মুক্তমত : শিশু ধর্ষণ ও হত্যা: মানসিক বিকার নয়, নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি
লেখক : শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ০৪ মার্চ, ২০২৬
রচনাকাল : ০৪ মার্চ, ২০২৬
![]() |
| শিশু ধর্ষণ ও হত্যা: মানসিক বিকার নয়, নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব |
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা: মানসিক বিকার নয়, নৈতিক অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক–এ আট বছরের এক নিষ্পাপ শিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে যৌন সহিংসতার চেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার যে ঘটনা ঘটেছে, তা কেবল একটি অপরাধের বিবরণ নয়—এটি আমাদের সভ্যতার আয়নায় ভেসে ওঠা এক অন্ধকার মুখচ্ছবি। পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমাদের সামাজিক আস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন, তা শোনার পর ক্ষোভ, লজ্জা ও শোক একসঙ্গে হৃদয়ে জমাট বাঁধে।
কিন্তু আবেগের বিস্ফোরণ যতই প্রবল হোক, আমাদের থেমে গিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে—এমন অপরাধের উৎস কোথায়? এটি কি কেবল মানসিক বিকার, নাকি আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত নৈতিক অবক্ষয়ের ফল?
মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার যথার্থই বলেছেন, “সব মানুষ এক নয়।” সত্যিই, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পথেই চলেন। কিন্তু অল্পসংখ্যক মানুষের ভেতরে বিকৃত ক্ষমতালিপ্সা, নিয়ন্ত্রণের উন্মাদ আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিহিংসার বিষবৃক্ষ বেড়ে ওঠে। যৌন সহিংসতা কেবল শরীরের অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতার প্রদর্শন, প্রতিশোধের ভাষা এবং বিকৃত আত্মতৃপ্তির নগ্ন প্রকাশ।
অনেক সময় শৈশবের সহিংস অভিজ্ঞতা, অবহেলা, দমিত ক্রোধ বা অমীমাংসিত মানসিক ক্ষত একজন মানুষকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি—প্রতিকূল শৈশব অপরাধের বৈধতা নয়। অধিকাংশ মানুষ প্রতিকূলতা পেরিয়েও মানবিক থাকেন। অতএব, অপরাধের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলা চলবে না।
আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা আছে—এ ধরনের অপরাধীকে দ্রুত “পাগল” আখ্যা দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া। এতে একদিকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার জোরদার হয়, অন্যদিকে অপরাধের নৈতিক দায় আড়াল হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী জানে সে কী করছে। সে জানে এটি অন্যায়, আইনবিরুদ্ধ ও নৃশংস—তবু সে করে, কারণ তার কাছে ইগো, প্রতিশোধ বা বিকৃত ক্ষমতাবোধ মানবিকতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
অতএব, সমাধান কেবল মনোরোগের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন, সামাজিক জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ ও দৃঢ় প্রয়োগ। দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার কেবল শাস্তি নয়, এটি সমাজকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—অপরাধের পরিণতি অনিবার্য।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বিশ্বাস করবো কাকে? প্রতিবেশী, পরিচিতজন, এমনকি আত্মীয়—কার ওপর ভরসা রাখবো? কিন্তু আতঙ্ক কোনো টেকসই সমাধান নয়। সমাধান হলো সচেতনতা, প্রতিরোধ ও সংগঠিত সামাজিক দায়িত্ববোধ।
শিশু সুরক্ষার প্রথম দায়িত্ব পরিবারে। শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কতক্ষণ বাইরে থাকছে—এসব বিষয়ে সতর্ক নজরদারি অপরিহার্য। একই সঙ্গে বয়সোপযোগী ভাষায় শিশুদের শেখাতে হবে ব্যক্তিগত সীমারেখা, “গুড টাচ–ব্যাড টাচ”–এর পার্থক্য, এবং বিপদের মুহূর্তে কীভাবে সাহায্য চাইতে হয়। নীরবতা ভাঙার সাহস গড়ে তোলা শিশু সুরক্ষার একটি মৌলিক স্তম্ভ।
তবে দায়িত্ব কেবল পরিবারের নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় কমিউনিটি নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি, এবং সন্দেহজনক আচরণে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যক্তিগত বিরোধ বা প্রতিহিংসার লক্ষ্যবস্তু যেন কোনো শিশুই না হয়—এটি সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।
শিশুর ওপর আঘাত মানে কেবল একটি জীবনের ক্ষত নয়; এটি ভবিষ্যতের ওপর আঘাত। যখন একটি শিশু ভয়, সহিংসতা বা অবিশ্বাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হয়, তখন সমাজের ভেতরেই অদৃশ্য ফাটল তৈরি হয়। আমরা যদি সেই ফাটল মেরামত করতে ব্যর্থ হই, তবে আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায় এড়ানো সম্ভব নয়।
এই নির্মম ঘটনার পর আমাদের সামনে দুটি পথ—ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া, অথবা নৈতিক পুনর্জাগরণ ও সামাজিক সংহতির পথে এগিয়ে যাওয়া। শিশুদের নিরাপত্তা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত নৈতিক অঙ্গীকার।
“শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ”—এই বাক্যটি যেন আর কেবল আনুষ্ঠানিক উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না থাকে। এটি হোক আমাদের সামাজিক চুক্তি, আমাদের নৈতিক প্রতিশ্রুতি, আমাদের প্রতিদিনের সতর্কতা। কারণ একটি শিশুর নিরাপদ হাসিই একটি সুস্থ সমাজের প্রকৃত পরিচয়।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
লেখক সংক্ষেপ:
কবি শিমুল চৌধুরী ধ্রুব তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপিতে' নিজের পরিচিতি সম্পর্কে লিখেছেন ❝নাম, ধাম, বয়স, জন্ম, সময়-বিবিধের বেড়াজালে আমি কোনোদিন হারাতে চাইনি এবং ভবিষ্যতেও চাইনা। বইয়ের শেষ পৃষ্টা উল্টিয়ে কবি'র পরিচয় পাওয়া কি আদৌ সম্ভব! কবি যুবক নাকি বৃদ্ধ, ধনী নাকি দরিদ্র, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিনা, এসব আমার কাছে বরাবরই অপ্রাসঙ্গিক। কবির পরিচয় নিহিত থাকে মূলত তার সন্তানসম কবিতায়।আমার পরিচয়ের কথা যদি বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে আমি অতি সাধারণ এবং নগন্য এক মানুষ। এর বাইরে দেবার মতো পরিচয় আমার নেই।❞
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন