। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জীবন্ত স্মারক। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি ছিল পাঠ্যবইয়ের বাইরে ইতিহাস শেখার অনন্য একটি জায়গা। যে তরুণরা একাত্তর দেখেনি, তারা এই বাড়ির সিঁড়ি, দেয়াল, কক্ষের ভেতর দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে স্পর্শ করতে পারত। সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়া মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন একটি হামলার পর রাষ্ট্রের নীরবতা। এতে স্পষ্ট, সেসময় এই রাষ্ট্রের প্রধানরাই রাষ্ট্রের ইতিহাস মুছে ফেলতে চেয়েছিল। যে কোনো সভ্য রাষ্ট্রে ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা হলে তাৎক্ষণিক তদন্ত, গ্রেফতার ও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। কারণ রাষ্ট্র জানে, স্মৃতি রক্ষা করা মানে জাতির মর্যাদা রক্ষা করা। যদি অপরাধীরা এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পায়, তবে সেটি ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক নজির হয়ে থাকবে। আজ ধানমণ্ডি ৩২, কাল স্মৃতিসৌধ, পরশু হয়তো অন্য কোনো ঐতিহ্য, অন্য কোনো ঠিকানা।

এখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। ইতিহাসের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মতভেদ কখনোই ভাঙচুর বা আগুনের লাইসেন্স হতে পারে না। গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা হয় যুক্তি দিয়ে, নির্বাচনের মাধ্যমে, মতাদর্শ দিয়ে; হাতুড়ি আর আগুন দিয়ে নয়।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের পোড়া দেয়াল আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: আমরা কি আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চাই, নাকি তাকে সমালোচনা করেও সম্মান করতে শিখব? একটি জাতি পরিপক্ব হয় তখনই, যখন সে তার অতীতকে অস্বীকার না করে, বরং তাকে বুঝে সামনে এগোয়।

আজ প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান। যারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিৎ। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে পালন করা উচিৎ। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি পুনর্নির্মাণ করা হবে কি না, কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার দরকার। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন একটি নৈতিক ঘোষণা—ইতিহাস পোড়ানো যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেও তাঁর নাম মুছে ফেলা যায়নি। তেমনি তাঁর স্মৃতিবাহী একটি বাড়ি ভেঙে দিয়েও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। বরং এমন ঘটনা আমাদের আরও সচেতন করে, আরও দৃঢ় করে।

ধানমণ্ডি ৩২ আজ ধ্বংসস্তূপ হতে পারে। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই যদি আমরা ইতিহাস রক্ষার শপথ নেই, তবে সেটিই হবে প্রকৃত জবাব। আগুনে পুড়ে যায় কাঠামো, কিন্তু চেতনা নয়। আর যে জাতি তার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে পরাজিত করা যায় না।





মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com


 Follow Now Our Google News



লেখক সংক্ষেপ:
কবি শিমুল চৌধুরী ধ্রুব তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপিতে' নিজের পরিচিতি সম্পর্কে লিখেছেন ❝নাম, ধাম, বয়স, জন্ম, সময়-বিবিধের বেড়াজালে আমি কোনোদিন হারাতে চাইনি এবং ভবিষ্যতেও চাইনা। বইয়ের শেষ পৃষ্টা উল্টিয়ে কবি'র পরিচয় পাওয়া কি আদৌ সম্ভব! কবি যুবক নাকি বৃদ্ধ, ধনী নাকি দরিদ্র, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিনা, এসব আমার কাছে বরাবরই অপ্রাসঙ্গিক। কবির পরিচয় নিহিত থাকে মূলত তার সন্তানসম কবিতায়। 
আমার পরিচয়ের কথা যদি বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে আমি অতি সাধারণ এবং নগন্য এক মানুষ। এর বাইরে দেবার মতো পরিচয় আমার নেই।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন