কবিতা : বঙ্গ নগরীর বাউলাকাশ
কবি : সমর চক্রবর্তী
গ্রন্থ : বঙ্গ নগরীর বাউলাকাশ
প্রকাশকাল :
রচনাকাল :
বঙ্গ নগরীর বাউলাকাশ || সমর চক্রবর্তী
১
বঙ্গ নগরীর বাউলাকাশে
কালের সুতোয় ওড়ে
চর্যার বর্ণমালা,
তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে জেগে ওঠে নবান্নের চাঁদ
ঘাম-কামের সন্তগ্রামে
সাহসগুলো এখানে সাজানো থরো থরো
ভরা যৌবনা
শ্যামল অন্তরে প্রেম-বয়ে আনে বিপ্লব
নবীন রক্তের ধারা
স্বপ্নাকাশে ফোটায় জমজ স্বপ্নের ফুলকুঁড়ি
কেমন আছ শবরপা, নতুন কবির
বিহ্বল এ শতাব্দীতে?
স্বপ্নে পড়েছে কী জীবনের বিপরীত ছায়া
উদাসী রঙে?
মহাশূন্য মহানীল মহাবেদনার জল
জ্বলে স্বপ্নের প্রতিবিম্বে
ঈর্ষাগুলো রাজহাঁস হয়ে সাঁতরায়
দীর্ঘ ঘুমে জেগে ওঠে অথৈ দিঘি কামনার রঙে
কেমন আছ কাহ্নপা চর্যার আলোর নতুন ভোরে
ডোম্বীর শরীর ধোয়া আগুনে আজ?
কী যে পোড়া শরীর গিলে ফেলে সহমরণচিতা
কী যে আর্তি ফিরে আসে লখিন্দর বেহুলার ভেলায়!
বর্ণনাহীন ক্রমিক মানুষেরা সোমত্ত এইসব বীজে আর্য-অনার্য তবু বর্ণখেলা
ভাঙে গড়ে ইতিহাস
মানুষ এগিয়ে যায় কাঁধে চেপে ধর্ম
কর্মের হাত ধরে।
২
আর্য, তোমরা শিখিয়েছ যা আমাদেরই লুট করে
লুকিয়েছ ইতিহাস
তোমরা দিয়েছ যা নিয়েছ নিংড়ে
করেছ প্রভুরে দাস
ফিরিয়ে দাও হে আগন্তুক, ফিরিয়ে দাও
অনার্য-স্বকাল সেই গঙ্গারিডির,
মুণ্ডা শবর নিষাদের পুষ্পিত রঙিন হাত
দ্রাবিড় মাটি আর বঙ্গের বুক ফুঁড়ে
সশব্দে গর্জে উঠুক, হেসে উঠুক নগর-জনপদ
সন্তগ্রামে কল্লোল তুলুক উজ্জ্বল কৃষি
গোপন প্রেমিক খুঁজে পাক ঐতিহ্যের সুগন্ধ
অঙ্কুরিত প্রতিটি শস্য হোক সম্ভার সম্ভাবনার
ফিরিয়ে দাও আর্য, ফিরিয়ে দাও
রক্ত-ঘামে লেখা মানুষের প্রাচীনলিপি
কালের কলম, লাঙলের ইতিহাস
স্বপ্নবিবরে মৃত্যুঞ্জয়ী জন্মক্ষুধা
আর্য তোমরা আনো নাই কৃষি
তোমরা আনো নাই বিপ্লব
তোমরা আনো নাই সভ্যতা
আমাদের জীবনব্যাপী যবন শীৎকার
যুদ্ধের অমর শিল্প হয়ে সংগ্রাম আসে চেতনায়
জীবন চেনায় সে সময় সংস্কৃতির
তারই স্রোতধারা তরঙ্গে তরঙ্গে ধ্বনি তোলে, বিপ্লব বিপ্লব
৩
অনার্য আমরা মাটির গর্ভের ঘুম ভাঙাই নবীন হাতে তৃণাঙ্কুরের স্বপ্ন জাগাই প্রেমের স্রোতে।
আমাদের ঘরে ঘুম নেই, স্বপ্ন নেই
স্বপ্নের পলিতে শস্যদানার জাগরণ নেই
মরুভূমির করুণাতলে
প্রেমের ঠোঁট মেলে
তবু চুম্বন উদ্যত মরীচিকা।
আমরা সাহসে বুক বাঁধি
মাটির গোপন রেণু মাখি গায়ে
পূর্বপুরুষের মাথার কসম খেয়ে সামনে দাঁড়াই
এ মাটি আমার
এই মাটির কাদাজলে আমার চৌদ্দপুরুষের ইতিহাস
দেখো, আমাদের শোণিতাক্ত বর্ণমালা
এই দেখো আমাদের সংগ্রাম সাহসের মাটি।
আমাদের স্বপ্নে কোনো রং নেই, স্বপ্ন আসে
শাদাকালো দীর্ঘ জাগরণে,
রজঃস্বলা রাত্রি ফোটায় আদিমফুল
মাটির বুক চিরে দারুণ মৌসুম তাই ফসল ফলাবার
শুধু আমাদের হাতে হাত নেই, শুধু
হাতগুলো উড়ে গেছে তোমাদের হাতে
8
অনার্য আমরা এসেছি যুগে যুগে বারবার
মৃত সময়ের অস্থির স্তূপ থেকে
দ্রোহ-বিদ্রোহে সংগ্রাম-চেতনায়
ভেসে ভেসে আমরা এসেছি,
দাসখতে টিপসই দিতে দিতে
তোমাদের স্বপ্নের রেশমি জাল বুনে দিতে দিতে
স্বপ্নবান রোদ্দুর হয়ে আমরা এসেছি।
জীবনের ঘুম ভাঙাতে আমরা এসেছি
তৃণাঙ্কুরের স্বপ্ন জাগাতে আমরা এসেছি
আমরা অনার্য জাতি আমাদের দুঃখগুলো 'হা' করে কপাট খুলে আছে
আমাদের জীবনচিহ্নে কোনো অলৌকিক গাঁথা নেই;
আমাদের ইতিহাস আছে, সংগ্রাম আছে
আমাদের সংস্কৃতিও আছে।
আপনার পছন্দের কবিতার নাম কমেন্টে জানান
Follow Now Our Google News
সমর চক্রবর্তী’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
- বঙ্গ নগরীর বাউলাকাশ (0000)
লেখক সংক্ষেপ:
১৯৭৩ সালের ১৫ মার্চ জন্ম নেয়া কবি সমর চক্রবর্তী দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম। বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, তিনি পরিচিতি পেয়েছেন তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। নব্বই দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই কবির কাছে সাহিত্যই ধ্যান-জ্ঞান। সাহিত্য সাধনার জন্য তিনি সরকারি চাকরি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদ বারবার ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস—সাহিত্য কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটি এক ধরনের সাধনা।সমর চক্রবর্তী সার্বক্ষণিক কবি ও সব্যসাচী লেখক। কবিতা, গল্প থেকে গবেষণাধর্মী ইতিহাস—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। পাঠক ও সমসাময়িক লেখক—উভয়ের জন্যই তিনি লিখেছেন নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে। মানবিক মূল্যবোধ ও প্রতিবাদী চেতনা তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।এ পর্যন্ত তিনি ১২টি মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে দিগন্তের স্বপ্নারোহী, আদিম অশ্বের পিঠে, নক্ষত্র মরে মরে গ্রহ হয়ে যায়, রঙিন স্বপ্নের বাসিন্দারা প্রভৃতি। তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ভূষণা রাজ্যের ইতিহাস বিশেষভাবে প্রশংসিত।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন