কবিতা : টিনের ছাদের নিচে স্বপ্ন-দেশ
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ১৩ জুন, ২০২১ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘টিনের ছাদের নিচে স্বপ্ন-দেশ’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| টিনের ছাদের নিচে স্বপ্ন-দেশ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
টিনের ছাদের নিচে স্বপ্ন-দেশ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
চুল খুলে দেয় একলা মেয়েটা—মনে হয় যেন রাতের গোপন নদী হঠাৎ বাঁধ ভেঙে নামছে। তার চুলের ভেতর আটকে থাকে কতদিনের জমে থাকা নিঃশ্বাস, কত অব্যক্ত কান্না, কত অনুচ্চারিত “থাক, আমি ঠিক আছি”—যা আসলে ঠিক থাকা নয়, শুধু টিকে থাকা। বাইরে বৃষ্টি নামে, আর বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন আকাশের কলম দিয়ে লেখা একেকটা দীর্ঘশোক। টিনের ছাদে সেই শব্দ পড়ে পড়ে মনে হয়—কারও হৃদয়ের ওপর কেউ নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে, তবু হৃদয় চুপ করে সহ্য করছে, কারণ হৃদয়েরও তো সংসার আছে।
বাড়ির মাথায় ছাদ জুটেছে—এইটুকুই ভরসা।
ছাদটা যেন গরিবের কপালের শেষ আশীর্বাদ, ভাঙা জীবনের মাথার ওপর রাখা একখানা সুরক্ষার পাতলা ঢাল। এই ছাদ জানে কত শীতের রাতে গায়ে কম্বল না থাকলেও মানুষ ঘুমিয়েছে, জানে কত বৃষ্টির রাতে চালের ফাঁক দিয়ে পানি পড়লেও কেউ অভিযোগ করেনি—কারণ অভিযোগ করবার মতো সময়ও এখানে বিলাসিতা।
আমরা সবাই সবার মতো—মেঘ জমাই আলগোছে।
কেউ জমায় বুকের গহীনে, কেউ জমায় চোখের কোণে, কেউ জমায় হাসির আড়ালে। আমাদের ভেতরের আকাশে ঝড় ওঠে, কিন্তু আমরা তাকে নাম দিই না—আমরা তাকে বলি “স্বাভাবিক”, “হয়ে যায়”, “কী আর করা যাবে!”
ওপাশ ফিরে ঘুম এসে যায়, কিন্তু ঘুমটা আমাদের জন্য কম্বলের মতো নয়—ঘুমটা যেন একখানা নির্বাসন, যেখানে মানুষ সাময়িকভাবে নিজেকে ভুলে থাকতে পারে। আর সেই ঘুমের সঙ্গে থাকে স্বপ্ন-দেশ—একটা কল্পনার দেশ, যেখানে মেয়েদের স্বপ্নকে কেউ চরিত্রের দাগ বানায় না, যেখানে বৃষ্টির রাতে কেউ একা হলে তাকে প্রশ্ন করা হয় না, বরং তার নিঃসঙ্গতাকে ছাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
চোখের কোণে কাজল জমে—
কাজলটা যেন দুঃখের কালো পতাকা, যা মুখের এক পাশে উড়ে উড়ে বলে দেয়—“আমি ভেঙে পড়েছি, কিন্তু আমি ভেঙে পড়ার অনুমতি পাইনি।”
ধারের খাতায় পড়ে থাকে দু-ফোঁটা জল—সেগুলো শুধু জল নয়, সেগুলো হলো মফস্বলের মেয়েদের জমিয়ে রাখা কথা; যেগুলো তারা কাউকে বলতে পারে না, কারণ বললেই সমাজের দাঁত বেরিয়ে আসে।
বৃষ্টি এলেই ঘরের কথা মনে পড়ে—কারণ এখানে বৃষ্টি প্রেমের চিঠি নয়, বৃষ্টি হলো হিসাবের খাতা; চাল ফুটো, উঠোনে কাদা, রান্নাঘরে ধোঁয়া, মায়ের জ্বর, বাবার চিন্তা, আর সংসারের কাঁধে চাপানো হাজারটা না-বলা দায়িত্ব।
আর সেই একলা মেয়েটা—
সে জানে, শহর মানুষকে বদলে দেয়, কিন্তু মফস্বল মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয় করে দেয়—মোমবাতির মতো, আলো দিতে দিতে নিজেই গলে যায়।
তার বুকের ভেতর একটা নদী আছে, কিন্তু নদীর নাম কেউ জানে না।
তার চোখে একটা আকাশ আছে, কিন্তু আকাশটা সবাই দেখতে চায় না—কারণ আকাশ দেখলে প্রশ্ন ওঠে, “তুই উড়তে চাস কেন?”
তবু সে চুল খুলে দেয়, আর বৃষ্টি নামে সযত্নে।
বৃষ্টি যেন তার মাথার ওপর হাত রেখে বলে;
“কাঁদিস না… কাঁদলেও লুকাস না…
মফস্বল তোর জন্মভূমি হতে পারে,
কিন্তু তোর স্বপ্নের ঠিকানা নয়।”
আর আমরা?
আমরা সবাই মফস্বল—
টিনের ছাদের নিচে আটকে থাকা একেকটা অসমাপ্ত উপন্যাস,
কাজল মেখে থাকা চোখের গোপন বিদ্রোহ,
আর বুকের ভেতর জমে থাকা স্বপ্ন-দেশের মানচিত্র!
যেখানে পৌঁছানোর রাস্তা আছে,
কিন্তু সাহস নেই।
আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন