মুক্তমত : পুরুষত্বের পুনর্নির্মাণ জরুরিঃ নারীর শরীর কি জনসম্পত্তি?
লেখক : শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রচনাকাল : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
![]() |
| পুরুষত্বের পুনর্নির্মাণ জরুরিঃ নারীর শরীর কি জনসম্পত্তি? || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব |
পুরুষত্বের পুনর্নির্মাণ জরুরিঃ নারীর শরীর কি জনসম্পত্তি? || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানে—জনসমাগমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী। আচমকা পেছন থেকে একটি হাত তার স্তনের উপর। ঘটনাটি হয়তো কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই আমাদের সমাজ সম্পর্কে একটি গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি সত্যিই নারীদের জন্য নিরাপদ জনপরিসর গড়ে তুলতে পেরেছি?
এ ধরনের ঘটনায় প্রায়ই কেউ কেউ বলেন, “এতে এমন কী হয়েছে?” এই প্রশ্নটিই সমস্যার গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। কারণ যখন অসম্মানকে আমরা তুচ্ছ করি, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন নয়, সামাজিক মানদণ্ডের অবনতি।
অনেকেই ‘যৌন সহিংসতা’কে কেবল চরম অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেন। কিন্তু সম্মতি ছাড়া যে কোনো স্পর্শই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর আঘাত। এটি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রয়োগ। এটি একটি বার্তা—“তোমার শরীরের ওপর আমার অধিকার আছে।” সেটা তারা বোঝেন না, অথবা এড়িয়ে যান।
এই মনোভাব একদিনে তৈরি হয় না। পরিবারে, শিক্ষায়, বন্ধুমহলে—বিভিন্ন স্তরে এটি গড়ে ওঠে। ছেলেদের অনেক সময় শেখানো হয়, “এমন একটু দুষ্টুমি চলেই। এটা ছেলেদের জন্য স্বাভাবিক।” মেয়েদের শরীর নিয়ে মন্তব্যকে স্বাভাবিক ধরা হয়। প্রতিবাদ না থাকলে এই আচরণ সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। ফলে অপরাধী ভাবতে শেখে, এতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু ক্ষতি হয়। এবং তা গভীর।
যদি একটু ঘুরে তাকান, দেখবেন— যৌন হয়রানির শিকার নারীরা প্রায়ই দ্বৈত আঘাতের মুখোমুখি হন। প্রথমত, ঘটনার সরাসরি অপমান। দ্বিতীয়ত, সামাজিক প্রতিক্রিয়া। “কী পরেছিলে?” “কোথায় ছিলে?”—এই প্রশ্নগুলো অনেক সময় অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর দিকে আঙুল তোলে। এর ফলে অনেক নারী নিজেকেই দায়ী ভাবতে শুরু করেন। জনসমাগমে অস্বস্তি তৈরি হয়। ভিড়ে হাঁটার সময় সতর্কতা বেড়ে যায়। অপরিচিত কারও উপস্থিতি আতঙ্কের কারণ হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, নারীরা কেবল ভুক্তভোগী নন; তাঁরা সক্ষম। সহমর্মী পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে তাঁরা নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারেন। কিন্তু সমাজ যদি সন্দেহ ও দোষারোপের পরিবেশ তৈরি করে, তবে সেই পুনর্গঠন কঠিন হয়ে ওঠে।
আমাদের সমাজে অন্যতম সমস্যার নাম ‘নীরবতার সংস্কৃতি’। এ ধরনের অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না। লজ্জা, সামাজিক চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেন না। তখন এই নীরবতা অপরাধীর পক্ষে যায়। শাস্তিহীনতার ধারণা তৈরি হয়। অপরাধ পুনরাবৃত্তি ঘটে। নীরবতা ভাঙা তাই জরুরি। কারণ প্রতিটি উচ্চারিত অভিযোগ অন্যদের জন্য সাহসের উৎস হতে পারে।
যখন জনপরিসর নারীর জন্য নিরাপদ থাকে না, তখন তার প্রভাব বহুমাত্রিক। পরিবারগুলো মেয়েদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করে। অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই সীমাবদ্ধ করা হয়। এতে নারীর শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি সমাজ তখনই অগ্রসর হয়, যখন তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী স্বাধীনভাবে চলতে পারে। নিরাপত্তাহীনতা সেই অগ্রগতির পথে বড় বাধা।
আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার প্রয়োগের ওপর। অভিযোগ প্রক্রিয়া সহজ ও সংবেদনশীল হতে হবে। ভুক্তভোগী যেন দ্বিতীয়বার অপমানিত না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত তদন্ত ও বিচার অপরাধীর জন্য স্পষ্ট বার্তা দেয়। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্মতি, লিঙ্গসমতা ও পারস্পরিক সম্মান বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। গণপরিবহন ও জনসমাগমস্থলে নজরদারি বাড়ানোও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। তবে আইন একাই সমাধান নয়। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া টেকসই ফল আসবে না।
মূল সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতার অসম ধারণা। “পুরুষ মানেই কর্তৃত্ব”—এই ধারণা বদলাতে হবে। পুরুষত্বের অর্থ হওয়া উচিত দায়িত্ব, সংবেদনশীলতা ও সম্মান। বন্ধুমহলে কেউ নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করলে প্রতিবাদ করা প্রয়োজন। নীরব থাকা মানে পরোক্ষ সমর্থন। পরিবারে ছেলেদের শেখাতে হবে, সম্মতি ছাড়া কোনো আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। নারীকে রক্ষা করার বস্তু নয়, সমান নাগরিক হিসেবে দেখার শিক্ষা দিতে হবে।
কারও কাছে এটি হয়তো ক্ষুদ্র ঘটনা। কিন্তু সেই ক্ষুদ্র ঘটনাই কারও আত্মসম্মানকে আঘাত করতে পারে। আমরা যদি সত্যিই নিরাপদ সমাজ চাই, তবে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। কারও অস্বস্তি কখনো মজা নয়। কারও অপমান কখনো বিনোদন নয়।
সম্মান ও সম্মতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি—সবার দায় আছে। সবচেয়ে বড় দায় পুরুষেরই। তাই পরিবর্তন শুরু হোক এখান থেকেই।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
লেখক সংক্ষেপ:
কবি শিমুল চৌধুরী ধ্রুব তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপিতে' নিজের পরিচিতি সম্পর্কে লিখেছেন ❝নাম, ধাম, বয়স, জন্ম, সময়-বিবিধের বেড়াজালে আমি কোনোদিন হারাতে চাইনি এবং ভবিষ্যতেও চাইনা। বইয়ের শেষ পৃষ্টা উল্টিয়ে কবি'র পরিচয় পাওয়া কি আদৌ সম্ভব! কবি যুবক নাকি বৃদ্ধ, ধনী নাকি দরিদ্র, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিনা, এসব আমার কাছে বরাবরই অপ্রাসঙ্গিক। কবির পরিচয় নিহিত থাকে মূলত তার সন্তানসম কবিতায়।আমার পরিচয়ের কথা যদি বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে আমি অতি সাধারণ এবং নগন্য এক মানুষ। এর বাইরে দেবার মতো পরিচয় আমার নেই।❞
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন