উপন্যাস        :         অঘটনের প্রত্যাবর্তন
লেখক           :         সাইফ নাসির জিতু
গ্রন্থ                :         
প্রকাশকাল    :         
রচনাকাল      :         ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ইং

অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু
অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু

অঘটনের প্রত্যাবর্তন || সাইফ নাসির জিতু (পর্ব - ৩)

লনে বসার পর থেকেই জাহেদের মনে একধরনের প্রশান্তি আসতে শুরু করেছে। গাড়িতে থাকা অবস্থায় যে উত্তেজনা আর বিরক্তিভাব ছিল, সেটা কাটতে শুরু করেছে। এটা হয়তো লনের সুন্দর পরিবেশের জন্য। জাহেদ মনে করতে চেষ্টা করল, দেশে ঢোকার পর থেকেই আসলে এমন শান্ত পরিবেশে তার বসা হয়নি। একের পর এক কাজ আর জার্নি করেই সময় গেছে।

এই লনে এমন কিছু নেই, যার দিকে বাধ্য হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়—বেশ কিছু গাছ, ফোয়ারা থেকে পানি পড়ার শব্দ আর সামান্য কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন ফার্নিচার। দৃষ্টিদূষণ ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করল সে। ঢাকা শহরের বাড়িঘরের ডিজাইন, লাইটিং, পোস্টার, বিজ্ঞাপন যে কী পরিমাণ দৃষ্টিদূষণ তৈরি করে, এটা দেশের বাইরে না গেলে বোঝা সম্ভব না।

দৃষ্টিদূষণের ব্যাপারটা জাহেদ প্রথম জানতে পেরেছিল টিভি চ্যানেলে কাজ করার সময়। আমাদের চ্যানেলগুলোর নিউজ প্রেজেন্টারদের পোশাকের রং আর ব্যাকগ্রাউন্ডের রঙের সমন্বয় না থাকায় একটা ক্লামজি ভাব হয়; দর্শক নিজের অজান্তেই মানসিকভাবে অস্থির হয়ে ওঠে।

জাহেদের ভাবনা সীমা ছাড়িয়ে অতীতে চলে যেতে থাকে। কে জানে, আমাদের দেশের সবাই কি এ কারণেই অশান্ত, খিটখিটে মেজাজের? অবনীকে কিছুদিন দেশের বাইরে নিয়ে রাখতে পারলে কি সবকিছু ঠিক থাকত?

--
ম্যাকপাই গ্রুপের এমডি শফিকুর রহমানের তব্ধা খাওয়া ভাবটা এখনো কাটেনি। তিনি লনে নেমেই ভাবলেন, একজন গেস্টের ডাকে এভাবে তার নেমে আসা ঠিক হয়নি। হাজার হোক, তিনি একটি বড় কোম্পানির এমডি।
কিন্তু কোম্পানির মালিক তাকে মধ্যরাত পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছেন এই লোকের জন্য—সেখানে তিনি না এসেই বা কী করবেন!

দুজন সামান্য হ্যান্ডশেক করার পর জাহেদ বলল, “আমার জন্য কফি আনা হয়েছিল, আমি ফিরিয়ে চা আনতে বলেছি। আপনি চা খাবেন? তাহলে একটু ভেতরে বলে দেন, দুজন চা খেতে খেতে কথা শেষ করি।”

লনে ইন্টারকম নেই। এখন এমডির নিজেরই উঠতে হবে চায়ের কথা বলার জন্য। শফিকুর রহমান মনে মনে নিজেকে গালি দিলেন—এই লোক কি শেষমেশ তাকে দিয়ে চা আনিয়েই ছাড়বে? তিনি কাউকে খুঁজতে লাগলেন। তারপর তীর খুঁজে পাওয়ার মতো একজনকে ইশারা করে আসতে বললেন।

শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাধারণত কর্পোরেট মিটিংয়ে যারা আসে, তারা যথেষ্ট পরিপাটি হয়ে আসে। বিশেষ করে যারা প্রোপোজাল নিয়ে আসে, তারা তো প্রায় মাথা নুইয়ে থাকে।

সবকিছু ঠিক থাকলেও তিনি প্রোপোজাল নিয়ে নানা ধরনের ফ্যাচাং ধরেন। কোনো দোষ না থাকলেও খুঁচিয়ে শুকনো কাগজ থেকে আঠা বের করেন। এসব ক্ষেত্রে ক্লায়েন্ট মনে মনে রিহার্সাল দিয়ে আসে। কিন্তু আজকে শফিকুর রহমানের ফর্ম নষ্ট হয়ে গেছে।

জাহেদের সামনে চায়ের পট, দুধ-চিনি আলাদা করে, দুটো কাপ রাখা হলো। শফিক সাহেব বললেন, “চা নিন ভাই, এটা হচ্ছে চীনের তিগুয়ানিন টি—বিশ্বের সবচেয়ে দামি চায়ের ব্র্যান্ডের একটি। ১২ হাজার টাকা কেজি।”

জাহেদ তিগুয়ানিন চায়ে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ ই বলল, “আমরা আপনাদের কোম্পানির মালিকের ইচ্ছায় এই প্রজেক্ট রান করছি। আপনি কি এটা জানেন?”

এমডি বললেন, “আমি ধারণা করছি, তবে আমার সঙ্গে ডিটেইলস কথা হয়নি।”

জাহেদ বলল, “ডিটেইলসটা হচ্ছে—এখানকার পুরো ইনভেস্ট আপনারাই করছেন, কিন্তু কাগজপত্রে আমরা একটি ভিন্ন কোম্পানি। এ ক্ষেত্রে নতুন কোম্পানির জন্য প্রথম ধাপে যাবতীয় খরচ আপনাদের দিতে হবে। পরের ধাপে আপনারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইনভেস্ট করবেন।”

শফিক সাহেব বললেন, “হুমমম।”
জাহেদ আবার বলল, “প্রাথমিকভাবে অফিস সেটআপের জন্য মোট বিনিয়োগের ২ পার্সেন্ট টাকা অগ্রিম দিতে হবে। বাকিটা আমরা ধাপে ধাপে নেব। এই টাকাটা আমাদের দ্রুত দরকার।”

শফিক সাহেব প্রোপোজালটা হাতে নিয়ে মোট টাকার পরিমাণ দেখলেন। স্বগতোক্তির মতো বললেন, “বড় অ্যামাউন্ট। টু পার্সেন্ট হিসেবে দুই কোটি টাকা দিতে হবে।” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন জাহেদের দিকে।

তারপর বললেন, “আমাদের নরমাল প্রসিডিউর হচ্ছে—প্রপোজালটা যাচাই করতে এক সপ্তাহের মতো লাগবে। এরপর মালিক পক্ষের ও বাকি ডিরেক্টরদের সঙ্গে আলোচনা করে এক মাসের মধ্যে আমরা অর্থ ছাড় দিতে পারব।”

জাহেদ বিরক্ত হয়ে বলল, “শুনেন এমডি সাহেব, এক মাস পর টাকা নেওয়ার হলে কি আমরা মধ্যরাতে মিটিং করতাম? আমাদের হাতে কাল-পরশু বা এই সপ্তাহের পুরোটা সময় থাকত না? আপনার কি মনে হচ্ছে না বিষয়টা আর্জেন্ট?”
“আর্জেন্ট তো অবশ্যই, কিন্তু সবকিছুরই তো একটা প্রসিডিউর টাইম…”

জাহেদ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আপনাকে দুই-তিন দিনের মধ্যে টাকাটা ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাকে এই সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু করতে হবে। আমার হাতে সময় কম। আমি দ্রুত আমার ডেরায় ফিরতে চাই…”

কয়েক সেকেন্ডের জন্য জাহেদের গলা একটু উঁচু হয়ে উঠেছিল।
কর্পোরেট আলোচনার মধ্যে এমন আবেগপ্রবণ হতে এই প্রথম দেখলেন শফিকুর রহমান। অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন!
জাহেদ নিজেও বিব্রত। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “সরি। খুব ভালো হয় আপনি আপনার হায়ার অথরিটির সঙ্গে কথা বলেন। তারা হয়তো দ্রুতই ম্যানেজ করবে।”

তারপর চায়ে কয়েকটা চুমুক দিয়েই বেরিয়ে গেল। বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা জাহেদ আধা কাপের বেশি রেখে চলে গেলেন।

 Follow Now Our Google News


চলবে ...

৪র্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন


সাইফ নাসির জিতু’র গল্প ও উপন্যাস:

  •  




লেখক সংক্ষেপ:


কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন