![]() |
| ইশমা তানজিম |
‘অনেক কিছু মিলিয়েই আ/ত্মহত্যার মতো অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি’
আ/ত্মহত্যার চেষ্টার পর গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ব্যাটার ইশমা তানজিম। বুলিং, র্যাগিং, নির্বাচনে বঞ্চনা ও মানসিক চাপের নানা অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘সব মিলিয়েই হয়তো আ/ত্মহত্যার মতো অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’
সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছেন?
ইশমা: হ্যাঁ। গতকাল রাতে বাসায় ফিরেছি। তিন দিন হাসপাতালে ছিলাম। দুই দিন আইসিইউতে ছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর গত রাতে বাসায় ফিরে এসেছি।
প্রশ্ন: ইমার্জিং দলে সুযোগ না পাওয়ার কারণেই কি আপনি আ/ত্মহত্যার মতো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
ইশমা: ইমার্জিং দলে সুযোগ না পাওয়ার জন্য আমি আ/ত্মহত্যার চেষ্টা করব, আমি এতটা বোকা নই। মূল বিষয়টা হলো, জাতীয় দলে খেলার পর থেকে যেভাবে র্যাগিং ও অন্যায়ের শিকার হয়েছি, সেটা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। সম্প্রতি বাদ পড়াটাও মেনে নিতে পারিনি। সব মিলিয়েই হয়তো শেষ পর্যন্ত একটা অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।
প্রশ্ন: আপনি বুলিংয়ের কথা বলছেন। সবচেয়ে বেশি কে আপনাকে বুলিং করেছেন?
ইশমা: সবচেয়ে বেশি করেছে ফাইয়াজ ভাইয়া। আমি ধানমন্ডির মেয়ে, বার্গার খাই—এসব কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। শুধু নিজে বলেই থেমে থাকেননি, অন্যদের কাছেও এমনভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে এখন সবাই আমাকে ‘বার্গার’ বলে ডাকে। আমি যদি শুধু বার্গারই খেতাম, তাহলে জাতীয় দলে খেললাম কীভাবে? পারফরম্যান্স করলাম কীভাবে?
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, র্যাগিংয়ের বিষয়টিও আপনাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করেছে?
ইশমা: র্যাগিংটা আমি মেনেই নিয়েছিলাম। নতুন খেলোয়াড় হিসেবে কিছুটা সময় এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটাও বুঝতাম। কিন্তু আমি ধানমন্ডিতে জন্মেছি, ছোটবেলায় বার্গার খেয়েছি—এটা তো আমার দোষ নয়। বাসার সামনে বার্গার কিং, বাসার সামনে কেএফসি ছিল, সেটা তো আমার দোষ না। এসব বিষয় নিয়ে আমাকে বারবার কটাক্ষ করা হয়েছে, যা মানসিকভাবে কষ্ট দিয়েছে।
প্রশ্ন: এই বিষয়গুলো কি কখনো বিসিবিকে জানিয়েছিলেন?
ইশমা: না, বোর্ডের কাউকে জানাইনি। কারণ এসব ঘটনা সবার সামনেই ঘটত। আর আমার কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন স্যার আগে থেকেই বলেছিলেন, নতুন কেউ জাতীয় দলে এলে অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। আমি সেটার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু সেই সময়টা যে এত দীর্ঘ হবে এবং এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, সেটা বুঝিনি।
প্রশ্ন: তারপরও বোর্ডকে জানালে হয়তো কোনো সমাধান হতে পারত?
ইশমা: শুধু ফাইয়াজ ভাইয়ের বুলিংয়ের কারণেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিইনি। আমি বলছি, আমার সঙ্গে বারবার যে অন্যায় হয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচনের ক্ষেত্রে, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে।
প্রশ্ন: নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে আপনার অভিযোগটা কী?
ইশমা: সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়ার সময়। আমি মনে করি, আমার জায়গায় অন্য কোনো খেলোয়াড় হলে এত সহজে বিষয়টা মেনে নিতে পারত না। অনেক কিছু দেখেছি, অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু চুপ থেকেছি। কারণ সালাউদ্দিন স্যার সবসময় বলতেন, ‘ডোন্ট বি ১৯-২০। হয় তুই ২১ হবি, নয় তুই চুপ করে থাকবি।’ তাই সবসময় পারফরম্যান্সের দিকেই মনোযোগ দিয়েছি।
প্রশ্ন: এরপর কী ঘটেছিল?
ইশমা: পারফরম্যান্স করে আবার জাতীয় দলে ফিরলাম। তিনটি ম্যাচ খেললাম। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং সিরিজে ভালো খেললাম। তারপর তিন মাস বিসিবির ফিটনেস ক্যাম্প করলাম। পুরো ক্যাম্পজুড়ে আমি ওপেনিং করেছি। সবাই জানত আমি দলে যাচ্ছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একজন খেলোয়াড় পরিবর্তন করে আমাকে বাদ দেওয়া হয়। বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে আঘাত করেছে। এখনও চোখ বন্ধ করলে সেই ঘটনা মনে পড়ে।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন, এর আগেও এমন অন্যায়ের শিকার হয়েছেন?
ইশমা: হ্যাঁ। এটা নতুন কিছু নয়। বিসিএলের প্রথম আসরে আমি প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছিলাম। তখনও বলা হয়েছিল, আমার নাকি ফিটনেস নেই। অথচ দুই ইনিংস খেলেই আমি সেই পুরস্কার জিতেছিলাম। এরপরও আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন: এরপর কীভাবে বিষয়গুলো এগিয়েছে?
ইশমা: বিশ্বকাপ ক্যাম্পের পর জাতীয় লিগে আমার পারফরম্যান্স আগের মতো হয়নি, এটা আমি মানছি। কিন্তু আমার চেয়ে কম রান করা অনেক খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে ডাকা হয়েছে, আমাকে নয়। পরে ‘এ’ দলের হয়ে থাইল্যান্ডে খেলতে গিয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভালো খেললাম, দল জিতল। তারপরও যেসব খেলোয়াড় ম্যাচই খেলেনি বা খুব কম রান করেছে, তাদের পরের ক্যাম্পে ডাকা হয়েছে। আমাকে ডাকা হয়নি।
প্রশ্ন: নির্বাচনের আগে কি আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাকে জানানো হয়েছিল কেন দলে রাখা হচ্ছে না?
ইশমা: হ্যাঁ। প্রথমে ইমন স্যার ফোন করে বলেছিলেন, ট্রেইনারের কাছ থেকে তিনি জেনেছেন আমি নাকি পরের ক্যাম্পের জন্য ফিট নই। আমি জানতে চাই, ঠিক কোন কারণে আমাকে আনফিট বলা হচ্ছে। তখন তিনি বলেন, আমার হাঁটুর ইনজুরির কারণে আমি নাকি ক্যাম্প করতে পারব না। আমি তখন বলি, আমার রিহ্যাবের শেষ সপ্তাহ চলছিল। এরপর থেকে আমি পুরোপুরি অনুশীলন করতে পারতাম। শুধু ফিটনেস টেস্টটা দিইনি, কারণ টানা দুটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার পর হাঁটুতে একটু ব্যথা ছিল। অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যথা বাড়াতে চাইনি।
প্রশ্ন: এরপর বিষয়টি কীভাবে জানার চেষ্টা করেছিলেন?
ইশমা: পরে আমি রিমন ভাইকে ফোন করি। তিনি বলেন, তিনি এমন কোনো তথ্য দেননি। এরপর বলা হয়, ফিজিও নাকি এমন তথ্য দিয়েছেন। আমি ফিজিওর সঙ্গে কথা বললে তিনিও বলেন, তিনি বরং সবার কাছে বলেছেন আমি অনেক উন্নতি করেছি এবং নিয়মিত ম্যাচ খেলছি। তখন আমার মনে হয়েছে, সবাই একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ভুলের কারণে কেন আমাকে ভুগতে হবে?
প্রশ্ন: নির্বাচকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
ইশমা: সালমা আপুকে ফোন করেছিলাম। তিনি বলেন, আমি জাতীয় দলে খেলার মতো খেলোয়াড়। তবে এবার ক্যাম্পে ফিটনেসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং আমার হাঁটুর অবস্থা বিবেচনায় রাখা হয়েছে। আমি তখন বলি, আমার নামে যদি সময়মতো ফিজিওর রিপোর্ট বা মেইল পাঠানো হতো, তাহলে প্রথম দিন থেকেই আমাকে সেই অনুযায়ী ট্রিটমেন্ট দেওয়া যেত। হয়তো তখন এত সমস্যাও হতো না। সালমা আপুও বলেছেন, বিষয়টি আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।
প্রশ্ন: তাহলে আপনার অভিযোগ, ফিটনেসকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে?
ইশমা: অবশ্যই। আমার ইনজুরির সময় প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। দুই-তিন দিনের বিশ্রাম আর সামান্য স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করলেই আমি শতভাগ ফিট হয়ে যেতাম। অথচ আমাকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে হাঁটুর ইনজুরির কথা বলা হয়েছে। আমার নামে কোনো অফিসিয়াল মেইলও দেওয়া হয়নি। জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে এভাবে আচরণ করা ঠিক নয়। ট্রেইনার বলছেন অন্য কেউ দায়ী, ফিজিও বলছেন তাকে ফাঁসানো হচ্ছে—তাহলে তাদের ভুলের শাস্তি আমি কেন পাব?
সূত্র: বাংলা নিউজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন