কবিতা          :         বংশাবলি
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২১ জুলাই, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ২০ জুলাই, ২০২৬ ইং


বংশাবলি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
বংশাবলি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


বংশাবলি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


আর কতটা ফিনিক-ফোটা জ্যোৎস্না এলে মানুষ জোনাকির আলোয় আঁতকে উঠে উঠোন হাতড়ে মরে— তা-ও পাড়ার দেবযানী টের পেয়েছিল, কোনো এক ঘোর অমানিশা কালে।

সেই অমানিশা ছিল না কেবল একটি রাত; সে ছিল যুগের পর যুগ ধরে মানুষের চোখে জমে থাকা অতিরিক্ত আলোর পলেস্তারা। যেখানে প্রত্যেকটি জানালা নিজেরই প্রতিবিম্বে ইট হয়ে যায়, আর প্রত্যেকটি দরজা নিজের ছায়াকে চিনতে না পেরে চৌকাঠের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে।

যে কিনা রোজ অন্ধকার নামার আগে আলোর খোঁজে চেরাগে মুখ ডোবাত— সেও একটা সময় মেনে নিল, অভিগমন থেকে শুরু করে অভিসম্পাত এবং অনন্তকাল ধরে যে যাত্রা, তা সবসময় প্রথম সেই কাঁপতে থাকা আলিঙ্গনের মতোই জুবুথুবু অন্ধকার।

যেন জন্মও একধরনের নির্বাসন, আর মৃত্যু কেবল তার বহু পুরোনো ঠিকানায় ফিরে যাওয়া।

খুব কাছ থেকে দেখাকে দেখতে গিয়ে দেখে ফেলে দেবযানী— কতটা আলোয় চোখ ধাঁধালে দেখা অদেখা হয়ে যায়।

যেমন সূর্যের খুব কাছে গেলে মোমের ডানা নয়, প্রথমে গলে যায় স্মৃতির হাড়। যেমন নদী নিজের উৎসের কাছে ফিরে গেলে জলের ভাষা ভুলে যায়, তেমনি মানুষেরাও অতিরিক্ত আলোর কাছে গিয়ে নিজেদের মুখের বর্ণমালা হারিয়ে ফেলে।

সেদিন দেবযানী দেখেছিল— আলোও কখনো কখনো সবচেয়ে নিষ্ঠুর অন্ধকারের ছদ্মবেশ। তার সাদা পোশাকের ভাঁজে অসংখ্য কৃষ্ণগহ্বর লুকিয়ে থাকে; যেখানে প্রবেশ করলে ফিরে আসে শুধু প্রতিধ্বনি, ফিরে আসে না মানুষ।

তারপর থেকে দেবযানী জেনেছে, এই অকাল অন্ধকারের ভিতরে ক্রমশ একটা পরাজয় হেঁটে যায় অন্ধকারের চাদর মুড়ি দিয়ে, শীতকাতুরে সেই কুঁজো বৃদ্ধের কাঁপতে থাকা চিবুকের বেশ ধরে, আবার টগবগে তরুণীর পায়ের নূপুর হয়ে।

কখনো সে মসজিদের মিনারে আজানের আগে জমে থাকা দীর্ঘ নীরবতা, কখনো পোড়া মন্দিরের ইটের ফাঁকে ঘুমিয়ে থাকা শেষ ধূপের গন্ধ। কখনো যুদ্ধফেরত সৈনিকের বুকের ভেতর আটকে থাকা অঘোষিত কান্না, কখনো সদ্যোজাত শিশুর প্রথম নিঃশ্বাসে লুকিয়ে থাকা হাজার বছরের ক্লান্তি।

দেবযানী তখন বুঝতে শিখল, পরাজয় কোনো পতাকা নামার শব্দ নয়; পরাজয় হলো যখন মানুষ নিজের ছায়াকেও অপরিচিত বলে মনে করে।

যখন করতালির ভেতর কফিন বানানোর কাঠের শব্দ শোনা যায়।

যখন ভালোবাসা চিঠির খামে পৌঁছায়, কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

যখন ঈশ্বরের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া প্রার্থনা মাঝ আকাশে থেমে গিয়ে নিজেরই বুকে ফিরে আসে ভাঙা পাখির মতো।

তারপর থেকে দেবযানী আর আলোকে পূজা করেনি। সে বরং অন্ধকারের কপালে একটি জোনাকি বসিয়ে দিয়েছিল।

কারণ সে জানে, সমস্ত নক্ষত্র একসঙ্গে জ্বললেও যে সত্য উচ্চারণ করতে পারে না, একটি জোনাকি মৃত ঘাসের ওপর বসে সেটি অনায়াসে বলে ফেলে।

সে আরও জানে, মানুষ আসলে আলোয় বাঁচে না— মানুষ বাঁচে আলোর প্রতিশ্রুতিতে। আর সেই প্রতিশ্রুতিই সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতারণা।

যে কারণে সভ্যতা প্রতিবার নতুন সূর্য আবিষ্কার করে, কিন্তু নিজের অন্ধকারের নাম আজও উচ্চারণ করতে শেখে না।

এখন দেবযানী প্রতিটি সন্ধ্যাকে একটি ভাঙা রাজমুকুটের মতো কুড়িয়ে নেয়।

প্রতিটি জোনাকিকে মৃত নক্ষত্রের পুনর্জন্ম বলে ডাকে।

প্রতিটি বৃদ্ধের কাঁপতে থাকা হাতের রেখায় সে দেখে সমস্ত সাম্রাজ্যের পতনের মানচিত্র।

প্রতিটি তরুণীর নূপুরে সে শুনতে পায় সময়ের গোপন শিকল ঝনঝন করার শব্দ।

আর রাত গভীর হলে, আকাশ যখন তার সমস্ত নক্ষত্র খুলে একটি বিধবার শাড়ির মতো পৃথিবীর ওপর বিছিয়ে দেয়, দেবযানী তখন নিঃশব্দে বলে ওঠে...

অন্ধকার কখনো আলোর বিপরীত নয়। অন্ধকারই আলোর সবচেয়ে প্রাচীন মাতৃভাষা।

আর মানুষ? সে তো কেবল সেই ভাষার ভুল উচ্চারণ।

তাই যুগের পর যুগ ফিনিক-ফোটা জ্যোৎস্নার ভেতর দাঁড়িয়েও জোনাকির আলোয় আঁতকে উঠে নিজেরই উঠোন হাতড়ে মরে।

আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন