![]() |
| The Feminine Hour : একাই সামলান রেলগেট |
ফাতেমা খাতুন একাই সামলান রেলগেট
মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী: সকালে ছাতা ও পতাকা হাতে সাব্দালপুর-লক্ষ্মীপুর সড়কের রেলগেটে চলে আসেন ফাতেমা খাতুন ওরফে সুমি। একটার পর একটা ট্রেন পার করেন। বাকি সময় গাছের নিচে অপেক্ষা করেন। এভাবে প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দিনে সব মিলিয়ে ১৩টি নির্ধারিত ট্রেন পার করতে হয় তাঁকে। এ ছাড়া অনির্ধারিত মালবাহী ট্রেন পার করতে হয় আরও চার থেকে পাঁচটি।
ঝিনাইদহ কোটচাঁদপুর উপজেলার সাব্দালপুর রেলস্টেশনসংলগ্ন ওই রেলগেটটি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তালিকাভুক্ত নয়। যে কারণে সেখানে নেই কোনো প্রতিবন্ধক ও গেটম্যানের দাঁড়ানোর ঘর। রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে সাড়ে তিন বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন এই নারী গেটম্যান। তাঁর যোগদানের পর থেকে ওই রেলগেটে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ফাতেমা খাতুন বলেন, এ রেলগেটে কোনো প্রতিবন্ধক নেই। মানুষজনকে আটকাতে অনুনয়ের সুরে কথা বলেন তিনি। তাঁরা কথা শোনেন। তাঁর বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে রেলগেটে যেতে ১০ মিনিটের মতো লাগে।
খাবার খেতে বা বিশেষ প্রয়োজনে বাড়ি গেলে সিগন্যাল পাওয়া মাত্র আবার ছুটে চলে আসেন। ঈদের দিনও দায়িত্ব পালন করতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, বাকি ট্রেনগুলো বন্ধ থাকলেও ঈদের দিন বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটি পার করতে হয়।
ফাতেমা খাতুন (৩২) সাব্দালপুর বাজারের ইদ্রিস আলীর মেয়ে। তাঁর স্বামী মনিরুল ইসলাম একজন বৈদ্যুতিকমিস্ত্রি। এই দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছে আর ছোট ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল খালেক বলেন, ‘মেয়েটি খুব ভালো। এটা তাঁর চাকরি হলেও ও যেভাবে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অক্লান্তভাবে কাজ করে, তা আমাদের মুগ্ধ করে। তা ছাড়া সুন্দর করে অনুরোধ করায় তাঁর কথা কেউ না রেখে পারে না।’ এই স্থানে একটি বসার জায়গা ও প্রতিবন্ধকের দাবি করে আবদুল খালেক বলেন, ফাতেমা একা সারা দিন দায়িত্ব পালন করেন, যা কষ্টকর। তাই আরেকজন গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের পাকশী অঞ্চলের এটিআই সাজেদুল ইসলাম বলেন, সাব্দালপুরের ওই স্থানটি বর্তমানে খুবই ব্যস্ত থাকে। আগে এতটা ব্যস্ত ছিল না বলে এটি তাঁদের অনুমোদিত গেট নয়। তাঁরা চেষ্টা করছেন অনুমোদন আদায়ের। তাহলে এসব সমস্যার সমাধান হবে।
অভাবের সংসারে পড়ালেখায় ছেদ পড়েছিল। সম্প্রতি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেছেন ফাতেমা খাতুন। বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন জানিয়ে পরিশ্রমী এই নারী বলেন, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল থেকে গেটম্যান নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তিনি আবেদন করে চাকরিটা পান। ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল রেলওয়ে গেটম্যান হিসেবে যোগ দেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ২৭৯ জন যোগদান করেন, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী রয়েছেন। প্রথমে কোটচাঁদপুর রেলস্টেশনে কাজ শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে সাব্দালপুর বাজারের পাশের এই গেটের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়।
ফাতেমা খাতুনের বাবা রেলওয়ের কর্মচারী ছিলেন। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারেননি। ১৫ বছর বয়সে বাবার ইচ্ছায় বিয়ে করেন। স্বামীর একার আয়ে সংসার চলছিল না। তা ছাড়া মাঝেমধ্যেই তাঁর কাজ থাকে না, তখন বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। এই কারণে চাকরিটা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফাতেমা খাতুন।
তিনি বলেন, সাব্দালপুর-আন্দুলবাড়িয়া সড়কের সাব্দালপুর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে একটি গেট রয়েছে। সেখানে দুজন গেটম্যান পালা করে দায়িত্ব পালন করেন। এই গেটে বসার জন্য ঘর ও যানবাহনের গতি রোধে ব্যারিকেড রয়েছে। তাঁর দায়িত্বে থাকা গেটটি বেশি ব্যস্ততম সড়কে অবস্থিত। প্রতি মুহূর্তে ছোট-বড় যানবাহন ট্রেনলাইন পার হয়। এরপরও এই গেটে কিছুই নেই। তিনি খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যারিকেড না থাকায় সারাক্ষণ ঝুঁকিতে থাকতে হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন