![]() |
| Bangladesh Files : মাটির টানে, মুক্ত স্বদেশে: ১৯৭৩-এর নাগরিকত্ব বাতিলের এক ঐতিহাসিক শিক্ষা |
মাটির টানে, মুক্ত স্বদেশে: ১৯৭৩-এর নাগরিকত্ব বাতিলের এক ঐতিহাসিক শিক্ষা
শিমুল চৌধুরী ধ্রুব: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হলেও বিজয়ের সেই আনন্দঘন মুহূর্তে কিছু কালো মেঘ তখনও আকাশে ভর করে ছিল। ১৯৭১ সালে এদেশেরই কিছু কুসন্তান—যারা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটি গঠন করে মা-বোনের ইজ্জত ও বীর সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের আনুগত্য বজায় রাখতে চেয়েছিল—তারা যুদ্ধশেষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বা বিদেশে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। সেই ধারাবাহিকতায় নেমে আসে এক ঐতিহাসিক আইনি সিদ্ধান্ত—১৯৭৩ সালের ১৯ এপ্রিলের নাগরিকত্ব আদেশ।
📜 ঐতিহাসিক পটভূমি ও ১৯৭৩ সালের ১৯ এপ্রিল
১৯৭১ সালে গণহত্যার সহযোগী ও পাকিস্তানের দাসত্ব গ্রহণকারী চিহ্নিত দালালেরা বিদেশে অবস্থান করে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কূসাট চক্রান্ত ও দেশবিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত ছিল। এ অবস্থা রোধে এবং সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় ১৯৭২ সালে জারি করা হয় 'বাংলাদেশ নাগরিকত্ব (অস্থায়ী বিধান) আদেশ' (Bangladesh Citizenship Temporary Provisions Order, 1972)।
এই আইনের আওতায় ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিশেষ প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে এবং তা পরের দিন, ১৯ এপ্রিল, তৎকালীন জাতীয় দৈনিকগুলোতে (যেমন: দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক) প্রধান শিরোনাম হিসেবে ছাপা হয়।
প্রজ্ঞাপনে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়—নূরুল আমীন, হামিদুল হক চৌধুরী ও গোলাম আজমসহ ৩৯ জন চিহ্নিত রাজনৈতিক দালাল ও যুদ্ধাপরাধের সহযোগীকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অযোগ্য ঘোষণা করা হলো।
⚖️ আইনের শাসন ও স্বদেশের সার্বভৌমত্ব
এই সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার বিশ্ববাসীকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল—“যে মাটির প্রতি যার ন্যূনতম ভালোবাসা ও আনুগত্য নেই, সে মাটিতে নাগরিক হিসেবে বুক ফুলিয়ে হাঁটার অধিকারও তার নেই।”
এই সিদ্ধান্তের মূল গুরুত্ব ও প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:
নাগরিক অধিকার বাজেয়াপ্ত: এই ৩৯ জনের বাংলাদেশে প্রবেশ, রাজনৈতিক অধিকার চর্চা, ভোটদান এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ চিরতরে নিষিদ্ধ হয়।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ: তাঁদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আইনি পথ সুগম হয়।
দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা: বিদেশে বসে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং অপপ্রচার চালানো দালালচক্রের প্রতি এটি ছিল চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় ধিক্কার।
দেশপ্রেমের চেতনা ও আমাদের অঙ্গীকার
১৯৭৩ সালের ১৯ এপ্রিলের এই ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে কেবল একটি আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য প্রতীক। যে পতাকার পেছনে লুকিয়ে আছে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, সেই পতাকাকে অপমান করার অধিকার এই স্বাধীন ভূখণ্ডে কারো নেই।
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের একটাই শিক্ষা হওয়া উচিৎ—দেশপ্রেম কোনো সুযোগসন্ধানী অনুভূতি নয়, এটি এক পরম দায়িত্ব। রক্ত দিয়ে কেনা এই বাংলা কোনো সুযোগসন্ধানী ও দেশদ্রোহীর নয়; এই মাটি কেবল তাঁদেরই, যারা এ দেশকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে এবং এর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত।
📜 নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া সেই ৩৯ জন চিহ্নিত রাজনৈতিক দালাল ও যুদ্ধাপরাধী রাজাকারের তালিকা নিচে দেয়া হলো—
১/ নূরুল আমীন – (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ শান্তিকমিটি নেতা)
২/ গোলাম আযম – (আমীরে জামায়াতে ইসলামী, পূর্ব পাকিস্তান)
৩/ হামিদুল হক চৌধুরী – (সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রবীণ রাজনীতিক, পাকিস্তানপন্থী 'ডেইলি পাসবান' সম্পাদক, প্রাক্তন পাকিস্তান অবর্জার্ভাবের প্রতিষ্ঠাতা, পিতা - আকু আলী চৌধুরী, ফেনী, নোয়াখালী ।)
৪/ খাজা খয়েরউদ্দিন – (কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ও কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির আহবায়ক)
৫/ মাহমুদ আলী – (পিডিপি নেতা ও একাত্তরে পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান গ্রহণকারী)
৬/ খান এ সবুর (আবদুস সবুর খান) – (মুসলিম লীগ নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় যোগাযোগ মন্ত্রী)
৭/ এ. টি. সালাহউদ্দিন
৮/পীর মোহসেন উদ্দীন (দুদু মিয়া) – (নেজামে ইসলাম পার্টি নেতা)
৯/ শফিকুল ইসলাম
১০/ মাওলানা ইউসুফ – (রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ও মুসলিম লীগ/জামায়াত নেতা)
১১/ নিয়াজ ফাতেহ
১২/ আব্দুল মতিন
১৩/ আব্বাস আলী খান – (পাক আমলের শিক্ষামন্ত্রী ও জামায়াত নেতা)
১৪/ এ. কে. এম. ইউসুফ
১৫/ হুমায়ুন খাঁন পন্নি (পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের প্রথম মেয়াদের ডেপুটি স্পিকার )
১৬/ কাজী কাদের (রংপুর)
১৭/ ইকবাল ইদ্রিস (চট্রগ্রাম)
১৮/ রাঙ্গা মাটির রাজা ত্রিদিপ রায় চাকমা ।
১৯/ অধ্যাপক আব্দুল খালেক (টাঙ্গাইল )
২০/ অধ্যাপক হারুনার রশিদ মোল্যা (খুলনা)
২১/ অধ্যাপক এম এ হক (কুমিল্লা )
২২/ এস এ শুক্কুর (কুমিল্লা )
২৩/ মওলানা আশরাফ আলি (কুমিল্লা )
২৪/ একিউএম শফিকুর রহমান (কুমিল্লা )
২৫/ মওলানা আব্দুর রহিম ( বরিশাল-৭৯ আইডিএল এর এমপি )
২৬/ মওলানা তমিজউদ্দিন আহমদ (বরিশাল )
২৭/ এ্যাডভোকেট জুলমত আলি খান (ময়ময়নসিংহ )
২৮/ হামিদুল হক চৌধুরী (ফেনী)
২৯/ এটি সাদী (বগুড়া - জিয়ার মন্ত্রী )
৩০/ আব্দুল জব্বার খদ্দর (নোয়াখালী )
৩১/ শফিউল্লাহ বিএইচ বিটি (নোয়াখালী )
৩২/ মহিউদ্দিন চৌধুরী (নোয়াখালী )
৩৩/ সায়েদুল হক (নোয়াখালী )
৩৪/ নুরুল আমিন (কিশোরগন্জ-পাকিস্হানের যুদ্ধ কালিন প্রধান মন্ত্রী )
৩৫/ অধ্যাপক ইউছুফ আলী (কিশোরগন্জ)
৩৬/ মাহমুদ আলী (কিশোরগন্জ)
৩৭/ মিসেস সৈয়েদা ফাতেমা সাদেক ( কিশোরগন্জ বিএনপির সাবেক এমপি)
৩৮/ মিসেস শামীম হুসাইন (কিশোরগন্জ)
৩৯/ আবু তাহের আবদুল্লাহ (কিশোরগন্জ)
বি.দ্র. তালিকায় কিছু তথ্য এলোমেলো থাকতে পারে। কারো কাছে সঠিক তথ্য থাকলে কমেন্টে অথবা আমাদের মেইলে দিয়ে সাহায্য করবেন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন