মুক্তমত         :        ৭ই মার্চ: বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে বাঙালির হৃদয়ে সূর্যোদয়
লেখক           :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ 
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ৭ মার্চ, ২০২৬
রচনাকাল     :         ৭ মার্চ, ২০২৬


৭ই মার্চ: বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে বাঙালির হৃদয়ে সূর্যোদয় || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
৭ই মার্চ: বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে বাঙালির হৃদয়ে সূর্যোদয় || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ 


৭ই মার্চ: বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠে বাঙালির হৃদয়ে সূর্যোদয় || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ



বাংলার ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো সময়ের ক্যালেন্ডারে কেবল একটি তারিখ হয়ে থাকে না; বরং হয়ে ওঠে জাতিসত্তার ভোরবেলা। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তেমনই এক অনির্বচনীয় দিন—যেদিন দীর্ঘ দাসত্বের অন্ধকারে নিমজ্জিত বাঙালি জাতির হৃদয়ে প্রথম পূর্ণ সূর্যোদয়ের আলোকরেখা উদ্ভাসিত হয়েছিল। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের উত্তাল সমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ উচ্চারণ করেছিলেন, তা ছিল নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; তা ছিল ইতিহাসের অন্তঃস্থলে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপের মতো এক মহামুহূর্ত—যেখানে শব্দ হয়ে উঠেছিল শপথ, উচ্চারণ হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহ, আর আহ্বান হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পূর্বলগ্ন।

তৎকালীন পাকিস্তানি শাসনযন্ত্রের দীর্ঘ শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক অবমাননার ভারে ন্যুব্জ বাঙালি জাতি তখন ক্রমেই বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত স্মৃতি, গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিন, এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি ধারাবাহিক অবজ্ঞা—সবকিছু মিলিয়ে জাতির বুকের ভেতর জমে উঠেছিল মুক্তির অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা। সেই সংকটঘন সময়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর যেন বজ্রবিদ্যুতের মতো আকাশ চিরে উচ্চারিত হলো—যা মুহূর্তেই সমগ্র জাতিকে এক অভিন্ন চেতনায় সংহত করেছিল।

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই উচ্চারণ কেবল একটি বাক্য ছিল না; এটি ছিল এক পরাধীন জাতির আত্মঘোষিত নিয়তি। সেই মুহূর্তে রেসকোর্স ময়দান যেন রূপান্তরিত হয়েছিল ইতিহাসের এক বিশাল প্রাঙ্গণে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ভেতরে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল স্বাধীনতার দীপ্ত আত্মবিশ্বাস। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বিরতি, প্রতিটি দৃপ্ত আহ্বান মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, যেন বহু শতাব্দীর দমিত আকাঙ্ক্ষা একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে উঠছে।

এই ভাষণের বিস্ময়কর শক্তি ছিল এর বহুমাত্রিক আবেদন। এটি যেমন রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য দলিল, তেমনি ছিল আবেগ, সাহস এবং কৌশলের অতুলনীয় সংমিশ্রণ। বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়েও জাতিকে এমন এক মানসিক প্রস্তুতির স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহর, প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের অদৃশ্য ঘাঁটি।

এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল সমগ্র বাঙালি সমাজ—পুরুষ, নারী, তরুণ, বৃদ্ধ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী—সকলেই। বাংলার নারীসমাজও সেই মুহূর্তে এক নতুন আত্মপরিচয়ের দীপ্তিতে জেগে উঠেছিল। ঘরের অন্তরাল ভেঙে তারা উপলব্ধি করেছিল যে স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি মর্যাদার প্রশ্ন, অস্তিত্বের প্রশ্ন, এবং আগামী প্রজন্মের মুক্ত ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

৭ই মার্চের ভাষণ তাই কেবল ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায় নয়; এটি বাঙালি জাতির মানসিক মুক্তির সূর্যোদয়। সেই দিনের বজ্রকণ্ঠ আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—কীভাবে একটি সত্য উচ্চারণ, একটি সাহসী নেতৃত্ব এবং একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে।

আজ যখন স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে সূর্য উদিত হয়, তখন সেই আলোয় আমরা যেন এখনও শুনতে পাই বঙ্গবন্ধুর সেই অমর আহ্বান—যা একদিন পরাধীনতার অন্ধকার ভেদ করে বাঙালির হৃদয়ে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটিয়েছিল। ৭ই মার্চ তাই চিরকাল থাকবে বাঙালির আত্মজাগরণের দিবস, সাহসের প্রতীক এবং মুক্তির অগ্নিশিখা হয়ে।




মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com



 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস



লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন