উপন্যাস : প্রিয় ইরাবতী
লেখিকা : রাজিয়া রহমান
প্রকাশনা :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল : ২০ জুলাই, ২০২৫ ইং
লেখিকা রাজিয়া রহমানের “প্রিয় ইরাবতী” নামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশিত হল। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি ২০২৫ সালের ২০ জুলাই থেকে লেখা শুরু করেছেন।
![]() |
| প্রিয় ইরাবতী || রাজিয়া রহমান |
৩৪ তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
প্রিয় ইরাবতী || রাজিয়া রহমান (পর্ব - ৩৫)
ইশতিয়াক ইউকেতে ফিরে গেছে প্রায় দুই মাস হয়ে গেছে।
ইরার অবাক লাগে।
মা তাকে এখনও ওই বাসায় অ্যালাউ করে নি।
সন্তানের প্রতি বাবা মা'য়ের এতো অকারণ ক্ষোভ থাকতে পারে ইরার জানা ছিলো না।
ইরার ভাবনার মধ্যেই সাগর এসে ডাইনিং রুমে চেয়ার টেনে বসে।ইরা ভাইকে দেখে মুচকি হেসে বললো, “আপডেট কী?পছন্দ হয়েছে সবকিছু?”
“তোর পছন্দ হয়েছে তাতেই যথেষ্ট।”
ইরার কেমন কান্না পায়। শুধু তার জন্যই তো সাগরের সংসারটা পর্যন্ত ভেঙে গেলো। সে কীভাবে ভাইয়ের সংসার না গুছিয়ে ইউকে পাড়ি দিবে!
ইরা সাগরের হাত ধরে বললো, “পুরনো সেসব ক্ষত মনে পুষে রেখো না ভাইয়া।”
“আরে পাগল,কি বলছিস।আমি ওসব কিছুই মনে রাখি নি।ক্ষমা করার মতো মহৎ একটা গুণ থাকতে আমি কেনো মনে রাগ ক্ষোভ ধরে রাখবো?আমার আল্লাহ ক্ষমাশীল। আর তিনি ক্ষমাশীলদের পছন্দ করেন।তাছাড়া যে আমার জীবনে নেই। যে এখন আমার নন মাহরাম হয়ে গেছে তার কথা ভেবে আমি নিজের পাপ বাড়াতে যাবো কেনো?”
“তাহলে তুমি রাজি?”
“তুই খুশি হলে তোর ভাই সব করতে রাজি।”
“ঝুমার অতীত নিয়ে তোমার মনে কোনো দ্বিধা নেই তো!”
“না রে।আমি এসব নিয়ে ভাবছি না।আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিতে চাই।যাতে আমার আল্লাহ ও আমাকে ক্ষমা করে দেন।”
ইরার দুই চোখ ভিজে উঠে।ঝুমার সাথে সাগরের বিয়ে পাকা করেছে ইরা।
নীলি,লাবণি, রিমিরা নিজেদের জীবন কিছুটা গুছিয়ে নিলেও ঝুমা পারে নি। বরং ওর জীবন কেমন যেনো থমকে আছে।
ঝুমার বাবা নেই।
তিন বোনের মধ্যে ঝুমা সবার বড়।বাকি দুই বোন ও বিয়ের উপযুক্ত হয়ে উঠেছে।
ইরা নিজেই আগ্রহী হয়ে ঝুমার মা'য়ের সাথে যোগাযোগ করেছে। ঝুমার সাথে যোগাযোগ করেছে।
ঝুমা নিজেই সাগরকে সবকিছু জানিয়েছে।সব জেনেই সাগর যখন রাজি হয়েছে তাহলে ইরা আর দেরি করতে চাইলো না।
ইরা ইশতিয়াককে সুখবরটা দিতেই ইশতিয়াক বললো, “তাহলে আর দেরি কেনো ইরাবতী?”
“কি করবো তাহলে?”
“বিয়েতে যখন ভাইজান সম্মতি দিয়েছেন তাহলে আর দেরি কিসের?তুমি ভাবীর মা'য়ের সাথে কথা বলে আজকে রাতেই ভাবীকে বাসায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো।যেমন করে তোমাকে নিয়ে এসেছি আমি।”
ইরা ভেবে দেখলো মন্দ হয় না তাতে।বড় করে অনুষ্ঠান করার,গুষ্টি সুদ্ধ মানুষ খাওয়ানোর মতো অপ্রয়োজনীয় কিছুই করা দরকার নেই।
সাগর শারমিনের কাছে গেলো।শারমিন সাগরের গলার আওয়াজ পেয়ে দরজা খুললো না।
দরজার এপাশ থেকে সাগর বললো, “মা,আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। আজকে রাতেই আমার বিয়ে। তুমি আমাকে দোয়া করবে না মা?বউ আনতে যাবে না?”
শারমিনের বুক কেঁপে উঠে। সাগর বিয়ে করবে?বিয়ে করলে কী বউ নিয়ে এখানে আসবে ও?
শারমিনের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
চেঁচিয়ে বললো, “বিয়ে কর না জাহান্নামে যা তোরা ভাইবোন জানস।আমাকে এসব বলতে হবে না।বিয়ে করে বউ নিয়ে এখানে না আসলেই হবে।আমি বাসা ভাড়া দিছি।কারো জায়গা হবে না এখানে।”
সাগরের চোখ ভিজে উঠে। মা কেনো এমন হয়ে গেলো!
ইশতিয়াক ইউকে যাবার সময় ইরাকে কার কাছে রেখে যাবে ভেবে না পেয়ে শারমিনের কাছে এসেছিলো ইরা।ভেবেছিলো মা ইরাকে হয়তো আশ্রয় দিবে।
অথচ পাষণ্ডের মতো শারমিন ফিরিয়ে দিয়েছে মেয়েকে।
ইশতিয়াক তখন সাগরকে খুঁজে এনে ইরাকে সাগরের কাছে রেখে যায় যতদিন না ইরাকে ইউকে নিয়ে যাচ্ছে।
চোখ মুছে সাগর বের হয়ে যায়। মা তাকে যাই বলুক তার দায়িত্ব মা'য়ের খোঁজ নেওয়া।
সাগর সেটা করে যাবে।
খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ে ইরা বিয়ের আয়োজন করে ফেলেছে। ঝুমার জন্য টুকটাক শপিং ও করেছে।
সাগরের কেমন জানি লাগছে।একটা নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে সে অথচ তার কাছে একটা কানাকড়ি ও নেই।
সবকিছু ছোট বোনটা করছে।সাগরের ভাবনার মধ্যেই ফোনে একটা মেসেজ আসে।
সাগর চেক করে অবাক হয়ে যায়। তার অ্যাকাউন্টে এতো টাকা কোথা থেকে এলো!
ভাবতেই বুঝতে পারে এই কাজটা ইশতিয়াক করেছে।
সাগর ইশতিয়াককে কল দিলো।এতো টাকা পাঠানোর কথা জিজ্ঞেস করতেই ইশতিয়াক হেসে বললো, “ভাইয়া,আপনার কাছে আমি যাকে রেখে এসেছি সে আপনার জন্য বোন হতে পারে, অন্যদের কাছে সাধারণ একজন মানুষ হতে পারে কিন্তু আমার কাছে সেই মানুষটার মূল্য অসীম। আমার ইরা আমার কাছে কোহিনূর হীরার চাইতেও মূল্যবান। তাকে এতো আদর,ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখছেন আপনি, আমি পারলে আমার বুক ছিরে কলিজাটা আপনার পায়ের কাছে রেখে দিতাম।আপনি না রাজি হলে আমি ইরাকে কার ভরসায় রেখে আসতে পারতাম এতো নিশ্চিন্তে!
আপনি আছেন বলেই তো আমি নিশ্চিন্তে নিশ্বাস নিতে পারি যে ইরা সুরক্ষিত আছে।
তাছাড়া, আপনি যদি সম্মতি না দিতেন আমাদের বিয়ের দিন ইরা আমাকে বিয়ে করতে রাজি হতো না।শাশুড়ী আম্মার কথার চাইতে ইরা আপনার সিদ্ধান্তকে বেশি মূল্য দিয়েছে । আপনার কাছে আমি সবকিছুর জন্য কৃতজ্ঞ ভাইয়া।
আমি যতদিন বেঁচে আছি,মনে রাখবেন আপনার আর ভাবীর দায়িত্ব ও আমার।জীবন আমার কাছ থেকে সবাইকে কেড়ে নিয়েছে।
আপন বলে কেউ নেই আমার। সেখানে আপনি যখন আছেন আপনার জন্য কিছু করতে দিন আমাকে।”
সাগর আর কিছু বলতে পারলো না।বোনের জন্য ভুল মানুষকে পছন্দ করে নি সাগর আবারও বুঝতে পারলো।
ঝুমার মা,মামা,চাচা,চাচী মিলিয়ে ১০/১২ জন এলেন ঝুমার সাথে। ঝুমার মা কাঁদছেন।মেয়েকে তিনি পড়ালেখা করাতে চেয়েছেন অনেক কিন্তু মেয়ে যে এরকম একটা অঘটন ঘটিয়েছে তা জানার পর থেকে রাহেলার দুই চোখের ঘুম উড়ে গেছে।
মেয়ের কীভাবে বিয়ে দিবেন এই দুশ্চিন্তায় রাহেলার নাওয়া খাওয়া সব উঠে গেছে।
ঝুমা নিজেও কেমন একঘরে করে ফেলেছে নিজেকে।
এরকম একটা ঘটনার কথা রাহেলা বেগম কারো সাথে শেয়ার করতে পারেন নি।আরো দুটো মেয়ে আছে। তাদের ও তো বিয়ে দিতে হবে।
রাহেলা বেগমের সব মুশকিলের আসান হিসেবেই এই ইরা মেয়েটা এসেছে।
কাজী অফিসের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে উপমা।মনির আর শফিক দুজন ছাড়া কেউ আসে নি।উপমা সবার গলার কাঁটা। সেই যে একটা লেডিস হোস্টেলে উঠিয়ে দিয়েছে মনির।এরপর মাঝেমধ্যে মা কল দিতেন।
মা বাবা ছাড়া কেউই যোগাযোগ করে নি।
শফিক কখনও দেখা করে নি। মাঝেমধ্যে টাকা পাঠাতো।
উপমা বুঝে গেছে সবকিছু তার অন্যায়ের ফল।
পাত্রপক্ষ আসার অপেক্ষায় ছিলো উপমা।
পাশে আরেকটা ফ্যামিলি বসে আছে। তাদের মেয়ের ও বিয়ে হবে আজকে।
উপমার কান্না পায়। ওই মেয়েটার ভাগ্য কতো ভালো!
তার বিয়েতে তার ফ্যামিলির কতো মানুষ আছে অথচ উপমার পাশে কেউ নেই।
অবশ্য যে নিজের দোষে সংসার হারা হয়েছে তার এসব আশা করা অনুচিত।
একটা সিএনজি থেকে ইরা আর সাগর নামলো।
ইরাকে দেখে উপমার কেমন বুক চিনচিন শুরু করে।
সাগর!
এক মুহূর্তের জন্য উপমার মনে হয় সাগরের সাথেই কী আবার বিয়ে হচ্ছে তার!
কতো দিন পর সাগরকে দেখলো উপমা।
পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা।গালে চাপ দাড়ি।
কেমন যেনো অন্য মানুষ।
উপমার বুকে ভীষণ ব্যথা জন্মায়।সেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে উপমার প্রতিটি লোমকূপে।
পাশের মেয়ে ফ্যামিলিকে ইরার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে উপমা বুঝতে পারে আজকে সাগরের ও বিয়ে।
কাঁদবে না বলে ও উপমা নিজেকে আটকাতে পারে না।
কেনো এমন লাগছে উপমা বুঝতে পারে না। সাগরকে দেখার পর মন যেনো আর কাউকে ভাবতে চাইছে না।
উপমা নিজের অজান্তেই পা বাড়ালো সাগরের দিকে।
মনির উপমার হাত চেপে ধরে। ছলছল চোখে উপমা দুলাভাইয়ের দিকে তাকায়। মনির মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায়।
উপমা ডুকরে কেঁদে উঠে।
অথচ যেদিন ডিভোর্স পেপার পেয়েছিলো সেদিন ও উপমার এরকম কষ্ট হয় নি।
ইরারা ভেতরে চলে গেলো। উপমা দাঁড়িয়ে রইলো বাহিরে।ভেতরে ভেতরে ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া উপমা।কি অসহ্য যন্ত্রণা বুকে নিয়ে উপমা দাঁড়িয়ে ছিলো তা কেবল উপমা জানে।
রাহাত এগিয়ে এসে মনিরকে বললো, “সরি মনির ভাই।জ্যামে ফেঁসে যাওয়ায় দেরি হয়ে গেলো।”
মনির উপমাকে ইশারা করলো রাহাতের বোন চাচাকে সালাম দিতে।উপমা সালাম দিলো।কিন্তু কান্নার জন্য উপমার কথা স্পষ্ট বোঝা গেলো না।
রাহাত চমকে তাকালো উপমার দিকে। উপমার দুই চোখ জল ছলছল হয়ে আছে।কেমন মায়াবী লাগছে রাহাতের কাছে।
সাগর, উপমার দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেলো দুজন আলাদা মানুষের সাথে।
উপমা ভাবে,কি আশ্চর্য ব্যাপার!
যার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে তার সাথেই আবার উপমার বিবাহ বার্ষিকী হবে।
একই দিনে।হয়তো দু'জনের জীবনে তখন নতুন মানুষ।
আপনার পছন্দের গল্পের নাম কমেন্টে জানান
Follow Now Our Google News
চলবে ...
৩৬ তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
রাজিয়া রহমান’র গল্প ও উপন্যাস:
- শালুক ফুলের লাজ নাই
- তুমি অন্য কারো সঙ্গে বেঁধো ঘর
- তুমি অন্য কারো ছন্দে বেঁধো গান
- তুমি অপরূপা
- কেয়া পাতার নৌকা
- শালুক ফুল
- চন্দ্রাণী
- প্রিয় ইরাবতী
লেখক সংক্ষেপ:
তরুণ লেখিকা রাজিয়া রহমান বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহন করেন। লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন তিনি। তরুণ এই লেখিকা বৈবাহিক সূত্রে লক্ষ্মীপুরেই বসবাস করছেন। বর্তমানে তিনি একটি পুত্র সন্তানের জননী। পেশাগতভাবে তিনি গৃহিনী হলেও লেখালেখির প্রতি তার ভিষন ঝোক। আর তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও শখের বশে ধারাবাহিকভাবে লিখে যাচ্ছেন একের পর এক উপন্যাস। ২০২২ সালের মধ্যদিকে গর্ভকালিন সময়ে লেখিকা হিসেবে হাতেখড়ি নিলেও এরই মধ্যে লিখে ফেলেছেন “তুমি অন্য কারো সঙ্গে বেঁধো ঘর” ও “শালুক ফুলের লাঁজ নাই” -এর মতো বহুল জনপ্রিয় উপন্যাস।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন