উপন্যাস : অঘটনের প্রত্যাবর্তন
লেখক : সাইফ নাসির জিতু
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল : ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
![]() |
| অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু |
অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু (পর্ব - ৪)
ম্যাকপাই থেকে বেরিয়ে গাড়ি ঠিক কোন দিকে গেল খেয়াল করেনি জাহেদ। অনেক কাজ, কোনটার পর কোনটা করবে—মনে মনে সব গুছিয়ে নিচ্ছিল সে।
মুকসুদুর রহমান স্যারকে ফোন দিয়ে আপডেট জানাতে হবে। স্যার চাইলে ম্যাকপাই গ্রুপের পেট থেকে আজ রাতেই টাকাটা বের করতে পারতেন। শুধু মূল ঘটনা আড়াল করার জন্যই ওদের অফিসে গিয়ে আলোচনার ঢং করতে হলো। মুকসুদুর রহমান ও তার লোকজন পারে না এমন কোনো কাজ নেই। জাহেদ তাদের সিন্ডিকেটেরই একজন। জাহেদের ওপর স্যার কেন এত ভরসা করেন সেটা জাহেদ নিজেও বোঝে না। জাহেদের জীবনে যদিও সাকসেস রেট ভালো, তবু মুকসুদুর রহমানের সিন্ডিকেটের মতো অঘটনঘটনপটীয়সী সে নয়। অন্তত তার সেটাই ধারণা।
ঢাকায় তার থাকার জায়গাটা খুব একটা ভালো হয়নি। বড় একটা ফ্ল্যাটের সাবলেট হিসেবে একটা রুম ভাড়া নিয়েছে। ভালো কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এমন জায়গা যেখানে সবাইকে আনা যায়।
এরপর পুরোনো খেলোয়াড় একে একে সবার সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তারা কে কোথায় আছে ভাবতে ভাবতে বাম দিকে চোখ গেল, যেখানে গুলশান থানার সাইনবোর্ড চোখে পড়ছে।
গুলশান থানার কথা মনে হতেই জাহেদের মন ছুটে গেল পুরনো স্মৃতিতে।
গুলশান থানার সেই ওসি কি এখনো আছে? জাহেদের অনেকগুলো বদঅভ্যাসের একটি হলো—পুরোনো কারও সাথে সে যোগাযোগ রাখে না। জীবনের চরম বিপদের সময় এই ওসিই তাকে সরকারের রোষানল থেকে আগলে রেখেছিলেন।
সেই বহুকাল আগের কথা। দেশজুড়ে তখন মব চলছে, প্রতিদিন লাশ পড়ছে, কে কাকে মারছে বোঝার উপায় নেই। হঠাৎ করেই একদল ছেলেপেলে কারও বাসার সামনে গিয়ে হামলা করছে। তাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের দোসর। ব্যস, পুলিশ প্রটেকশন দেওয়ার বদলে তাকেই ধরে থানায় নিয়ে যাচ্ছে।
এই মবের হাতে দলে দলে মারা পড়ছে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অভিনেতা থেকে শুরু করে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। একের পর এক প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কারও প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকলেও মব চালিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে।
এরকম ঝড়ো সময়ে জাহেদের ঘাড়ে পড়ল তিনটি মামলা। দুটি মানহানির, একটি নারী নির্যাতনের। সবগুলোই সাজানো—আইনি প্রক্রিয়ায় একটা মামলাও টিকবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে অন্তত দুই বছর তাকে বিনা বিচারে জেলে থাকতে হবে। আইনজীবীরা সব পলাতক। মামলার ডেট পাওয়া যাবে না, জামিন তো দূরের কথা।
জাহেদ যখন মামলার বিষয়ে জানতে গুলশান থানার ওসির কাছে গেল, তখন ওই ওসিই বলেছিলেন,
“জাহেদ ভাই, এখন সোজা পথে হাঁটবেন না। আইন-টাইন দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। সবকিছুই চলছে উপরের নির্দেশে। আমার এরিয়ার পুলিশ আপনাকে ধরবে না, বলা আছে। কিন্তু এরিয়ার বাইরে ধরা পড়লে আমি কিছু করতে পারবো না ভাই। জেলের ভেতরেও বাঁচার গ্যারান্টি নাই। ডেইলি কত মানুষ জেলের ভেতরে মরে হিসাব আছে? এখন তো খাতায় লিখে জেলে ঢোকায় না, হিসাব করবেন কেমনে? ভালো বুদ্ধি দেই—চুপচাপ ঘরে থাকেন।”
কিন্তু জাহেদের পকেটের টাকা তখন ফুরিয়ে এসেছে, আর বেশিদিন ঘরে থাকা সম্ভব ছিল না। মেসের খাবারের টাকা বাকি। সামনের মাসের ভাড়া কিভাবে দেবে সেটাও জানা নেই। তাকে কাজের খোঁজে প্রায়ই বের হতে হয়। আর বের হতে হয় অবনীর জন্য। জাহেদ অবনী থেকে দূরে দূরে থাকে। কখনো জাহেদের ওপর হামলা হলেও যেন অবনীর কিছু না হয়।
এমনিতেও অবনীর সঙ্গে সম্পর্কটা খারাপ যাচ্ছে, সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য যতটা এফোর্ট দরকার ততটা মানসিক স্থিতিও নেই জাহেদের। কখন কার হাতে মারা পড়ে তার ঠিক নেই। এই অবস্থাতেই একবার সে গিয়েছিল অবনীর সাথে দেখা করতে। সম্ভবত সেটাই ছিল শেষ দেখা।
সেদিন রেস্টুরেন্টটা একেবারে শান্ত ছিল, যে কয়েকটা টেবিলে লোকজন আছে তারাও খুব একটা চেঁচামেচি করছে না।
অবনী শেষের টেবিলটায় বসে মনে মনে কিছু ভাবছে। আজকেই কি শেষ দেখা? আজ কি বলবে জাহেদ? সে কি ফিরে আসতে চাইবে তার জীবনে? জাহেদ যদি নিজেকে ভেঙেচুরে অবনীর কাছে ফিরে আসতে চায়, তাহলে খারাপ হয় না। যে আমাকে ছাড়া থাকতে না পেরে ফেরত আসে তার শর্ত দেওয়ার বা অধিকার খাটানোর জোর থাকে না।
কিন্তু সে যদি মেরুদণ্ড সোজা করে ফিরতে চায়, তাতে অবনীর যথেষ্ট আপত্তি আছে। সে ক্ষেত্রে যে কোনো উপায়েই হোক সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সম্পর্ক রাখা কিংবা বের হয়ে আসার দুটো উপায়ই আছে অবনীর হাতে।
রেস্টুরেন্টের আশেপাশেই কোথাও অপেক্ষা করছে অবনীর নতুন ভালোবাসার মানুষ ‘ইমন’। প্ল্যান আছে জাহেদ বিদায় হলেই ইমনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়বে অবনী। অবনীর জীবনে যেটুকু ফাটল ছিল সেটুকু ভালোভাবেই পূরণ করেছে ইমন। এখন অপেক্ষা শুধু পুরোপুরি পাওয়ার। তবে সেটি সামাজিকভাবে পেতে কিছুটা সমস্যার হলেও বাস্তবে অবনী এখন পুরোপুরি ইমনের। দিনরাত একাকার করে তারা প্রেম চালিয়ে যাচ্ছে। সময়টা ভালোই কাটছে অবনীর।
এদিকে ইমন ভাবছে, আজকে কি এমন কিছু হয়ে যেতে পারে যাতে তারা আবার একে অপরের কাছে চলে আসবে! তারা কি আবার মিলবে? ইমনের কি হবে? এই ভাবতে ভাবতে ইমন খেয়াল করল জাহেদ ঢুকছে রেস্টুরেন্টে। এবার ইমনের অপেক্ষা শুরু। এটা তো কোনো নরমাল ডেট নয়। কথার পিঠে কথা বাড়তে বাড়তে সেই কথা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, কত সময় লাগে জানা নেই ইমনের।
কিন্তু আশ্চর্য—মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই বের হয়ে গেল জাহেদ। এত দ্রুত কিভাবে কথা শেষ হলো এটা ভাবতে ভাবতেই ইমনের ফোনে ভেসে উঠল অবনীর ছবি। ফোনটা অবনীরই কিনে দেওয়া। প্রথমে সে নিজের নাম্বারটা সেভ করে দিয়ে নিজের পছন্দের একটা ছবি এড করে দিয়েছিল কলার টিউনে।
ফোন রিসিভ করতেই অবনী বলল, “ভিতরে আসো।”
ইমন ভিতরে ঢুকে দেখতে পেল অবনী খাবার অর্ডার করছে। ইমন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখোমুখি চেয়ারে বসল। কণ্ঠে উদ্বেগ, “কি হলো?”
অবনী ইমনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
“কি হলো বলো? খাবার অর্ডার দিচ্ছ, জাহেদ ভাই কি আবার আসবে?”
অবনী এবার রহস্যের হাসি হেসে বলল, “না, আসবে না। আসার রাস্তা বন্ধ।”
“সে বুঝলাম, কিন্তু এত দ্রুত চলে গেল কেন?”
অবনী হেসে বলল, “আমি পরিস্থিতিতে পড়ে সিদ্ধান্ত নিই না। আগে সিদ্ধান্ত নিই, তারপর পরিস্থিতি সৃষ্টি করি। আমি ওকে এমন কথাই বলেছি যাতে সে এক মিনিটও না বসে চলে যায়।”
শুনে ইমন হো হো করে হেসে উঠল। “তাহলে এই বৈঠক কেন করলে?”
অবনী বলল, “জাহেদের ইচ্ছে ছিল একটু দেখা করবে। সে হয়তো কিছু বলার চেষ্টা করবে, তাই আসতে বলেছিলাম। ওর ধারণা ছিল শেষ আলোচনার কথা শুনে আমি আবেগপ্রবণ হবো। কিন্তু আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, ওকে দশ মিনিটের মধ্যেই বিদায় করবো।”
ইমন খুশিতে বলে উঠল, “ওহ বেচারা! কিছু খাওয়াও হলো না তার।”
অবনী বলল, “রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাবে, আর মেসে গিয়ে বুয়ার রান্না খাবে।”
তারপর দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল। এই প্রথম রেস্টুরেন্টের কোনো টেবিলের হাসির শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
অবনীর এই ইচ্ছাকৃত বিচ্ছেদের বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছিল দোলন। দোলনের জন্য এটা ছিল শাঁখের করাত। অবনীর ইচ্ছাকৃত বিচ্ছেদের ধারণাটা জাহেদকে বলে দিলে সম্পর্ক ভাঙবে, না বললেও ভাঙবে। কিন্তু অবনীর জন্য যদি জাহেদ ডেসপারেট হয়ে যায়…
সময়টা এমন যে নিজেকে জোর করে বাঁচিয়ে না রাখলে বেঁচে থাকা কঠিন। সিন্ডিকেট ভেঙে গেছে। কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যোগাযোগ হচ্ছে খুব কম। এ অবস্থায় জাহেদ যদি মজনুর মতো হাল ছেড়ে দেয়, মারা পড়বে নির্ঘাত।
এদিকে দোলন নিজেও বিপদে আছে। চিরকাল রাজনীতির বাইরে থাকা তার জামাইকে বিনা কারণে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। দোলন সেলিব্রেটি সাংবাদিক। সরাসরি দোলনকে ধরলে একটা কাণ্ড ঘটার সম্ভাবনা আছে, তাই তার স্বামীকে দিয়ে দোলনকে থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
দোলনকে আদালতে শুনানির সময় দুইদিন যেতে হয়েছে, দুইবারই তার ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছে। প্রতিবার শুনানির আগে উড়ো ফোন এসেছে—পাবলিকের সামনে যেন কোনো বক্তব্য না রাখে। দোলন কথা রেখেছে। স্বামীকে বাঁচাতে সাংবাদিকের হাজার প্রশ্নের উত্তরে চুপ করে থেকেছে।
এটিও পরদিন অনলাইনগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে।
সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিৎকার করা দোলন আজ চুপ কেন? আজ কি লজ্জায় দোলনের মাথা হেঁট হয়ে আছে? এমন নানান আলোচনায় ফেসবুক সয়লাব হয়েছিল।
সেই রাতেই একদল লোক বাসায় হামলা চালায়। সোসাইটি থেকে দোলনকে নোটিশ দেওয়া হয়। হাউজিংয়ের সভাপতি অত্যন্ত অমায়িক ভঙ্গিতে বলেছিলেন, “আপা, আপনার কাছ থেকে জীবনে বহু উপকার পেয়েছি, কিন্তু কী করবো বলেন, সবাই তো শান্তিপ্রিয় মানুষ। আপনার জন্য ভয়ে থাকতে হয়।”
সেই রাতেই ঘর ছাড়তে বলেনি সোসাইটি। কিন্তু রাতে আবার হামলা হতে পারে এই ভয়ে দোলন সেই রাতে বাসায় থাকেনি। সে নিজে মরতে পারে, কিন্তু তার পেটে থাকা অনাগত সন্তানের জন্য তো বাঁচতেই হবে। মবেরা যে অন্তঃসত্ত্বাকেও ছাড় দিচ্ছে না।
সেই রাতেই মুকসুদুর রহমানকে ফোন দিয়েছিল দোলন। ফোন বন্ধ ছিল। তবে অনেক রাতে স্যার কলব্যাক করে শুধু বলেছিলেন—
“যেভাবেই হোক সারভাইভ করো। সব ক্ষতি একসময় পুষিয়ে দিতে পারবো, কিন্তু কারো মৃত্যুর ক্ষতি পুষাতে পারবো না দোলন। যেমনে হোক বেঁচে থাকো।”
বুক ফেটে কান্না আসছিল দোলনের। স্বামী জেলে, একটু পরপর বাসার সামনে লোকজন জটলা করছে। তারা কি মব না এমনিতেই জড়ো হচ্ছে বোঝার উপায় নেই। সে নিজে পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদে আশ্রয় নিয়েছে। উপর থেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। এমন সময় একটি রিকশায় তার চোখ আটকে গেলো। শাড়ী পরা হাস্যজ্জাল মেয়েটি কে? অবণী না? সাথের ছেলেটিকেও তো সে চেনে!! জাহেদের বাসায় দেখেছে কয়েকবার। জাহেদ কি ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছিলো?
নোট- গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারো ব্যক্তিগত বা জাতীয় জীবনের সঙ্গে মিলে গেলে তা কাকতালীয়।
Follow Now Our Google News
চলবে ...
৫ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
সাইফ নাসির জিতু’র গল্প ও উপন্যাস:
লেখক সংক্ষেপ:
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন