কবিতা          :         অন্ধকারের মজ্জাপত্র 
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২৬ জুলাই, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ২৬ জুলাই, ২০২৬ ইং


অন্ধকারের মজ্জাপত্র || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
অন্ধকারের মজ্জাপত্র || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ



অন্ধকারের মজ্জাপত্র || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


আমাকে আগুনে পোড়িও না; আগুন তো বহু আগেই তার নিজস্ব ভাষা হারিয়েছে। আমাকে সেই অদৃশ্য তাপে সমর্পণ করো, যে তাপ প্রথম নক্ষত্রের জন্মের আগে নিজের অস্থি চিবিয়ে আলো আবিষ্কার করেছিল। আমার বক্ষের ডালিমমঞ্জরীর ভেতর কালের মরচেধরা মুকুট গেঁথে দাও; প্রতিটি দানা থেকে রক্ত নয়, বরং মৃত শতাব্দীর ফসিল অঙ্কুরিত হোক। আমি দেখতে চাই— সময় কীভাবে নিজের শবদেহ কাঁধে নিয়ে কবরের চারপাশে অনাথ শিশুর মতো ঘুরে বেড়ায়।

ঈশ্বর, একবার তোমার পাঁজরের দীর্ঘ নীরবতা আমার বুকের গোপন গুহায় রেখে যাও। আমি বহুদিন ধরে মানুষের ভাষায় ক্লান্ত। মানুষের অভিধান কেবল জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে সামান্য ব্যাকরণ লিখতে পারে; অথচ আমার অস্থিমজ্জায় প্রতিদিন একটি নতুন মহাবিশ্ব বানান ভুল করে জন্ম নেয়। আমি সেই ভুলের সন্তান। আমি সেই অসমাপ্ত বাক্য, যার শেষ পূর্ণচ্ছেদটি কোনো কৃষ্ণগহ্বর গিলে ফেলেছে।

আযাজিল আজ আর বিদ্রোহী নয়; সে এক নির্বাসিত রাজমিস্ত্রি। সে ভেঙে পড়া স্বর্গের ইট কুড়িয়ে আমার করোটির ভেতর আরেকটি অসমাপ্ত আকাশ নির্মাণ করছে। তার ছিন্ন সিংহাসন এখন আমার মেরুদণ্ডে মরিচার মতো জন্মেছে। ফেরেশতারা আর ডানা মেলে না; তাদের পালকগুলো ঝরে পড়ে পুরোনো লাইব্রেরির বইয়ের ভাঁজে জমে থাকা ধুলোর মতো। প্রতিটি প্রার্থনা নিজের জিভ ছিঁড়ে ফেলে নীরবতার কাছে আশ্রয় চায়, আর প্রতিটি অভিশাপ শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরেরই অনাথ সন্তান হয়ে ফিরে আসে।

আমার রক্তে আর লোহিত কণিকা নেই; সেখানে ভেসে বেড়ায় নির্বাসিত ভাষার ভ্রূণ। তারা জন্ম নিতে চায়, কিন্তু প্রতিটি জন্মের আগে পৃথিবী তার ব্যাকরণ বদলে ফেলে। ফলে প্রতিটি শব্দ গর্ভপাত হয়ে পড়ে থাকে ইতিহাসের অন্ধকার নর্দমায়। আমি সেই নর্দমা থেকে মৃত বর্ণমালা কুড়িয়ে এনে নতুন ধর্ম লিখতে চাই— যে ধর্মে উপাসনালয় হবে মানুষের বুকের ভাঙা পাঁজর, আর উপাসনা হবে নিজের ছায়াকে চিনে ফেলার সাহস।

আমার দেহ কোনো দেহ নয়। এটি পরিত্যক্ত উপাসনালয়ের ফেটে যাওয়া স্তম্ভ; এখানে ঈশ্বর প্রবেশ করতে সংকোচ বোধ করেন, অথচ শয়তান প্রতিরাতে নিজের প্রতিবিম্বকে সিজদা করে। আমার পাঁজরের ফাঁকে ফাঁকে শেকড় গেড়ে বসেছে অনিদ্রা। সেখানে রাত্রি জন্ম দেয় অন্ধ সূর্যকে; সেই সূর্য আলো দেয় না, বরং মানুষের মুখোশগুলো ধীরে ধীরে গলিয়ে ফেলে।

আমি কালের কপাল থেকে খসে পড়া নক্ষত্র দাঁতে চিবিয়ে খাই। প্রতিটি আলোকবর্ষ আমার পাকস্থলীতে কালো ফুল হয়ে ফোটে। প্রতিটি গ্রহ আমার শিরায় রক্তের বদলে মরুভূমি ঢেলে দেয়। আমি হেঁটে গেলে পৃথিবীর মানচিত্রে নদী শুকিয়ে যায়, কারণ আমার পদচিহ্নে জল নয়, সময়ের ধুলো জমে থাকে।

আমার করোটিকে উল্টে তার ভেতর সূর্যগ্রহণের বীজ রোপণ করো। আমি এমন এক বৃক্ষ হতে চাই, যার শিকড় আকাশের দিকে নামে, আর ডালপালা নরকের ভেতর আলো খুঁজে বেড়ায়। আমার পাতাগুলো হবে পোড়া পাণ্ডুলিপি; প্রতিটি ঝরে পড়া পাতায় লেখা থাকবে— “মানুষ জন্মায় না, মানুষ কেবল নিজের অনুপস্থিতির দীর্ঘ ছায়া বহন করে।”

যেদিন সমস্ত ভাষা নিজেদের অর্থ ভুলে যাবে, সেদিন আমার বুকের ভেতর একটি অন্ধ সমুদ্র জেগে উঠবে। সেখানে ঢেউ নয়, ভাঙা আয়না আছড়ে পড়বে। প্রতিটি আয়নায় ঈশ্বর, আযাজিল, মানুষ এবং সময় একই মুখ পরে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ কাউকে চিনবে না; কারণ পরিচয়ও একদিন নিজের কবর খুঁড়ে তাতে শুয়ে পড়বে।

তখন পৃথিবী বুঝবে— ক্ষুধা কেবল রুটির নয়; ক্ষুধা কেবল শরীরেরও নয়। ক্ষুধা হলো সেই আদিম শূন্যতার, যে শূন্যতা নক্ষত্রকে পুড়িয়ে ছাই বানায়, ঈশ্বরকে নীরব করে, আযাজিলকে নির্বাসিত করে, মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করে— “তোমার মুখটি সত্যিই তোমার, নাকি কালের রেখে যাওয়া একটি ক্ষতচিহ্ন?”

আর আমি তখনও দাঁড়িয়ে থাকব, ভাঙা মহাবিশ্বের শেষ সিঁড়িতে, নিজের সমস্ত অস্থিকে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে, যেন প্রতিটি হাড় থেকে আরেকটি অসমাপ্ত মহাকাব্য জন্ম নেয়— যেখানে সৃষ্টি ও ধ্বংস একই মায়ের দুই অনাথ সন্তান, আর শূন্যতাই একমাত্র উত্তরাধিকার।

আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন