কবিতা : অ্যান্টিমেট্রিক শোকের অক্ষাংশহীন মহাদেশ
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ৩১ মার্চ, ২০২৬ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘অ্যান্টিমেট্রিক শোকের অক্ষাংশহীন মহাদেশ’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| অ্যান্টিমেট্রিক শোকের অক্ষাংশহীন মহাদেশ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
অ্যান্টিমেট্রিক শোকের অক্ষাংশহীন মহাদেশ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
দুঃখের কোনো পরিমাপক একক নেই—তবু আমরা সবাই যেন বুকের ভেতর এক অদৃশ্য সার্ভেয়ারের মতো ঘুরে বেড়াই, প্রতিদিন নিজের ক্ষতের ওপর টেনে দিই অদৃশ্য ফিতে। যদি সত্যিই দুঃখ মাপা যেত, তবে হয়তো মানুষের হাসির নিচে ছোট ছোট স্কেল ঝুলে থাকত—এইটুকু পরিমাণ অভিমান, এইটুকু পরিমাণ বঞ্চনা, এইটুকু পরিমাণ অপমান; কিন্তু দুঃখ তো গণিতের শাসন মানে না, সে জ্যামিতির অবাধ্য সন্তান। সে ত্রিভুজ নয়, যে কোণ গুনে বোঝা যাবে; সে বর্গ নয়, যে চারদিকে সমান; সে আয়তক্ষেত্র নয়, যে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ধরা পড়ে। দুঃখ বরং এক বহুপদী অন্ধকার—অক্টোপাসের মতো তার কিলবিলে হাত, প্রতিটি হাতের ডগায় একেকটি অতীত; সে স্মৃতিকে চেপে ধরে, সম্ভাবনাকে শ্বাসরোধ করে, ভালোবাসাকে কালো কালি বানিয়ে ফেলে। আবার কখনো সে তারা-মাছের মতো—সমুদ্রতলের নিঃসঙ্গ নক্ষত্র, যে আলো দেয় না, শুধু লবণাক্ততা বাড়ায়। কখনো সে নীলতিমির মতো গভীর—এক বিশাল, গম্ভীর দেহে বহন করে ডুবে যাওয়া শত শহরের কান্না; তার বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে, কিন্তু সেই ঢেউ কারো কানে পৌঁছায় না।
মানুষ এক দেশ পরিমাণ দুঃখ নিয়ে দিব্যি হাঁটে—স্কুলে যায়, কলেজে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে দাঁড়িয়ে তর্ক করে; অফিসে ফাইল উল্টায়, মাঠে বল ছোঁড়ে, রেলস্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকে, বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে সময় মাপে। অথচ তার বুকের ভেতর যে ভূখণ্ড, সেখানে প্রতিদিন গৃহযুদ্ধ চলছে। আমরা মুখে যে হাসি পরি, তা আসলে এক রাষ্ট্রীয় প্রপাগান্ডা—ভেতরের ক্ষুধা ঢাকার জন্য। হাংরি দুঃখ আমাদের ভেতরে দাঁত বসায়; সে শুধু ভালোবাসা খায় না, আত্মসম্মানও খায়, স্বপ্নও খায়, ঈশ্বরের ধারণাকেও খেয়ে ফেলে। আমরা বাইরে সভ্য, ভেতরে দুর্ভিক্ষ।
দুঃখকে আমি দেখি গলির মোড়ের সেই ফ্যাঁচফ্যাঁচে চায়ের দোকানের মতো—কেতলির ভেতর ফুটতে থাকা জলের শব্দ যেন অপ্রকাশিত আর্তনাদ। আগুনরাঙা চা হতে যত আগুন লাগে, তার চেয়েও বেশি আগুন লাগে একজন মানুষকে ভেতরে ভেতরে পোড়াতে। চিনি গলে গেলে মিষ্টি হয়, কিন্তু মানুষ গলে গেলে শুধু দাগ পড়ে। কাপের ধোঁয়া যেমন আকাশে মিলিয়ে যায়, তেমনই মানুষের কান্না মিলিয়ে যায় ভিড়ের ভেতর; শুধু কাপের তলায় জমে থাকে গাঢ় রঙের আস্তরণ—যেন দীর্ঘদিনের জমাট শোক।
কত শত জনমেও একটি তারকার পতন মাপা যায় না—কারণ পতনের শব্দ কেবল শূন্যতা শোনে। আকাশ যখন ফিঁকে হয়ে আসে, কেউ কি তার রঙের ক্ষয় গুনতে পারে? দুঃখও তেমন—সে ক্ষয়, সে পতন, সে অন্তঃসারশূন্যতার দিকে এক অনিবার্য যাত্রা। দুঃখের কোনো ফিতে নেই, কারণ দুঃখ নিজেই এক অনন্ত ফিতে—যা সময়ের গলায় পেঁচিয়ে থাকে। আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যাই, অথচ বাইরে থেকে অক্ষত দেখাই; এই দ্বৈততার নামই জীবন, এই অভিনয়ের নামই টিকে থাকা।
অ্যান্টিমেট্রিক এই শোকের কোনো অক্ষাংশ নেই, কোনো দ্রাঘিমা নেই—তবু সে আমাদের ভেতরে এক বিশাল মহাদেশ গড়ে তোলে। সেখানে পতাকা উড়ে না, শুধু ছেঁড়া নিশ্বাস উড়ে। সেখানে রাষ্ট্রভাষা নেই, শুধু দীর্ঘশ্বাসের উপভাষা। সেখানে রাজধানী নেই, শুধু নির্বাসন। আর আমরা—আমরা সেই মহাদেশের অনিবন্ধিত নাগরিক; পাসপোর্টহীন, পরিমাপহীন, অথচ অসীম ভার বহন করে দিব্যি হেঁটে যাই ভিড়ের মধ্যে, যেন কিছুই হয়নি।
আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন