গল্প                 :          অক্ষরের ওম
গল্পকার           :         মাধবী তাপসী
গ্রন্থ                 :         
প্রকাশকাল      :        
রচনাকাল        :         

ললিতার নিজস্ব ভূগোল || মাধবী তাপসী
ললিতার নিজস্ব ভূগোল || মাধবী তাপসী

 

অক্ষরের ওম || মাধবী তাপসী

নিয়ন আলোর ঢাকা শহরটা চিন্ময়ীর কাছে বরাবরই এক বিরাট হাহাকারের খাঁচা! চারদিকে নিয়ন বাতির তীব্র আলো, পিচঢালা রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর মানুষের অবিরাম ছুটে চলা—সব মিলিয়ে এক যান্ত্রিক কোলাহল! কিন্তু এই তীব্র জাঁকজমকের ভেতরেও চিন্ময়ী বড্ড নিঃসঙ্গ! রিকশার এক কোণে বসে একা একা হুড ফেলে শহর দেখা, কিংবা ফুটপাতের টং দোকানে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে নিজেই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কড়া লিকার চা ভাগ করে নেওয়া—এই ছিল তার চেনা জীবন! কোনো ট্রাভেল পার্টনার কিংবা সন্ধ্যার আড্ডার স্থায়ী কোনো সঙ্গী তার ছিল না! শহরের এই বিশাল জনসমুদ্রে সে নিজেকে ভাবত এক ভাসমান শ্যাওলা, যার কোনো কূল নেই, কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই!

​কিন্তু হঠাৎ করেই ঝড়ের মতো জীবনে আসা ওই একটা মানুষকে ঘিরে সে বড্ড আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েছিল! একটা মানসিক আশ্রয় আর দিনশেষে মনের কথা উজাড় করে দেওয়ার মতো একটা মানুষ পেয়ে চিন্ময়ী ভেবেছিল, এই রুক্ষ বাস্তবতার মাঝেও হয়তো এক টুকরো ওম পাওয়া গেল! সে বিশ্বাস করেছিল, এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে তার মনের মানুষের বুকের মতো প্রশস্ত আর নিরাপদ বুক আর কোথাও নেই! পৃথিবীর সমস্ত কঠিন দর্শন, বাস্তবতার রূঢ় বুলি আর চারপাশের হাজারো নেতিবাচক যুক্তিকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েও তার অবচেতন মনে হতো—আর যাই হোক, মানুষটার বুকটা অন্তত তার সারাদিনের ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতা মোচনের জন্য ভীষণ প্রশস্ত!

​তাদের কাটানো সেই অল্প কিছু বিকেল চিন্ময়ীর স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে ছিল। যখন তারা রমনার কোনো এক নিভৃত কোণে কিংবা ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত, তখন চিন্ময়ীর মনে হতো এই শহরের সমস্ত কোলাহল যেন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেছে। মানুষটার চোখের দিকে তাকালে সে নিজের সব কষ্ট ভুলে যেত। সে ভাবত, জীবনের সব অপূর্ণতা বুঝি এই একটা মানুষের হাত ধরেই পূর্ণতা পাবে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো ছিল আসলে একটা আসন্ন ঝড়ের আগের থমথমে নীরবতা!

​মানুষের মন তো বড় বিচিত্র! নিজের ভেতরের এক তীব্র ফাঁকা লাগা আর গ্রাস করতে আসা খারাপ লাগাগুলো চিন্ময়ী একা সামলাতে পারছিল না। সেই অবাধ্য যন্ত্রণার তাড়না থেকেই গত দুটো দিন সে হয়তো একটু বেশিই যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ফেলেছিল! অনবরত ফোন আর মেসেজের পর মেসেজ পাঠানো—চিন্ময়ীর এতে কোনো অপরাধ ছিল না! সে শুধু তার বুক ভাঙা কষ্ট, দুঃখ আর ক্লেশগুলো একটু হালকা করতে চেয়েছিল! সে চেয়েছিল ওপাশের মানুষটা শুধু একবার বলুক, "আমি আছি তো, ভয় কীসের?" কিন্তু ওপাশের মানুষটা তো জানত না চিন্ময়ী কতটা তীব্র বিষাদ বুকে নিয়ে বেঁচে আছে! চারদিকের জাগতিক ঝামেলায় পিষ্ট সেই মানুষটার কাছে তাই চিন্ময়ীর এই আকুলতাটুকু স্রেফ এক বিরক্তি আর বাড়তি চাপ হিসেবেই ধরা দিয়েছিল!

​তাই নিস্তেজ এক বিকেলে সেই মানুষটাই ফোনে কোনো ভূমিকা ছাড়া, এক ঝটকায় বরফের মতো ঠান্ডা গলায় বলে দিল, "আগামী কিছুদিন আমাকে কোনো ফোন বা মেসেজ দেবে না! এমনিতেই চারদিকের ঝামেলায় আমি শেষ, তোমার এই অধিকারের পরিধি বাড়ানোর দায় আমি এখন নিতে পারছি না!"

​লাইনটা কেটে যাওয়ার পর ঘরের ভেতরের জমে থাকা নীরবতাটা যেন আচমকা ওলটপালট হয়ে গেল! ফোনের ওপাশের যান্ত্রিক ক্লিক শব্দটা চিন্ময়ীর পুরো অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল! মানুষটার এক নিজস্ব সমান্তরাল পৃথিবী, তার চারপাশের পারিবারিক টানাপোড়েন আর জটিলতার কথা চিন্ময়ী জানত! কিন্তু আজ এই সাময়িক নির্বাসনের দাবি কি সত্যিই চারপাশের সুপ্ত কোনো গোপন জট ঘোচানোর সৎ চেষ্টা, নাকি স্রেফ একটা সম্পর্কের দায়িত্ব এক নিমেষে এড়ানোর কোনো নিপুণ অজুহাত? এই রহস্যের শেষ মীমাংসা চিন্ময়ী জানে না! আর চিন্ময়ী তো কেবল শব্দের জাদুকর, যার একমাত্র সম্পদ আর যুদ্ধাস্ত্র হলো ডায়েরির পাতায় কিছু অক্ষরের বিন্যাস!

সে অবশ পায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল! মনের ভেতরের তীব্র হাহাকার ঢাকতেই যেন রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ কড়া লিকারের চা বানিয়ে জানালার গ্রিল ধরে এসে বসল! বাইরে তখন চেনা শহরটা অচেনা মানুষের ভিড় নিয়ে আপন গতিতে চলছে!

​চিন্ময়ীর সাথে আমার দীর্ঘদিনের কোনো সখ্য বা পারিবারিক যোগাযোগ ছিল না। এই তো কিছুদিন আগের সামান্য পরিচয়! একই হোস্টেলের চারদেয়ালে, একই ছাদের নিচে থেকেও কেন যেন আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরব দূরত্ব কাজ করত। করিডোরে দেখা হলেও কেউ কারো সাথে আগ বাড়িয়ে একটা বাক্যও খরচ করতাম না। যে যার মতো নিজের কক্ষের অন্ধকারে বা ফোনের স্ক্রিনে নিমগ্ন হয়ে থাকতাম। আমরা দুজনেই ছিলাম যেন দুটি ভিন্ন কক্ষপথের বাসিন্দা, যারা একই গ্যালাক্সিতে বাস করেও কখনো একে অপরকে স্পর্শ করে না। কিন্তু আজ অন্ধকার নামতেই যেন সব চেনা হিসেব ওলটপালট হয়ে গেল! কেন সে এই চরম বিপদের মুহূর্তে আমাকে এতখানি আপন ভেবে বসল, কেনই বা তার মনে হলো এই চারদেয়ালে আমিই তার সবচেয়ে চেনা মানুষ—সেই জট পাকানো সম্পর্কের উত্তর আমার জানা নেই!

​হঠাৎ ঘরের কোণে কোনো আশ্রয় না পেয়ে, নিজের ভেতর ভাঙচুর হওয়া সামলাতে না পেরে চিন্ময়ী কেন যেন অঝোরে কাঁদতে লাগল। তার সেই কান্নার শব্দে ঘরের দেয়ালগুলোও যেন ভারী হয়ে উঠছিল! কোনো উপায় না পেয়ে, এক বুক অসহায়ত্ব নিয়ে সে আচমকা এসে আমার বুকে তার মুখটা লুকাল, আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল! তার এই আকস্মিক নিবিড় আলিঙ্গনে আমার মনে কোনো জাগতিক আনন্দ ছিল না, কোনো উল্লাস ছিল না; বরং আমার মনে হলো, চরম হতাশায় নিমজ্জিত একটা বড্ড অসহায় মানুষ ডুবতে ডুবতে বাঁচার শেষ তাগিদে কোনো এক খড়কুটো ভেবে আমায় আঁকড়ে ধরছে! তার এই শক্ত বাঁধন জানান দিচ্ছিল সে আসলে হেরে যেতে চায় না, সে এই নিষ্ঠুর সমাজ আর অবহেলার মুখে ছাই দিয়ে জীবনটাকে চালিয়ে নিতে চায়!

আমার বুকের কাপড়ে মুখ গুঁজে তার সেই অবাধ্য কান্নার মাঝেই সে একসময় মুখ তুলে ভাঙা গলায় আমায় শুধাল, "সৃষ্টিকর্তা কেমন ?"
​আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। এক মুহূর্ত নীরব থেকে বললাম, "সেটা আমি জানি না, চিন্ময়ী! কারণ আমি নিজেই এক গাঢ় জমাট বাঁধা অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি! খুঁজছি।  কিন্তু ছোটবেলা থেকে যে বিশ্বাসটাকে আমরা মনের গভীরে লালন করেছি, দিনশেষে সমস্ত যুক্তি আর অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সেই বিশ্বাসকে তো এক নিমেষে মন থেকে হারিয়ে দেওয়া যায় না! তাই তিনি আছেন, তাকে তো ভালবাসি। নাহলে আমিও যে নেই।"


​কান্না আর হাসি বড় সংক্রামক জিনিস! চিন্ময়ীর চোখের সেই অবাধ্য জলের ধারা আর কান্নার কম্পন আমার চোখেও যেন ল্যাক্রিমাল গ্রন্থির জল এনে দিল! নিজের চোখের কোণটা অলক্ষ্যে মুছে নিয়ে, আমি তখন বুকের ভেতর তাকে আরেকটু নিবিড়ভাবে টেনে নিলাম। তারপর কবীর সুমনের সেই চেনা, আশ্বস্ত করা সুরে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম, "চুপ কর বোকা মেয়ে, আর কাঁদিস না..."

এই নির্দিষ্ট মেয়াদের বিচ্ছেদ শেষে হয়তো সেই মানুষটা একদিন চেনা অধিকার নিয়ে ফিরে আসবে, অথবা ব্যস্ত শহরের ভিড়ে কোনোদিনও আর আসবে না! কিন্তু চিন্ময়ী ততক্ষণে আমার বুকের এই নিঃস্পৃহ ওমে আর শব্দের আশ্রয়ে বুঝে গেছে—কোনো মোহের পেছনে ছুটে নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেয়ে, নিজের সৃষ্টি, নিজস্ব সত্তা আর অক্ষরের মাঝে বেঁচে থাকা অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি মর্যাদার!

আপনার লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

মাধবী তাপসী’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস


লেখক সংক্ষেপ:


কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন