অবিসংবাদিত জননেতা বগা মিয়া: ইতিহাস যাকে ভুলতে পারে না
অবিসংবাদিত জননেতা বগা মিয়া: ইতিহাস যাকে ভুলতে পারে না


অবিসংবাদিত জননেতা বগা মিয়া: ইতিহাস যাকে ভুলতে পারে না


শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: ১৯৭১-এর রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধে যারা পাবনার মাটিতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের অগ্রভাগে যে নামটির কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়—তিনি হলেন সৈয়দ ফজলে এলাহী আব্দুর রব, যিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে পরম প্রিয় ‘বগা মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন।

আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো এই মহান নেতার অবদান সম্পর্কে বিশদ জানেন না। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তৎকালীন জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

🔹 শৈশব, সংগ্রাম ও রাজনীতিতে অভিষেক

১৯১৬ সালের ৩১ অক্টোবর রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুর রব বগা মিয়া। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তাঁর পরিবার স্থায়ীভাবে পাবনায় চলে আসে।

পাবনার রাজনৈতিক আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ভাষা আন্দোলনে রাজপথে লড়াইয়ের কারণে তাঁকে পাকিস্তান সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাবরণও করতে হয়।

পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ গঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। বাঙালির প্রতিটি স্বাধিকার আন্দোলনে পাবনার সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

🔹 ৭০-এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধে অমূল্য অবদান

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি তৎকালীন পাবনা সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (MPA) নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর যখন মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন, তখন পাবনায় গঠিত ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ' ও 'প্রতিরোধ কমিটি'র মূল চালিকাশক্তি ছিলেন বগা মিয়া। তাঁর নেতৃত্বে পাবনার সর্বস্তরের মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আমজাদ হোসেন মৃত্যুবরণ করলে বগা মিয়া জেলা সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে দিনরাত কাজ করে যান।

🔹 স্বাধীন বাংলাদেশে গণপরিষদ সদস্য

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গণপরিষদ সদস্য (MCA) হিসেবে নতুন বাংলাদেশ গঠনে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাবনাকে পুনর্গঠনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর স্ত্রী জাহানারা রব-ও স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

🔹 ১৯৭৩ সালের করুণ প্রয়াণ

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশজুড়ে চলছিল ব্যাপক গণসংযোগ।

১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাবনা এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার পথে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর ব্যবহৃত জিপ গাড়িটি উল্টে যায়। এতে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এই মহান বীর অকালে প্রাণ হারান। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। গুঞ্জন আছে, বগা মিয়ার মৃত্যু কোনো সাধারণ দুর্ঘটনায় হয়নি। এই দুর্ঘটনার পেছনে ছিলো দেশবিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামীর হাত। যদিও এই গুঞ্জনের কোনো প্রমানিত দলিল পাওয়া যায়নি।

বগা মিয়ার অকাল প্রয়াণের খবর পেয়ে নাটোরের উত্তরা গণভবন থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্তব্ধ ও শোকাহত হৃদয়ে পাবনায় ছুটে এসেছিলেন। প্রিয় সহযোদ্ধা ও বন্ধুকে হারিয়ে বঙ্গবন্ধু সেদিন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে বগা মিয়ার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তৎকালীন ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

রাজনীতিতে এমন নিঃস্বার্থ, কর্মঠ এবং আপসহীন জননেতা সচরাচর দেখা যায় না। পাবনা তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি দেশপ্রেমিক জননেতা আব্দুর রব বগা মিয়াকে। 

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন