কবিতা          :         মেছতার অধিবিদ্যা কিংবা সভ্যতার স্তনলিপি 
কবি              :         তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ২৭ জুলাই, ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ২৭ জুলাই, ২০২৬ ইং




মেছতার অধিবিদ্যা কিংবা সভ্যতার স্তনলিপি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
মেছতার অধিবিদ্যা কিংবা সভ্যতার স্তনলিপি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


মেছতার অধিবিদ্যা কিংবা সভ্যতার স্তনলিপি || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ


এইসব ধুলো-ঝলমলে রাত্রি—যেখানে নক্ষত্রেরা মৃত কয়লাখনির ফুসফুস থেকে উঠে আসা কাশির মতো জ্বলে—সেখানে চোখ-টাটানো বেশ্যার থেঁতলানো স্তন দুটি এখনো কর্পোরেট বাবুদের পালিশ-করা বুকের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে; যেন বন্যাকবলিত জনপদের শেষ ক্ষুধার মুখে তুলে দেওয়া ত্রাণের শেষ প্যাকেট—যেখানে চালের দানার ভেতরও রাষ্ট্রের দাঁতের দাগ, আর করুণার ভেতর লুকিয়ে থাকে মুনাফার হিসাবরক্ষক।

সভ্যতা আসলে কোনো নগর নয়; সে এক অন্তহীন স্তনচোষা শিশুর কঙ্কাল, যে নিজের ক্ষুধাকে ঈশ্বর বলে ডাকে। শহুরে উদ্যোক্তার সবচেয়ে অবোধ ছেলেটি স্তন চুষতে চুষতে কেবল দুধ নয়, সময়ের জরায়ুও শুষে নেয়। অন্যদিকে তার নিজের ঘরে তিন মাসের কন্যাশিশু নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকে—যেন ভবিষ্যতের কসাইখানায় টাঙানো অনাগত মাংসের প্রথম ছায়া। বারো-তেরো বছর পর তারও স্তন হবে—এই সংবাদ যেন ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা কোনো মৃত্যুঘোষণা; বয়স এখানে শরীর নয়, বাজারে ওঠার পূর্বঘোষিত দরপত্র।

প্রকৃতি হয়তো সত্যিই ব্যাঙের ছাতার মতো স্তন গজিয়ে দেয়; কিন্তু বাজার তাদের ছাতা হতে দেয় না। প্রতিটি স্তনকে সে বানিয়ে ফেলে ক্ষুধার দ্বিতীয় চাঁদ, যেখানে জোয়ার ওঠে মুদ্রার লালায়। কত শহুরে বাবু চুইংগামের মতো চিবিয়ে গেছে অকালপাকা স্তন—যেন তারা রুটি নয়, ভোরের শিশির চিবোচ্ছে; যেন প্রতিটি কামড় ছিল একটি সভ্যতার দাঁত, প্রতিটি লালা ছিল শেয়ারবাজারের সূচক, প্রতিটি গিলন ছিল সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদের আত্মহত্যা।

আমি দেখি—কর্পোরেট ভবনগুলো আসলে বিশাল দুগ্ধদাঁত; সেগুলোর শিকড়ে আটকে আছে অসংখ্য নামহীন জরায়ুর হাড়। বোর্ডরুমগুলো দেখতে গির্জার মতো, অথচ সেখানে ঈশ্বর নয়, মুনাফা নিজের নাভি কেটে নিজেকেই জন্ম দেয়। টাইয়ের গিঁটে ঝুলে থাকে অনাথ শিশুর কান্না; ব্রিফকেসে বহন করা হয় বিধবার শিরদাঁড়া; আর লিফটের প্রতিটি ওঠানামা পৃথিবীর নৈতিকতার রক্তচাপ মাপে।

তারপর ধীরে ধীরে মেয়ে, মা, বোন—সব মুখের ওপর মেছতার মতো ছড়িয়ে পড়ে বেশ্যার ছাপ। সে কোনো নারীর পরিচয় নয়; সে সভ্যতার কপালে ওঠা মৃত সূর্যের ছাই। যেন আয়নার ভেতর দীর্ঘদিন আটকে থাকা অন্ধকার হঠাৎ ত্বকে ফুসকুড়ি হয়ে উঠেছে। যেন ভাষা নিজেই নিজের মুখে থুতু মেখে অভিধান থেকে নির্বাসিত হয়েছে।

রাষ্ট্র তখন মানচিত্র নয়; ছেঁড়া অন্তর্বাসের সেলাই, যেখানে সীমান্তগুলো কেবল ক্ষুধার সেলাইফোঁড়। ধর্ম এক ব্যবহৃত কনডমের ভাঁজে শুকিয়ে যাওয়া নক্ষত্রধূলি; নৈতিকতা হাসপাতালের ডাস্টবিনে ফেলে রাখা রক্তমাখা তুলো; আর ইতিহাস—কসাইয়ের হাত ধোয়া পানির মতো ঘোলা।

অবশেষে বুঝি, পৃথিবীর সমস্ত স্তনই কোনো শিশুর জন্য জন্মায় না; কিছু স্তন জন্ম নেয় সভ্যতার ক্যান্সার নির্ণয়ের এক্স-রে প্লেট হয়ে। সমস্ত ক্ষুধাই খাদ্যের নয়; কিছু ক্ষুধা মানুষের মুখ পরে মানুষেরই অস্থিমজ্জা খায়। আর সমস্ত মেছতাই চামড়ায় ওঠে না—কিছু মেছতা জন্ম নেয় ভাষার ভেতর, রাষ্ট্রের ভেতর, ঈশ্বরের ভেতর; তারপর ধীরে ধীরে পুরো মানবসভ্যতাকে এমনভাবে ঢেকে ফেলে, যেমন মৃত নক্ষত্রের ছাই ঢেকে ফেলে আলোকে।

শেষে কেবল ধুলো উড়ে। ধুলো নয়—অসংখ্য চিবিয়ে-ফেলা স্তনের গুঁড়ো, অসংখ্য অনাথ উপমার ভস্ম, অসংখ্য মৃত কন্যাশিশুর অনাগত আয়না। আর সেই আয়নায় পৃথিবী নিজের মুখ দেখে না; দেখে কেবল এক অন্তহীন মেছতা, যার নাম—সভ্যতা।

আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস




লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন