কবিতা : শূন্যের ব্যাংকে আমার হিসাব
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ৫ আগস্ট, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ৪ আগস্ট, ২০২৬ ইং
![]() |
| শূন্যের ব্যাংকে আমার হিসাব || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
শূন্যের ব্যাংকে আমার হিসাব || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
আমি দু'হাতে মানুষ গুনিনি—গুনেছি ভাঙা নক্ষত্রের খুচরো আলো। প্রতিটি মানুষ ছিল একটি অসমাপ্ত গ্রহণ, যার অন্ধকারকে আমি সূর্য ভেবে বুকে জমা রেখেছিলাম। আমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়েছে ঋতু, আর আমি তাকে মুদ্রা ভেবে কুড়িয়েছি।
নিজেকে এমনভাবে ভেঙেছি, যেন পাহাড় নিজের পাথর চূর্ণ করে নদীকে পথ উপহার দেয়। এমনভাবে ক্ষয় করেছি, যেন প্রদীপ নিজের শিখাকে খেয়ে আলো জন্মায়। এমনভাবে বিলিয়েছি, যেন বৃক্ষ শিকড় ছিঁড়ে ছায়াকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। শেষে দেখি—নদীর কোনো স্মৃতি নেই, প্রদীপের কোনো সকাল নেই, বৃক্ষের কোনো আকাশ নেই।
আমি বিশ্বাসের ব্যাংকার হতে চেয়েছিলাম। মানুষের নীরবতাকে ভল্টে রেখে সুদ হিসেবে একটু উষ্ণতা ফিরে পাব—এই নির্বোধ অর্থনীতি নিয়েই বেঁচেছিলাম। অথচ যে ব্যাংকের দরজায় সারাজীবন দাঁড়িয়ে ছিলাম, তার দেয়াল ছিল কুয়াশার, ভল্ট ছিল মরীচিকার, আর ক্যাশবক্সে জমা ছিল শুধু মৃত প্রতিধ্বনির হাড়।
তারপর একদিন দেখলাম—আমি কুয়োর ব্যাঙও নই। আমি সেই কুয়োর স্বপ্ন, যা কোনোদিন জল দেখেনি। আমি সেই বালতি, যার তলায় জন্মেছে আকাশের ছিদ্র। আমি সেই দড়ির গিঁট, যাকে কেউ আর টানে না। আমি সেই শ্যাওলা, যে নিজের সবুজকেই সমুদ্রের ইতিহাস ভেবে ভুল করে।
এখন বুঝি, মানুষ আসলে শরীর নয়—তারা সময়ের গায়ে জন্মানো সাময়িক ছত্রাক। ভালোবাসা কোনো ফুল নয়; মৃত গ্রহের ঠান্ডা আগ্নেয়গিরি, যেখানে আগুনের স্মৃতিই শুধু ধোঁয়া হয়ে ওঠে। বিশ্বাস কোনো সেতু নয়; দুটি অতলের মাঝখানে ঝুলে থাকা মাকড়সার সুতো, যা নিজের ওজনেই প্রতিদিন ছিঁড়ে যায়।
আজ আমার ভেতরে একটি ঘড়ি উল্টো দিকে হাঁটে। তার কাঁটা সময় মাপে না; ক্ষয় মাপে। তার টিকটিক শব্দে জন্ম নেয় কবর, আর প্রতিটি সেকেন্ড একটি নতুন সমাধিফলক হয়ে আমার ভেতরে দাঁড়িয়ে যায়।
আমি আর কাউকে গুনি না। কারণ সংখ্যা শেষ পর্যন্ত কঙ্কাল হয়ে যায়। নামগুলো শুকিয়ে গিয়ে লবণের স্তম্ভে পরিণত হয়। মুখগুলো বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া কালি—একবার মুছে গেলে আর কোনো অভিধান তাদের চিনতে পারে না।
এখন আমি নিজের ছায়াকেও ধার দিই না। কারণ ছায়াও একদিন আলোকে অস্বীকার করে। আমি শুধু শূন্যের ব্যাংকে প্রতিদিন নিজের বিলুপ্তি জমা রাখি। সেখানে সুদ বলে কিছু নেই—শুধু বিস্মৃতি আছে। আর বিস্মৃতিই এই মহাবিশ্বের একমাত্র বৈধ মুদ্রা।
আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।
.jpg)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন