Bangladesh Files: যখন পিতার বুকে বিষাক্ত নজর পড়েছিল প্রথমবার
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

যখন পিতার বুকে বিষাক্ত নজর পড়েছিল প্রথমবার



শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কালিমালিপ্ত ও বেদনাবিধুর দিন। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের স্থপতিকে তাঁর সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার সেই নির্মম ট্র্যাজেডি কোনো হঠকারী বা আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দেশী-বিদেশী স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের দীর্ঘদিনের সুদূরপ্রসারী ও ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের এক চূড়ান্ত এবং বীভৎস রূপ। একটু পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেওয়ার এবং এই সদ্য স্বাধীন দেশটিকে ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করার কুৎসিত চেষ্টা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরদিন থেকেই।

তেমনি একটি রহস্যময় অথচ ইঙ্গিতপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি। সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনের সামনে থেকে হাতবোমাসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত তালিকায় সেই গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির নাম, পরিচয় বা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আজ সহজে পাওয়া যায় না, কিন্তু ইতিহাসের ডটগুলো মেলালে এর পেছনের ভয়ঙ্কর নীলনকশাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কেন ৩ জানুয়ারির এই ঘটনাটি ১৫ আগস্টের গভীর চক্রান্তেরই একটি অংশ ছিল? আসুন একটু বিশ্লেষণ করে দেখি:
১. স্বাধীনতার পর থেকেই ধারাবাহিক নাশকতা:
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহল চারদিকে অরাজকতা ছড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের দিকে একের পর এক আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা, ল্যাবরেটরিতে মাইন বিস্ফোরণ, ব্যাংক ডাকাতি এবং রাজনৈতিক নেতাদের গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটছিল। ৩ জানুয়ারির ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগে, ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসেও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামানের বাসভবন এবং আওয়ামী লীগ অফিসে হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ৩২ নম্বরের সামনে হাতবোমাসহ ধরা পড়া ব্যক্তিটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধী ছিলেন না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রপ্রধানকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে রাখার ও সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের ধারাবাহিক অপচেষ্টারই অংশ।

২. ১ জানুয়ারির রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ গ্রহণ:
৩ জানুয়ারির ঠিক দুদিন আগে, ১ জানুয়ারি ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী মিছিলে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে দুজন ছাত্র নিহত হন। চারদিকে তীব্র ক্ষোভ ও সরকারবিরোধী হাওয়া তৈরি হয়। ঠিক এই রাজনৈতিক উত্তেজনার সুযোগ নিয়েছিল ঘাতকচক্রটি। যখন নিরাপত্তা বাহিনীর মনোযোগ রাজপথের আন্দোলনের দিকে, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে টার্গেট করা হয়েছিল।

৩. একটি "দুর্বল মিশন" নাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার মহড়া?
৩২ নম্বরের মতো একটি সর্বোচ্চ সুরক্ষিত এলাকার সামনে কেবল 'হাতবোমা' নিয়ে আক্রমণ করতে যাওয়া আপাতদৃষ্টিতে একটি অপরিকল্পিত বা কাঁচা হাতের (Amateurish) মিশন মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে মনে হয়, এটা কি কেবলই একটা দুর্বল অপচেষ্টা ছিল? নাকি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর পরখ করার (Testing the waters) কোনো শীতল চাল ছিল? মিশনটি ব্যর্থ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর ভেতরের খুনে উদ্দেশ্যটি যে কতটা বিপজ্জনক ছিল, তা আজ ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

৪. ছদ্মবেশী কুশীলবদের দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট:
ইতিহাসের কী নির্মম সত্য—যারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মূল মাস্টারমাইন্ড বা খুনি ছিল, তারা কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই পর্দার আড়ালে গোপনে গোপনে বিভিন্ন ডানপন্থী, চরমপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী শক্তির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল। একদিকে উগ্র-বামপন্থীদের সশস্ত্র তৎপরতা, অন্যদিকে খন্দকার মোশতাকদের মতো ঘরের শত্রুদের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র—এই দুইয়ের যাঁতাকলে ফেলে সদ্য স্বাধীন দেশটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার চক্রান্ত চলছিল প্রথম থেকেই।

শেষ কথা:
১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে হাতবোমাসহ গ্রেফতারের ঘটনাটি আসলে ছিল ১৫ আগস্টের সেই সুদূরপ্রসারী মহাষড়যন্ত্রের শুরুর দিকের একটি "ব্যর্থ মহড়া"। যারা বঙ্গবন্ধুকে ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি, তারা প্রথম থেকেই আঘাত হানার সুযোগ খুঁজছিল। সেদিন হয়তো দুর্বল পরিকল্পনার কারণে ঘাতকেরা সফল হতে পারেনি, কিন্তু তাদের সেই বিষাক্ত ছোবল থামেনি। যার চূড়ান্ত ও নৃশংস বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছিলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালো রাতে।

ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ইতিহাস এক সুতোয় গাঁথা এক দীর্ঘ পথচলা। আজ যখন পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই, তখন প্রতিটা ব্যর্থ হামলা আর ষড়যন্ত্রের দাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাঙালির অবহেলা আর অতি-বিশ্বাস কতটা চড়া মূল্যে শোধ করতে হয়েছিল এই জাতিকে।

শত কোটি সালাম হে জাতির পিতা, তোমার রক্তঋণ এই জাতি কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন