গল্প : মেয়েটি শুধু কাঁদতে এসেছিলো
গল্পকার : সমর চক্রবর্তী
গ্রন্থ : রঙিন স্বপ্নের বাসিন্দারা
প্রকাশকাল : বইমেলা ফেব্রুয়ারি/ ২০০১
রচনাকাল :
কবি ও লেখক সমর চক্রবর্তীর “মেয়েটি শুধু কাঁদতে এসেছিলো” শিরোনামের এই ছোট গল্পটি তার 'রঙিন স্বপ্নের বাসিন্দারা' গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। এ গল্পটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
মেয়েটি শুধু কাঁদতে এসেছিলো || সমর চক্রবর্তী
অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে মেয়েটি একটি আশ্রয় খুঁজে পেলো। বৃষ্টি ভেজা অন্ধকারে সে যেমন, অচেনা এই বাড়িতে উঠে এসেছিলো, বৃষ্টি রক্ষাকারী বাড়ীর ছাদের নিচে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো তেমনি অনেকক্ষণ।
মেয়েটি কোনো কথা বলছে না,
জরুরী কোন বিষয় নেই যেন তার।
মেয়েটি কোনো কথা বলছে না,
সে হাঁপাচ্ছে।
মেয়েটি কোনো কথা বলছে না;
দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠা নামার শব্দ প্রবলতর হয়ে নিঃশব্দ অন্ধকার ঘরের ভেতর ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে যেন। মেয়েটি নিশ্চুপ।
তার শরীর থেকে বৃষ্টির ভেজা জল চির চির করে অন্ধকার ঘরের মেঝের ধুলো বালি ধুয়ে দিচ্ছে। আমি অন্ধকার মধ্যেই, মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম তার নাম। মেয়েটি বলল, তার কোন নাম নেই!
আমি বললাম, সে ফুল ভালোবাসে কি' না?
মেয়েটি বলল, তার বাড়ির কোনো ছাদ নেই। টব নেই।
আমি বললাম, আমার ঘরেও বিদ্যুতের কোনো সংযোগ নেই।
মোমবাতির আলোয় কাজ চালিয়ে যাই।
মেয়েটি বলল, অন্ধকার বেশ, মোমবাতি জ্বালাবেন না প্লীজ। আমি নগ্ন।
আমি আঁৎকে উঠলাম।
মেয়েটি আবার হাঁপাচ্ছে
বুকে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস ওঠা নামার শব্দ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে।
আমি অন্ধকারেই তার আক্ষরিক শরীর অলৌকিক আলোয় বেশ পড়তে শুরু করে দিয়েছি ইতিমধ্যে।
মেয়েটি বলল, আমি একা থাকি কি'না?
আমি বললাম, আমার স্ত্রী আজ বাড়ি ফেরেনি!
মেয়েটি বলল, আমার দরোজা রাতেও এ্যামন ভাবে প্রতিদিন খোলা থাকে কি' না?
আমি বললাম, যে রাত্রে আমার স্ত্রী গভীর কোনো কাজে আটকে যায়, সেই রাত্রেই শুধু আমি দরজা খুলে উন্মুখ হয়ে বসে থাকি।
তারপর মেয়েটি আর কোনো কথা বলল না।
আমি ভাবছি আমার স্ত্রী ঘরে ফেরেনি আজ রাতে।
বাইরে বৃষ্টি। ভেতরেও বৃষ্টি। মেয়েটির শরীরের মতোই আমার স্ত্রীর শরীরেও চাপ্ চাপ্ বৃষ্টি লেগে আছে হয়তো!
আমার শোবার ঘরে বিদ্যুৎ নেই। মোমবাতির আলো নেই। বিছানা এলোমেলো। বালিশ এলোমেলো। এলোমেলো তার অর্ন্তবাস-ব্র্যা -------
মেয়েটি মদের পেয়ালার শেষ পেগের মোহময় মাতন সুরে আমাকে ডাকলো, আমি তখন তন্ময় আগুনের আভায় দৌড়ে দৌড়ে বার বার নিজের কাছে প্রশ্ন করছিঃ
মেয়েটি কে? সে কোথা থেকে---- ক্যানো---- কিভাবে এসেছে এখানে? কী নাম তার?
ভাবলাম, কবি বন্ধু আশিক মোস্তফার কথা।
সে বলেছিলো, ফুলের নামে মেয়েরা দারুন ফুল হয়, গোপনে গন্ধরাজ!
আমি হেসেছিলাম। আশিক আবার বলেছিলো,
যেমন ছাতিমগাছ ----- শরতের অন্ধকারে হিম গন্ধতার ---- নিরবে ছড়ায়-
আমি শুনেছিলাম আর হেসেছিলাম। বলেছিলাম, কবি তুই। তোর অনেক চোখ আছে। যা, ইন্দ্রিয়জ তা, তোর কাছে শিল্প।
আমি নিতান্তই সাধারণ, শিল্পের রহস্য আমার কাছে নিতান্তই বাজারের আলু মরিচ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের চেয়ে অধিক বিস্ময়কর বৈ নয়।
ক্যানোনা আমার যে চোখ, সে চোখে কখোনো স্বপ্ন দ্রবীভূত হয়নি। তাই স্বপ্নকে শুধুই স্বপ্ন ভেবেছি। কখনো রঙিন স্বপ্ন অথবা স্বপ্নের বিস্তৃত পরিধি নিয়ে ব্যাখ্যা করার সাধ বা সাধ্য আমার নেই। আমি নিতান্তই সাধারণ। অতএব, মেয়েটি, গন্ধরাজ অথবা ছাতিমগাছ যাইহোক না ক্যানো, আমি নারীকে নারী ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারি না।
মেয়েটি বলল, তার কিছু একটা প্রয়োজন। নগ্নতা তাকে বিপর্যস্ত করছে।
অতঃপর আমি অন্ধকারে হতড়ে হাতড়ে আমার স্ত্রীর একখানা শাড়ি খুঁজে পেলাম।
শাড়িতে আমার স্ত্রীর শীরের গন্ধ লেগে আছে।
সে আজ বাড়িতে নেই।
তার সৌরভ তার অস্তিত্ব-
তার অস্তিত্ব তার সৌরভ আমার সারা শরীর জুড়ে------
সারা ঘরময় মৌ মৌ ঘ্রাণে ---------- সুরভিত ------
আমি বললাম, আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না।
মেয়েটি বলল, কথা বলছি, এগিয়ে আসুন --------
আমি ঠিক ঠিক পৌছে গেলাম মেয়েটির কাছে। আমার উষ্ণ হাত তার শরীরে পড়তেই সে কেঁপে উঠলো।
মেয়েটি নগ্ন। আমি ভাবলাম।
মেয়েটির শুভ্র সতেজ স্তন সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হোয়ে জেগে আছে। আমি স্পর্শ করলাম-
আমার বুক কেঁপে উঠলো।
আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো।
সহস্রবার চিৎকার করে আমি জেগে উঠলাম যেন,
মেয়েটি বলল, না---
আমি বললাম, আমার স্ত্রী আজ বাড়ি ফেরেনি। বাড়িতে নেই, নেই---
নেই --- নেই--- ই-ই-ই-- ফেরেনি--- নি-নি-নি-নি- (প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো শব্দগুলো মাঝরাতে চার দেওয়ালের মাঝখানে)
মেয়েটি বলল, আমি আপনার স্ত্রী নই, আমি পালিয়ে এসেছি,
আমি বললাম, আমার স্ত্রীও মাঝে মাঝে পালিয়ে যায়।
মেয়েটি, কেঁপে উঠলো যেন, আবার নিশ্চুপ।
আমি বললাম, দরজা খোলা আছে।
মেয়েটি কোনো কথা বলল না।
আমি বললাম, আপনি কে, আপনাকে এ্যাখানো দেখিনি, পরিচয়ও জানা নেই। অতএব আপনি চলে যেতে পারেন।
মেয়েটি বলল, না।
আমিও নিরুত্তর রইলাম।
মেয়েটি কেঁদে উঠলো এবার। ডুকরে ডুকরে আর্তনাদ করে বলল, আমি পালিয়ে এসেছি।
সারারাত অন্ধকার বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পালিয়ে এসেছি।
আমি খুব অতৃপ্ত। তবু আমি সরল, আমার অস্তিত্ব সরল, আমি সরল, তবু আমি অতৃপ্ত।
ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অতৃপ্ত। মনে অতৃপ্ত। আমার স্বামী হয় ক্ষণস্থায়ী।
আমি মেয়েটিকে স্বাভাবিক এবং সাবলীল স্বযত্ন ভঙ্গিতে অন্ধকারেই আমার স্ত্রীর শাড়ি তার শরীরে মুড়ে দিলাম।
মেয়েটিকে এ্যাখোন আমার স্ত্রীর সরল অস্তিত্ব বলে মনে হচ্ছে।
মেয়েটিকে আমার স্ত্রীর অনুকরণ বলে মনে হচ্ছে।
মেয়েটিকে এ্যাখোন আমার স্ত্রীর প্রতিবিম্ব বলে মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, আপনি নও, তোমার গল্প বলো।
মেয়েটি বলল, লোডসেডিং রাস্তায় অনেক খুঁজে খুঁজে একটি মাত্র দরোজা খোলা পেয়েছি-
মেয়েটি বলল, আমি অতৃপ্ত, আমার স্বামী অতৃপ্ত, সে হয় ক্ষনস্থায়ী। আমার স্বামীর বাহুবন্ধ থেকে পালিয়ে এসেছি। মেয়েটি আর কোনো কথা বলতে পারলো না। ডুকরে কেঁদে উঠলো। আমার মতোই ঘেমে উঠতে লাগলো অতঃপর।
আমি দ্রুত দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে মোমবাত জ্বালিয়ে দিলাম ঘরে।
ঘরখানা রহস্যময় হোয়ে উঠলো। মেয়েটি মুখে দু'হাত চেপে নিচু হোয়ে আমার বিছানায়-আমার স্ত্রীর এলোমেলো বিছানায় বসে রইলো।
আমি চমকে উঠলাম মেয়েটির দিকে তাকিয়ে।
এ্যাখোন অবিকল আমার স্ত্রীর প্রতিবিম্ব সে।
মোমবাতি জ্বলে ওঠার সাথে সাথে এক ঝটকায় আমার স্ত্রীর শাড়ী ঘরের মেঝেয় ফেলে দিলো-
আমি সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যক্ষ করলাম, তার মসৃন ঠোঁট, পিচ্ছল নাভীমূল-ভরাট শরীর-বাঁকানো কোমর, মিহিন জোছনার মতো শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তখন আমার ক্যাবলই মনে হতে থাকলো, দেবী ভেনাস কী দেখতে এ্যামনই ছিলেন? অতৃপ্ত ছিলেন কী এ্যামন আফ্রোদিতি?
আমি জোর করে মেয়েটির মুখ থেকে দু'হাত সরিয়ে দিলাম------
মেয়েটি চিৎকার করে উঠলো, আমি কাঁদতে এসেছি ----, কাঁদতে এসেছি-----
অতঃপর সেই রাতে আমার স্ত্রী আর বাড়ি ফেরেনি। মেয়েটি সারারাত আমার-আমার স্ত্রীর বিছানায় --- আমি এবং মেয়েটি এবং আমি সারারাত ----সারারাত কাঁদলাম।
মেয়েটি যেমন আমার ঘরে কাঁদতে এসেছিলো ---
আপনার লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
সমর চক্রবর্তী’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
- বঙ্গ নগরীর বাউলাকাশ (0000)
- রঙিন স্বপ্নের বাসিন্দারা (গল্পগ্রন্থ) (২০০১)
- দিগন্তের স্বপ্নারোহী
- আদিম অশ্বের পিঠে (কবিতা)
- নক্ষত্র মরে মরে গ্রহ হয়ে যায়
- বঙ্গীয় সভ্যতার লীলাভূমিঃ ভূষণা নগর রাজ্যের ইতিহাস (গবেষণাধর্মী গ্রন্থ)
- অন্ধকার ডানার মানুষ (কবিতা)
- ছায়াছায়া মুখ (উপন্যাস)
- লবণ সংক্রামক প্রার্থণা (কবিতা)
লেখক সংক্ষেপ:
১৯৭৩ সালের ১৫ মার্চ জন্ম নেয়া কবি সমর চক্রবর্তী দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, তিনি পরিচিতি পেয়েছেন তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। নব্বই দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবির কাছে সাহিত্যই ধ্যান-জ্ঞান। সাহিত্য সাধনার জন্য তিনি সরকারি চাকরি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদ বারবার ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস—সাহিত্য কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি এক ধরনের সাধনা।সমর চক্রবর্তী সার্বক্ষণিক কবি ও সব্যসাচী লেখক। কবিতা, গল্প থেকে গবেষণাধর্মী ইতিহাস—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। পাঠক ও সমসাময়িক লেখক—উভয়ের জন্যই তিনি লিখেছেন নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে। মানবিক মূল্যবোধ ও প্রতিবাদী চেতনা তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।এ পর্যন্ত তিনি ১২টি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে দিগন্তের স্বপ্নারোহী, আদিম অশ্বের পিঠে, নক্ষত্র মরে মরে গ্রহ হয়ে যায়, রঙিন স্বপ্নের বাসিন্দারা প্রভৃতি। তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ভূষণা রাজ্যের ইতিহাস বিশেষভাবে প্রশংসিত।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন