মুক্তমত         :        জামায়াত ক্ষমতায় এলে মানুষের মগজ হবে জেলখানা
লেখক           :         শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রচনাকাল     :         ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জামায়াত ক্ষমতায় এলে মানুষের মগজ হবে জেলখানা || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
জামায়াত ক্ষমতায় এলে মানুষের মগজ হবে জেলখানা || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব


জামায়াত ক্ষমতায় এলে মানুষের মগজ হবে জেলখানা  || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব



জামায়াতে ইসলাম তথা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে মেয়েদের সমস্যা হবে কেন—এই প্রশ্নটা যারা করেন, তারা সমস্যাটাকে শুধু আইনের জায়গায় খোঁজেন। তারা ধরে নেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো লিখিত আইন হচ্ছে না, ততক্ষণ ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আসল শক্তি আইন না। এর শক্তি লাইসেন্সে। কে কাকে শাসন করতে পারবে, কে কার শরীর নিয়ে কথা বলতে পারবে, কে কার স্বাধীনতার ওপর নৈতিক দাবি তুলতে পারবে—এই লাইসেন্সটাই আসল ক্ষমতা। এই লাইসেন্স এখনো আনুষ্ঠানিক হয়নি। কিন্তু সমাজে এর প্র্যাকটিস শুরু হয়ে গেছে।

সম্প্রতি একটি ঘটনা পড়েছি। লং কামিজ আর চাদর পরা এক মেয়েকে রিকশাচালক মাঝপথে মাথায় কাপড় দিতে বলে। সঙ্গে যোগ করে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে “এইসব ঠিক হয়ে যাবে”। এখানে সমস্যা শুধু হ্যারাসমেন্ট না। সমস্যা হলো একজন রিকশাচালক নিজেকে নৈতিক কর্তৃপক্ষ ভাবছে। সে ভাবছে, তার অধিকার আছে একজন নারীর পোশাক ঠিক করে দেওয়ার।একজন নারী কিভাবে কি পরবে, কিভাবে হাটবে, কিভাবে কথা বলবে — এসব নির্ধারণ করে দেয়াটা তার আবশ্যক দায়িত্ব।

এই সাহসটা আসে কোথা থেকে? এটা আসে ভবিষ্যতের আশ্বাস থেকে। একটা রাজনৈতিক পরিবেশের ইঙ্গিত থেকে, যেখানে এই ধরনের আচরণকে অপরাধ না বলে দায়িত্ব বলা হবে।

একজন নারী ইনফ্লুয়েন্সারের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথা বলি। তিনি সেন্ট মার্টিনে গিয়েছিলেন টুরিস্ট সিজন শেষের পর, একেবারে ফাঁকা বিচে সকালে ছবি তুলছিলেন। গাউন উড়িয়ে একটি ছবি। সেখানে ছেলেদের অ্যাবিউসিভ কমেন্ট নতুন কিছু না। কিন্তু যেটা ভয়ংকর, সেটা হলো মেয়েদের অংশগ্রহণ। একজন নারী আরেকজন নারীর রানিং ট্রাউজারের সেলাইকে গোপনাঙ্গের ভাঁজ বলে মন্তব্য করেছে। এটা কোনো অশিক্ষিত পুরুষের রিফ্লেক্স না। এটা একজন নারী, যে নিজেও এই সমাজে নারী হয়ে বেঁচে আছে, তার মুখের ভাষা। এই ধরনের মন্তব্য তখনই সম্ভব, যখন নারীর শরীরকে আগে থেকেই যৌন অবজেক্ট হিসেবে দেখার ট্রেনিং দেওয়া থাকে।

এই ট্রেনিংটা কে দেয়? সোজা করে বললে, জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক ‘নৈতিক’ রাজনীতি। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না। এগুলো আকস্মিকও না। এগুলো সিস্টেমিক। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলাম ক্ষমতার কাছাকাছি এলে মেয়েদের সমস্যা বাড়বে, কারণ তখন সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে আর থাকবে না। সেটা চলে যাবে সবচেয়ে ভোকাল, সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মোরাল মবের হাতে। আর এই মব কোনো বিমূর্ত গোষ্ঠী না। এরা খুব পরিচিত মুখ—পাড়ার মানুষ, পরিবার, কমেন্ট সেকশন, রিকশা, বাস, আত্মীয়ের ড্রইংরুম।

রিকশাচালকের সাহস আসবে কারণ সে জানবে, সে একা না। তার পেছনে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ নৈতিকতার আশীর্বাদ। আজ সে মাথায় কাপড় দিতে বলছে। কাল নাম জিজ্ঞেস করবে। পরশু বলবে এই রাস্তায় এইভাবে হাঁটা ঠিক না। এরপর ছবি তোলা নিয়ে আপত্তি আসবে। তারপর বলা হবে, বের হওয়াটাই ঠিক না। এগুলো হঠাৎ বড় কোনো লাফ না। এগুলো ধারাবাহিক ছোট ছোট পাওয়ার এক্সারসাইজ। প্রতিদিন এক ইঞ্চি করে সীমা ছাড়ানো।

সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটা হলো, এই পাওয়ার এক্সারসাইজে মেয়েরাও অংশ নেয়। কারণ এই সিস্টেমটা মেয়েদের শেখায় একটা নির্মম প্রতিযোগিতা—আমি যদি ভালো মেয়ে হই, তাহলে কাউকে না কাউকে খারাপ মেয়ে হতে হবে। সবাই একসাথে ভালো হতে পারে না। নৈতিক স্কেলে কাউকে নিচে নামাতে না পারলে, কেউ উপরে উঠতে পারে না।

এই দেশে পোশাক দিয়ে চরিত্র মাপা নতুন কিছু না। কিন্তু যখন এই অভ্যাসের গায়ে ধর্মের সিল মারা হয়, তখন সেটা আর কুৎসিত থাকে না। তখন সেটা হয়ে যায় দায়িত্ব। অন্য নারীকে শাসন করা তখন নিছক হিংসা না, তখন সেটা নৈতিক কর্তব্য।

এই কারণেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর খুব বেশি কিছু করার দরকার পড়ে না। তারা আলাদা করে ঘোষণা দেয় না যে মেয়েরা ঘরে থাকবে। তারা শুধু কিছু শব্দ ছুড়ে দেয়—“ভালো মেয়ে”, “শালীনতা”, “সংস্কৃতি”। বাকিটা সমাজ নিজেই বাস্তবায়ন করে। কমেন্ট সেকশন আদালত হয়ে যায়, রিকশা আদালত হয়ে যায়, বাস আদালত হয়ে যায়, আত্মীয়দের আড্ডা আদালত হয়ে যায়, বিচারক হয় সবাই।

এই নৈতিক কাঠামোর ভেতরে সবচেয়ে ভয়ংকর যে ধারণাটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, সেটা হলো পুরুষের যৌনতা তার নিজের দায় না। সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নারীর। মেয়ের কাপড় ঠিক থাকলে পুরুষ ঠিক থাকবে—এই মিথটা এতটাই শক্ত যে এই দেশে পুরুষের বিয়ে, পরকীয়া, দ্বিতীয় বিয়ে, তৃতীয় বিয়ে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যের বউ কী পরবে, কোথায় যাবে, কখন হাসবে—এসব নিয়ে সবার মতামত থাকা একদম স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়।

এভাবে একজন নারীর শরীর ধীরে ধীরে পাবলিক প্রপার্টিতে পরিণত হয়। দেখার অধিকার সবার। মন্তব্য করার অধিকার সবার। শাসন করার অধিকার সবার। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আসল শক্তি এখানেই। তারা আইন দিয়ে কম শাসন করে, মানসিকতা দিয়ে বেশি শাসন করে। আর এই মানসিকতা একবার বসে গেলে পুলিশ লাগে না, কোর্ট লাগে না। একজন রিকশাচালকই যথেষ্ট। একজন কমেন্টবক্সের নারীই যথেষ্ট। এই জায়গা থেকেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা উঠে আসে। পুরুষরা কেন ধর্মভিত্তিক দলকে ভোট দেবে, সেটা বোঝা কঠিন না। তারা এই সিস্টেমের সুবিধাভোগী। কিন্তু নারীরা কেন দেবে? 

যে নারী অন্য নারীর শরীর নিয়ে মন্তব্য করাকে সাপোর্ট করে, সে নিজেকে নিরাপদ ভাবছে, কারণ সে নিজেকে “ভালো মেয়েদের” দলে রাখছে। কিন্তু এই নিরাপত্তা কাগজের দেয়াল। কারণ আজ যে স্কেল দিয়ে সে অন্যকে মাপছে, কাল সেই স্কেল দিয়েই তাকেও মাপা হবে। যে সিস্টেমে নারীর শরীরই বিচার্য, সেখানে কোনো নারীই নিরাপদ না। এই বাস্তবতা বুঝতে আইন বদলানোর অপেক্ষা করতে হয় না। এটা ইতিমধ্যেই আমাদের রাস্তায়, কমেন্টে, বিচে, ঘরে ঢুকে গেছে।

একটি প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন—যেসব নারী এই কট্টরবাদী চিন্তাধারাকে সমর্থন দিচ্ছেন বা ধর্মভিত্তিক দলকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন, তারা কি জানেন তারা নিজের পায়ে কত বড় কুড়াল মারছেন? রাস্তায় একজন নারীর শরীর নিয়ে মন্তব্য করাকে যখন অন্য একজন নারী সমর্থন দেয়, তখন সে মূলত নিজের দাসত্বেরই সিলমোহর দেয়।

​ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কেবল আইন দিয়ে শাসন করে না, তারা শাসন করে মানুষের মগজ দিয়ে। আর এই মগজ ধোলাই একবার সম্পন্ন হয়ে গেলে কোনো আলাদা পুলিশের প্রয়োজন পড়ে না। একজন রিকশাচালক বা একজন নারী কমেন্টকারীই তখন যথেষ্ট অন্য একজন নারীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলার জন্য।

আমাদের লড়াইটা কেবল রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, এই শেকলবন্দি মানসিকতার বিরুদ্ধে। যদি আমরা আজও বুঝতে না পারি যে আমাদের নীরবতা এবং আমাদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজন কীভাবে একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আনছে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজপথ আর প্রতিটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হবে নারীদের জন্য এক একটি জেলখানা। যেখানে দেয়াল থাকবে না, কিন্তু প্রতি জোড়া চোখের দৃষ্টি হবে এক একটি শাসানি। সময় এসেছে প্রশ্ন করার—আমরা কি সত্যিই এমন এক সমাজ চাই যেখানে একজন রিকশাচালক বা অচেনা কোনো ফেসবুক ব্যবহারকারী আমাদের চরিত্রের মাপকাঠি ঠিক করে দেবে?




মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com


 Follow Now Our Google News



লেখক সংক্ষেপ:
কবি শিমুল চৌধুরী ধ্রুব তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপিতে' নিজের পরিচিতি সম্পর্কে লিখেছেন ❝নাম, ধাম, বয়স, জন্ম, সময়-বিবিধের বেড়াজালে আমি কোনোদিন হারাতে চাইনি এবং ভবিষ্যতেও চাইনা। বইয়ের শেষ পৃষ্টা উল্টিয়ে কবি'র পরিচয় পাওয়া কি আদৌ সম্ভব! কবি যুবক নাকি বৃদ্ধ, ধনী নাকি দরিদ্র, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিনা, এসব আমার কাছে বরাবরই অপ্রাসঙ্গিক। কবির পরিচয় নিহিত থাকে মূলত তার সন্তানসম কবিতায়।

আমার পরিচয়ের কথা যদি বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে আমি অতি সাধারণ এবং নগন্য এক মানুষ। এর বাইরে দেবার মতো পরিচয় আমার নেই।❞

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন