উপন্যাস : শরম
লেখিকা : তসলিমা নাসরিন
গ্রন্থ : শরম
প্রকাশকাল :
জনপ্রিয় লেখিকা তসলিমা নাসরিনের বহুল আলোচিত উপন্যাস 'লজ্জা'। ১৯৯৩ সালে এটি বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশের প্রথম ছয় মাসেই বইটি পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি বৈধ কপি বিক্রি হয়। এরপর ধর্মীয় মৌলিবাদিদের একতরফা বিতর্কের মুখে উপন্যাসটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তৎকালিন বাংলাদেশ সরকার। পরবর্তীতে 'লজ্জা' উপন্যাসটি বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি লেখার কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছিল লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে।পরবর্তীতে 'লজ্জা' উপন্যাসের নায়কের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দেখা হয়েছিলো লেখিকা তসলিমা নাসরিনের। সেই অনুভূতিকে পুজি করে তিনি লিখলেন নতুন উপন্যাস 'শরম'। এ উপন্যাসটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।
![]() |
| শরম || তসলিমা নাসরিন |
২৬ তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
শরম || তসলিমা নাসরিন (পর্ব - ২৭)
অনেক দিন ওদের কারও খবর নেই। জাননগরের বাড়িতে দুদিন গিয়ে ফিরে এসেছি। আসলেও হন্যে হয়ে খুঁজছি আমি। সুরঞ্জন ফোন ধরে না। এ সময় জুলেখার ফোন পাই আমি। ওর নম্বরটি অচেনা নম্বর। সাধারণত অচেনা ফোন আমি ধরি না। মাঝে মাঝে ওসব এত মনেও থাকে না যে অচেনা নম্বর আমার ধরা উচিত নয়।
জুলেখা একবার দেখা করতে চাইছে। হঠাৎ দেখা কেন, অনুমানও করতে পারি না। সুরঞ্জনের কথা জিজ্ঞেস করলে জুলেখা জানায় যে সে ভালো আছে। দিব্যি আছে।
— দিব্যি আছে?
— হ্যাঁ, দিব্যি আছে।
দিব্যি আছে বলায় জুলেখার কিছুটা অভিমান কিছুটা রাগ উপচে পড়ে। শান্ত কণ্ঠ আমার। রাগ অভিমানের কিছু নেই কেবলই কৌতূহল।
— ফোন ধরছে না কেন?
— ধরছে না, কারণ ফোন ফেলে দিয়েছে।
— ফেলে দিয়েছে? কোথায়?
— কোথায় আবার, বালিগঞ্জের লেকে।
— লেকে? লেকের জলে।
বিড়বিড় করে বলতে থাকি। জুলেখা বলে যেতে থাকে তার নিজের কথা। তার এম এ, তার বিএড। তার ঘরের মেয়ে ময়ূর। ময়ূরের দিনলিপি। হোস্টেলের প্রতিদিনকার তেতো-মিঠে অভিজ্ঞতা। আমার হঠাৎ প্রশ্ন, কিরণময়ী, সুরঞ্জনের মা ভালো আছেন?
— আছেন।
— মায়ার খবর কিছু জানো?
— না। তবে ভালোই আছে। ওরা একসঙ্গে থাকছে এখন।
একসঙ্গে থাকছে। এর গল্প অনেক। এত গল্প ফোনে হয় না। জুলেখা বলে সে আসবে একদিন আমার কাছে। সামনে বসেই বলবে সব।
সুরঞ্জনের সঙ্গে একটু কথা বলার দরকার ছিল বলাতে জুলেখাই আমাকে সুরঞ্জনের নতুন বেগবাগানের বাড়ির ঠিকানা দেয়। এবং আবারও বলে দেয় যে দেখা করতে সে এর মধ্যে একদিন আমার বাড়িতে আসবেই। তাকে কোনও একটা বিকেল বলে দিই আসার জন্য।
যে ছেলে এত দিন আমার খোঁজ নেয়নি, তাকে কেন খামোখা খুঁজতে যাবো আমি! তার চেয়ে কোনও একদিন কিরণময়ীর সঙ্গে দেখা হলে ভালো। ওঁর মধ্যে একটা কী যেন আছে, একটা মা মা। ওই মা মা ব্যাপারটা চুম্বকের মতো।
জুলেখা যেদিন এলো সেদিন রোববার। সন্ধ্যে হয় হয় করছে। বারান্দার বাগানে দুজন বসলাম। জুলেখা আগের দিনের চেয়ে অন্য রকম। খুব বিনীতভাবেই বললো, আপনার সময় নষ্ট করা আমার উচিত হচ্ছে না।
আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট, ওকে 'তুমি' বলেই ডাকি আজ। কী খাবে বলো? চা?
- যদি ব্লাডি মেরি হয়, ভালো হয়।
একটু চমকিত হই। মদখোরের সঙ্গে থেকে এই ব্যাপারটা হয়েছে জুলেখার, মদ খাওয়া শিখেছে। অ্যাবসোলুট ছিল, ওর মধ্যে লেবু আর লঙ্কা দিয়ে আমার এক বন্ধু বলেছিল, খেতে ভালো।
— ব্লাডি মেরি নেই। এটাই গ্লেসড হবে।
— আপনি কিছু খাবেন না?
— আমি চা খাবো।
— আপনিও নিন এ রকম একটা গ্লাস। চা তো খাচ্ছেনই। ভদকা যখন আছে ঘরে, একটা নিন সঙ্গে। একা একা খেতে ভালো লাগে না।
— আমি হুইস্কি ভদকা এসব বিদেশ থেকে আসার সময় সব বন্ধুর জন্য নিয়ে আসি। কলকাতায় তো সবাই মনে হয় ড্রিংক করে। তোমার তো নিশ্চয়ই সুরঞ্জনকে ভালোই দেখা হয়েছে।
— সবাই ড্রিংক করে না। সোবহান ড্রিংক করে না।
আমি উঠে নিজের জন্য শেষ অবধি গ্লাসে ভদকা নিই। খুব প্রিয় কোনও বন্ধু হলে, খুব ভালো আড্ডা হলে, খুব ভালো খাবার থাকলে, খুব ভালো রেড ওয়াইন থাকলে তবেই আমি পান করি কিছু, নয়তো নয়। এ কথা তো জুলেখাকে বোঝানো যাবে না। সে যে আমার প্রিয় কোনও বন্ধু নয়, খুব ভালো আড্ডা দিতে যে আমরা বসছি না, সে কথাও তো বলা শোভন হবে না। অতএব অল্প ভদকায় বেশি ঠান্ডা জল মিশিয়ে ফুরফুরে হাওয়ায় এসে বসি। একখানা চুমুক দিই। জুলেখার তখন বেশ কটি চুমুক হয়ে গেছে।
— বলো, আছো কেমন?
— ভালো।
— হঠাৎ আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কেন?
- খুব বড় যে কোনও কারণ আছে, তা নয়। অনেকদিন থেকে খুব মন চাইছিল। আমার মনে হচ্ছিল, এ মুহূর্তে কিসের মধ্য দিয়ে আমি যাচ্ছি, তা বোধহয় আপনি বুঝবেন।
— বলো তো।
— সুরঞ্জন আমার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে চায় না।
- কেন?
জুলেখা থেমে থাকে। গ্লাসটি নাড়তে থাকে। দুজনে দুটো বেতের চেয়ারে। ঠিক মুখোমুখি না। সামনে আকাশের দিকে তাকানো দুচোখ। দল বেঁধে পাখিরা নীড়ে ফিরছে। পাখি থেকে আমার চোখ সরে না। এত পাখি, নীড় কি সবার এক!
— সুরঞ্জনের সঙ্গে কেন সম্পর্কটা নষ্ট হবে! কারণ কী?
— কারণ সে নিজে জানে। আমার দিক থেকে কিছুই না। সম্পূর্ণ ওর সিদ্ধান্ত।
- হঠাৎ এমন একটা সিদ্ধান্ত? ও তো বলল, সেদিনই বলল, রিশপ থেকে ফেরার দিন, বলল, তোমাকে নিয়ে সে একসঙ্গে থাকতে চায়।
— হ্যাঁ, বিয়ে করার কথা তো ও নিজেই বলেছিল। আসলে ব্যাপারটা তো একজনের ছিল না। দুজনের ব্যাপার। দুজনই আমরা চেয়েছি।
— তারপর?
— তারপর সে হঠাৎ অফ হয়ে গেল। আমার সঙ্গে আর দেখা করল না, যোগাযোগ করল না। ফোন নম্বরও তখন পাল্টে ফেলেছিল। ফোন তো সে পারতপক্ষে ব্যবহারই করতে চায় না। বলল তার মাকে নাকি দিয়ে দিয়েছে। সবকিছুই খুব স্ট্রেঞ্জ।
— তা, এসব আমাকে বলছো কেন? আমি কী করতে পারি তোমার জন্য?
— আপনি কিছুই করতে পারেন না। ও আমার পেছনে একটা ছেলেকে লেলিয়ে দিতে চাইছে। বলছে ছেলেটা মুসলমান, সুতরাং আমি যেন বিয়ে করি।
এবার বিশাল চমক আমার জন্য। হঠাৎ রকিং চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে ভদকা পড়ে গেল অনেকটা। সে পড়ে যাওয়ায মন নেই, মন জুলেখার কথায়।
— আমি ভাবছি, মুসলমান ছেলের সঙ্গে প্রেম করবো আমি, ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে। রিলিজিয়াস বলতে যা বোঝায়, তা আমি কোনও দিনই না। ভেবেছিলাম ও-ও না। কোনও দিন পুজো-আর্চা করেনি। কোনও দিন দেখিনি ঠাকুর দেখে নমস্কার করতে। ওসব বলেইনি কোনও দিন, বরং মায়ার খুব নিন্দা করতো, মায়া মন্দির আর হাবিজাবি সব বাবা নিয়ে থাকে বলে। কিন্তু এত ভীরু ও, এত সংকীর্ণ মন ওর! ভাবলে কষ্ট হয়।
— তুমি ভেতরে রাগ পুষে রাখছো। ঠান্ডা মাথায় হয়তো অন্য রকম করে ভাববে।
— অত ঠান্ডা হয়েই বা সব জিনিস করতে হবে কেন? চাইছে যখন প্রেম করি, করবো।
— তোমার কি সব সময় প্রেম করতেই হয় জুলেখা? একজন চলে গেলে আরেকজন কি তৎক্ষণাৎ তোমার দরকার হয়?
জুলেখা একটু অপ্রস্তুত হয়। কী বলবে ঠিক বুঝতে না পেরে মাথা নেড়ে বলে, না।
— তাহলে এক্ষুণি তোমার কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। আরও সময় নাও চিন্তা করার, আরও ভাবো।
জুলেখা হাসে। হাসতে হাসতে বলে, —বেশি ভাবলে গণ্ডগোল হয়ে যায়। জীবনের সব ভালো সিদ্ধান্তগুলো আমি হুট করে নিয়েছি।
— কী রকম শুনি? কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ সিদ্ধান্ত তোমার মতে?
— বিয়ে করার ব্যাপারটা অনেক ভেবেছিলাম, ওটা খারাপ সিদ্ধান্ত। সুরঞ্জনের সঙ্গে সম্পর্কে যাবো কিনা এ নিয়ে ভেবেছিলাম বেশি। অবভিয়াসলি ভুল সিদ্ধান্ত। ভালো সিদ্ধান্তের মধ্যে আছে চাকরি নেওয়া, হোস্টেলে ওঠা, কলেজে পড়া। এগুলো হুট করেই নেওয়া।
— খুব ডিসিপ্লিন্ড তুমি জুলেখা। সুরঞ্জন বোধহয় একেবারে উল্টো?
— বাইরে থেকে মনে হয়। আসলে ভেতরে সে আমার চেয়ে অনেক বেশি ডিসিপ্লিন্ড।
— বলো কী? অবশ্য তুমি আমার চেয়ে বেশি মিশেছো, জানো বেশি।
— আপনি ওর ক্যারেক্টার নিয়ে যা লিখেছেন 'লজ্জা'য়, ঠিক ও রকম না ও। পলিটিক্স নিয়ে আপনি লিখেছেন— ও খুব মেতে থাকে। আমার কিন্তু তা মনে হয় না।
— এখন হয়তো না। তখন ছিল। যে সময়কার কথা লিখেছি।
— আসলে ওর সঙ্গে পুরো ব্যাপারটাই আমার অ্যাকসিডেন্ট ছিল। ওর জন্য আমার ফিলিংস আছে। থাকবে না কেন? কিন্তু সেটা টিকিয়ে রাখার আমি কোনও কারণ দেখি না।
— হট করে কি কাউকে ভুলে যাওয়া যায়? মন তো হু হু করবেই।
জুলেখাকে আরও ভদকা দিতে হয়। দিতে দিতে বলি,— তুমি কিন্তু আবার ওর মতো হয়ে উঠো না। মদ আর খেও না।
— না বুনু, সুরঞ্জনের মতো হবো না। প্রমিজ।
— সুরঞ্জনের কোনো ভালো দিক নেই?
জুলেখার আবদার সোবহানের সঙ্গে দেখা করবে সে, করবে আমার বাড়িতে। বলে দিই, তাকে আমি চিনি না, জানি না, কী করে ডাকবো আমি তাকে!
সে পরম উৎসাহে বলল, আজই।
আমার একটু অবাক লাগে। জুলেখার কথাবার্তা-আচরণ খুব রহস্যময়। আমার বাড়িতে বসেই আমার কোনও অনুমতি না নিয়ে সে সোবহানকে ফোনে অনুরোধ করতে থাকে চলে আসার জন্য। ঠিকানা দিতে থাকে আমার বাড়ির। আমার ভীষণ রাগ হতে থাকে। এ উটকো ঝামেলাকে বেশ তো বসতে দেওয়া গেল। এদিকে প্রচুর লেখালেখির কাজ আমার। বাড়িতে প্রায় বছর হলো, আড্ডা বন্ধ করে দিয়েছি। ফালতু আড্ডায় সময় নষ্ট করার চেয়ে কোনও একটা বই পড়া বা একা বসে ভাবা অনেক ভালো। অথবা মিনুকে একটুও সময় দিতে পারি না খেলায়। ফুটবল সামনে নিয়ে বড় করুণ মুখে ও চেয়ে থাকে আমার দিকে। আজকাল এমন হয়েছে ও একা একদম খেলতে চায় না। দুজন না খেললে সে খেলবে না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এত জোরে জোরে ও 'সোবহান প্লিজ, সোবহান প্লিজ' করতে থাকে যে পুরো ব্যাপারটা বড় বিচ্ছিরি দেখতে লাগে। এসব দেখে আমি আর বসে থাকতে না পেরে বলে দিই,
— শোনো, জোর করে এখানে কাউকে ডেকে এনো না তো! আর, আমি তাকে চিনি না, এখানে ডাকছো কেন? বরং...
— বরং কী?
— বরং তোমরা অন্য কোথাও দেখা করো। আমার নিজের অনেক লেখাপড়া আছে। খামোখা এখানে ভিড় করার দরকার নেই। আর কাকে ডাকছো? কে সে?
— আমার বন্ধু।
— তোমার বন্ধু? ভ্রূকুঞ্চনে সংশয় আমার।
— হ্যাঁ।
— নাকি ও সুরঞ্জনের বন্ধু। ওই যে বলছিলে একটা ছেলেকেও লেলিয়ে দিতে চাইছে। আসলে তো তুমিই চাইছো নিজেকে লেলিয়ে দিতে।
জুলেখা মাথা নামিয়ে বলে, আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন।
— ঠিকটা কী বুঝবো বলো। একটা লোক আসতে চাইছে না, তাকে তুমি বারবার করে অনুরোধ করছো? সুরঞ্জন জানে এসব?
— ও চায় এসব।
— তুমিও তো চাও মনে হয়।
— আমি?
— তুমি কি বলতে চাও তুমি চাও না?
জুলেখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি কিন্তু আপনাকে পুরুষবিদ্বেষী হিসেবে ভাবি না, লোকে যাই বলুক।
খুব চালাকের মতো নাকি খুব বুদ্ধিমানের মতো উত্তর এটি, ভাবি। জুলেখাকে খুব অভদ্র অবাচীন মেয়ে বলে মনে হয়। খুব তাড়াহুড়ো করে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করছে যেন। শাড়িটাও কেমন কাটক্যাটে গোলাপি। কানে লম্বা দুল পরেছে। বড় একটা টিপ পরেছে কপালে। আমার অনেকবার ইচ্ছে করে, বলি, টিপটা খুলে রাখো, দুলগুলোও খুলে রাখো। কিন্তু বলি না। বলি না এই কারণে, তার যদি পছন্দ হয় ওসব পরতে, আমি বাধা দেওয়ার কে! বাধা না দিয়েও তো নিজের মত প্রকাশ করতেই বলি— তুমি তো খুব সাজো।
— সাজি?
— হ্যাঁ সাজো। আচ্ছা একটা কথা বললে তুমি আবার রিপিট করো খেয়াল করেছো?
— তাই!
— হ্যাঁ, তাই। অনেকটা সুরঞ্জনের মতো।
— করে নাকি? খেয়াল করিনি।
— করে।
— করে!
হঠাৎ জুলেখা উঠে বললো, একটু বাথরুম যাবো। বলে গটগট করে হেঁটে যায় আমার স্টাডির দিকে। অচেনা লোকের ড্রইংরুম পর্যন্ত অ্যাকসেস। ভেতরে এভাবে ঢোকাটা আমার অপছন্দ। অভদ্রতা বলে মনে হয়। বাথরুম আমি নিজে দেখিয়ে দিতে পারতাম। বাড়িতে তিনটে বাথরুম। আমার ব্যক্তিগতটিতে অতিথির আনাগোনা নিষিদ্ধ। তাছাড়া অতিথিদের ঢোকাতে গিয়ে দেখেছি আমার একটাও শ্যানেল ফাইভ অবশিষ্ট নেই। আপন বলে যাদের আমি মনে করি, তারাই আমাকে না বলে আমার শ্যানেলকে আপন ভেবে পকেটে বা থোলায় ঢুকিয়ে ফেলে। দু-একজন মন্দ লোক এই কাজ করে, সন্দেহ জাগে সবার ওপর। তাই আমি চাই না ও ঘরে কেউ যাক। আমার শ্যানেলের জন্য নয়, মনটাকে আমার সংশয়মুক্ত করার জন্য।
জুলেখা বসে বসে মায়ার নিন্দা প্রাণভরে করতে থাকে। মায়ার কারণে সুরঞ্জন বউ ছেড়েছে। মায়ার কারণে জুলেখাকেও ছাড়লো। এই দজ্জাল বোন যত দিন আছে, তত দিন সুরঞ্জন শান্তি পাবে না। জুলেখার কথার ধরন আমার পছন্দ হয় না। ওর সঙ্গে সুরঞ্জনের সম্পর্ক আমি কোনও দিনই খুব উদার মনে নিতে পারিনি। আমার সব সময়ই মনে হয়েছে, এই সম্পর্কটা যেটার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা খুব শক্তিশালী কিছু নয়। যদিও দুজনের কেউই আমাকে বলেনি, কী সেই ভিত্তি। অনুমান করে নিতে আমি বরাবরই খুব পারি। কিন্তু অনুমানের জন্য যে আগ্রহটা দরকার, সেটা, সত্যি বলতে, নেই আমার। জুলেখাকে আমি একবার বলিও - শোনো পুরোনো সম্পর্ক শেষ হয়, নতুন শুরু হয়। তাই বলে তোমার নিন্দা করতে হবে একজনকে। তা কেন?
— কারণ কি জানেন? আমি আপনার মতো উদার হতে পারি না।
— এর মধ্যে উদারতার কিছু নেই। জাস্ট চরিত্র। এক-একজনের চরিত্র একেক রকম।
— আপনি নিশ্চয়ই বলতে চাইছেন আমার চরিত্রে অন্যের নিন্দা আছে।
জুলেখা কি সুরঞ্জনের বদনাম করার উদ্দেশ্যে আমার কাছে এলো! আর, হোস্টেলে থাকা মেয়ে যেহেতু কোনও বাড়িঘর পাচ্ছে না প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করার, তাই আমার বাড়িই ভরসা। আর কী থাকতে পারে কারণ! সুরঞ্জনের জন্য আমার মায়া হতে থাকে। নিশ্চয়ই এমন সব কাণ্ড জুলেখা করেছে যে, তার পক্ষে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
মানুষ যখন ভীষণ রকম রাজনৈতিক-সামাজিক-পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে কাটায় তখন বোধহয় ভালোবাসা-প্রেম খুব তুচ্ছ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। নাকি উল্টো?
বাথরুম থেকে বেরিয়ে সে বলে, আরও খাবে সে ভদকা। আমার ইচ্ছে করে 'না' বলে দিতে। ইচ্ছে করে জুলেখার মতো অভদ্র অসভ্যকে বের করে দিই বাড়ি থেকে। বলি— তোমার নতুন প্রেমিক নিয়ে অন্য কোথাও যাও। আমার বাড়ি কোনও পাবলিক মিটিং প্রেস নয়। বলতে পারি না, কিন্তু আমার আচরণে এক নির্লিপ্ত পেঁচার মতো বসে থাকে।
এক সুদর্শন পুরুষ এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে। সোবহান। জুলেখাকে চায়। সোবহানকে সম্ভাষণ জানিয়ে বাইরের ঘরে ওদের কথা বলার সুযোগ দিয়ে ভেতরে স্টাডিতে চলে যাই। সুজাতা ওদের চা-বিস্কুট দেয়। কিছুক্ষণ পর জুলেখা সোজা ঢুকে পড়ে স্টাডিতে।
— আপনি আসুন দিদি, ওর সঙ্গে ভালো করে পরিচয়টাই তো হলো না।
— তোমাদের নিশ্চয়ই কোনও কথা আছে, সেটা সারো।
— কী আর কথা? কথা তো ফোনেও হতে পারে। অনেক দূর থেকে এসেছে আপনার বাড়িতে। যদি কিছু না বলেন, মানুষটা কী ভাববে বলুন তো! এত নামিদামি আপনি। এ রকম ব্যবহার কি আপনার শোভা পায়?
— আশ্চর্য তো! কী ব্যবহার করলাম? তুমি ওর সঙ্গে একা কাটাতে চাইছো বলে আমি চলে এলাম। আর এখন ব্যবহারের দোষ।
— আপনি আমাকে একটুও পছন্দ করেন না। অথচ...
— অথচ কী?
— অথচ আপনাকে এত ভালোবাসি।
জুলেখা আমার একটা হাত টেনে তার হাতে নেয়। জুলেখাকে মোটেও অকৃত্রিম মনে হয় না।
মুখোমুখি বসি দুজনের। আমার বাড়িতে মুসলমানের আসা-যাওয়া অবাধ নয়। কার মনে কী আছে, বলা যায় না। পুলিশ দুটো বসে আছে, আর অচেনা এক মুসলমান দিব্যি ঢুকে গেল। কী কাণ্ড, বাড়িতে কে আসবে না আসবে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করারও কি অধিকার আমার হঠাৎ হারিয়ে গেল? অসহায় বোধ করি। জুলেখাকে কতটুকু চিনি যে লোক ডাকছে বাড়িতে?
— সোবহানের মতো মানুষ হয় না বুনু।
— কী করে বুঝলে? ওকে কবার দেখেছো তুমি?
— দুবার। বলে সোবহানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো সে। হাসিটা প্রশ্রয়ের নাকি সৌজন্যের হাসি, ভাবি।
সোবহান বললো, সুরঞ্জনের কাছে আপনার কথা শুনেছি।
— সুরঞ্জন আছে কেমন?
— বেশ আছে।
— কী করছে?
— যথারীতি টিউশনি। ভালোও বাসে এটা করতে। ওর স্টুডেন্টদের যা দেখলাম, খুব ফ্যান ওর। সেদিন ওর বাড়িতে দেখলাম, দুটো মেয়ে এসেছে পড়তে। সিক্স বা সেভেনে পড়ে। ওদের সঙ্গে নিয়ে দাবা খেলছে।
— খুব মুডি বোধহয়? আমার সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয় না।
— আপনার কথা সেদিন বলছিল। পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্টুরেন্টে খাচ্ছিলাম, অনেকক্ষণ বললো আপনার কথা...
- কী বললো?
— বললো আপনি খুব ভালো। খুব উদার। আপনার কাছে আসবে বললো।
সোবহানের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝি সে বানিয়ে বলছে।
ক্লিন শেভড, ক্লিন ম্যান চা খেতে খেতে বললো,— আজকাল তো আবার ওর জলের নেশা হয়েছে। প্রায়ই বিকেলের দিকে লেকের ধারে যায়।
— জগিং করছে নাকি? আমি জিজ্ঞেস করি।
সোবহান বলে, জগিং করার অভ্যেস ওর নেই। অভ্যেস নতুন করে তৈরিও করবে না।
আমার মন লেকের ধারে। ওখানে কী করতে যায় সুরঞ্জন?
— আচ্ছা, ওর বাবা কী করে মারা গেছে? হঠাৎ প্রশ্ন করি।
দুজনের উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা ছুড়ে দিই। সোবহান বললো,— শুনেছিলাম শংকর ঘোষ নামের একটা লোক, ওদের আত্মীয়, ওকে ধাক্কা দিয়ে লেকে ফেলে দেয়।
— কারণ কী?
- প্রচুর নাকি দেনা হয়ে গিয়েছিল।
জুলেখা বললো— আমার মনে হয় কারণটা ভিন্ন। আসলে এই খবরটা ওরা খুব সিক্রেট রাখতে চায়। কিন্তু যতদূর জানি ওদের বাড়ির কাছের একটা লেকের জলে, সেদিন অমাবস্যা ছিল, আত্মহত্যা করেছেন। মায়াকে নিয়ে বোধহয় কিছু হয়েছিল।
— কী হয়েছিল? আমি উত্তেজিত।
— সুরঞ্জন বলছিল, মনে হয় এ রকমই যে, মায়ার কারণে আমাদের সবাইকে ভুগতে হয়েছে অনেক। দেশ ছাড়তে হলো, নিজের বাবাকে হারাতে হলো।
জুলেখার এই স্মৃতিচারণ আমাকে গভীর মগ্নতা দেয়। আমি যে রকমভাবে সুধাময়ের মৃত্যুকে নিয়ে চিন্তিত, লক্ষ্য করি অন্য কেউ নয়। ওদের কাছে যে কোনও মৃত্যুসংবাদের মতো এটাও একটা মৃত্যু সংবাদ। সুধাময়কে ওরা তো কেউ চেনে না। তার স্বপ্নের খবরাখবর কেউ রাখেনি। তার কষ্টগুলো কেউ রোদে মেলে দিয়ে দেখেনি। নেপথালিনের ঘ্রাণে ডোবানো তার শৈশব-কৈশোরকে ছুঁয়ে দেখার যারা ছিল, তারা কেউ নেই।
- সোবহান কি বিবাহিত? জুলেখা একটু ঘনিষ্ঠ হয়েই বসেছিল। প্রশ্ন শুনে ছিটকে সরে যাওয়ার মতো শরীর না হলেও মন হয়।
সোবহান মাথা নাড়ে, - হ্যাঁ বিবাহিত।
- বাচ্চা-কাচ্চা আছে?
- হ্যাঁ, একটা মেয়ে।
- বয়স কত?
- তিন।
- নাম কী?
- মন।
- মন? বাহ্। সুন্দর নাম তো!
- পুরো নাম কী?
- দিলরুবা পারভিন।
- আপনার স্ত্রী কি কিছু করেন? চাকরি-বাকরি?
সোবহান ম্লান হেসে বলে, - না।
- কেন? বউদের ঘরে বসিয়ে রাখার পক্ষপাতী আপনি? লেখাপড়া করেনি?
- করেছে। কিন্তু মনে হয় না ও বাইরে কাজ করতে চায়।
- এ তো শুধু মনে হওয়া। কণ্ঠে আমার সামান্য শ্লেষ।
জুলেখা ভাবছে সুরঞ্জন তাকে লেলিয়ে দিয়েছে সোবহানের পেছনে। সুরঞ্জনের ওপর প্রতিশোধ তাকে আলো দিচ্ছে, সোবহানের প্রতি মুগ্ধতা তাকে পায়ের তলায় মাটি দিচ্ছে, সুতরাং আহ্লাদে পথ চলছে সে। আর এই বাঙালি সমাজে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে নরমাল বলে ভাবা হয়। জুলেখা আর সোবহান মুসলমান হলে কী, এই সমাজেরই তো মানুষ। নাহয় পুজোটা করে না, শাঁখা-সিঁদুর পরে না, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তো জন্ম এবং বেড়ে ওঠা, মানসিকতা তো এই সমাজই গড়ে দিয়েছে। সব পুরুষই, লক্ষ করেছি, কোনও মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে যখন, তখন তাকে প্রেমিকা বলে পরিচয় দিচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর তাকে আর প্রেমিকা বলে মনে করছে না। সে এখন স্ত্রী, অন্য কোনও মেয়ে হবে প্রেমিকা। যে প্রেমিকা সে-ই যে স্ত্রী হতে পারে এবং একই সঙ্গে সে-ই যে প্রেমিকা –এটা অনেক বন্ধুকে বোঝাতে গিয়েও দেখেছি ওরা ব্যাপারটা ধরতেই পারে না।
সোবহান একটা প্রশ্নও আমাকে করেনি। নিজে শুধু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। কিছু জানতে ইচ্ছে হয় না লোকটার? মানুষকে বিশ্বাস করে অনেক ঠকার পরও আমার স্বভাব সেই মানুষকেই বিশ্বাস করা। সোবহানকে দেখেই দশে দশ দিতে ইচ্ছে করে না আমার। আপাতত, বুঝি যে, সোবহান মহা আহ্লাদে আছে, বেশকিছু নারী-পুরুষ তাকে বেশ খাতির করছে। খাতির কার না ভালো লাগে? কিন্তু সুরঞ্জনের সঙ্গে এর বন্ধুত্ব কী করে হলো, তা আমার কাছে অজানা। যেটুকু দেখা হলো, বুঝলাম যে সোবহান নতুন বন্ধু হলেও সুরঞ্জনের বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ও কি আমাকে দেখাতে চাইছে যে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা মুসলমান, যেহেতু আমি বলেছিলাম, সে কট্টর হিন্দু হয়ে উঠছে? সুরঞ্জন আমার সঙ্গে খেলছে। নাকি ও নিজের সঙ্গে খেলছে?
ভোরবেলা উঠে সেদিন সোজা চলে যাই বেগবাগানে। তখন ছটা বাজে। দোকানপাট সব বন্ধ। আবর্জনার স্তূপ পরিষ্কার করছে কজন, পাশে নোংরা ট্রাক। ফুটপাতে কালিঝুলিমাখা ন্যাংটো পাগল শুয়ে আছে। হেরোইন টানছে। এক হাতে নাক চেপে আরেক হাতে গাড়ি চালাই। জুলেখার কাছে পাওয়া ঠিকানা আমার। দরজায় কড়া নাড়ছি। ভেতর থেকে কর্কশ একটা পুরুষকণ্ঠ। কণ্ঠটি যে সুরঞ্জনের না খুলে দিলে বুঝতে পারতাম না। খালি গা, লুঙ্গি পরা। ভেতরে ভ্যাপসা গরম। মাথার ওপর একটা ফ্যান চলছে, একটা ক্যাম্প খাটে অল্পবয়সী একটা ছেলে ঘুমোচ্ছে। মশারি টাঙানো দু বিছানাতেই। সুরঞ্জন চোখ কচলে তাকালো। সামনে যে আমি দাঁড়িয়ে আছি, যেন সে চিনতে পারছে না।
- চল।
- চল মানে? বিরক্তি সুরঞ্জনের কণ্ঠে।
- প্যান্ট শার্ট পরে নাও।
— কেন?
— আগে বেরোও না। পরে বলছি।
সুরঞ্জন বেরোতে যে সময় নেয়, তার অর্ধেকের অর্ধেক সময় লাগতো আমার বেরোতে। সুরঞ্জনকে গাড়িতে উঠিয়ে, পাশে বসিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে বিদ্যাসাগর সেতুর ওপর দিয়ে শহর ছাড়ি।
সুরঞ্জন বললো, কোথায় যাচ্ছেন?
গাড়িতে রমা মণ্ডলের গান ছেড়ে দিই। খালি গলায় গান। রমা মণ্ডলের 'নমি নমি চরণের সিড়ি থেকে অসাধারণ গানগুলো এক এক করে বাজতে থাকে। নমি চির মঙ্গল হে, নমি চির সম্বল হে...। রবীন্দ্রনাথের পূজার গানগুলোকে আমি কোনও দিন পূজার গান বলে মনে করতে পারিনি। সবই অন্তরে প্রেমের গান হিসেবে বরণ করেছি।
কোথায় যাচ্ছেন এর উত্তরে যেখানে দুচোখ যায় বলি।
- কিন্তু আমি তো যেখানে দুচোখ যায়, যেতে চাই না।
- কোথায় যেতে চাও? বলবে কোথাও না। ওই বেগবাগানের বাড়ির মধ্যে বসে থাকতে চাও, অথবা সন্ধ্যেবেলা মদ খেতে চাও কোথাও বসে, এই তো?
- তাই, যদি আমার ভালো লাগে!
- ভালো লাগে না, তা বলছি না। কিন্তু আজ আমার ভালো লাগছে তোমাকে নিয়ে যেদিকে দুচোখ যায় চলে যেতে।
- পাগল হয়েছেন?
হেসে বলি, পাগল তো চিরকাল ছিলামই।
সুরঞ্জনের পরনে একটি ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি আর কালো প্যান্ট। পায়ে কালো চটি। গাড়ির ভেতর এসি চলছে। কোনও সুগন্ধি মেখেছে কি সে? মনে হয় না। হয়তো মুখ ধুয়েছে কোনও লাক্স সাবান দিয়ে, সেটির ঘ্রাণ বেরোচ্ছে।
- কী বলবেন?
- কিছু না।
সুরঞ্জন এবার হাসতে হাসতে বলে, এ রকম ছিনতাই করে নিয়ে আসছেন। মেয়েরাও এ রকম করে তাহলে, শুধু পুরুষই নয়।
হেসে বলি, ইক্যুয়ালিটির কথা কি শুধু শুধু বলি!
দুজনের হাসি পরিবেশকে রহস্যমুক্ত করে। হালকা করে। সুরঞ্জন শ্বাস নেয় নিশ্চিন্তে।
- আশ্চর্য সুন্দর সকাল, আশ্চর্য সুন্দর গান। কতকাল ভোর দেখিনি। কতকাল গান শুনি না।
- কেন? কী হয়েছে তোমার?
সুরঞ্জন ঠোঁট উল্টে বলে, জানি না।
‘চিরসখা হে, ছেড়ো না মোরে’ গানটা যখন বাজছে, আমাদের এক রকম মুগ্ধ করে রাখলো। এই গানটা কণিকাও গেয়েছেন। রমাও কম ভালো গাননি।
সুরঞ্জনকে উঠিয়ে নিয়ে আসার আমার অনেকগুলো কারণ। ও ঝিলের ধারে গিয়ে বসে থাকে, এই খবর আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। ও কি সুধাময়ের মতো কিছু করতে চাইছে। যে ছেলে প্রেমে ডুবে আছে, প্রেমিকা নিয়ে চমৎকার সময় কাটাচ্ছে, যখন সামনে অফুরান স্বপ্ন, এমন সময় প্রেমিকাকে বিদায় করে দিচ্ছে আশ্চর্য নির্লিপ্ততা নিয়ে, সে হয় মাথার অসুখে ভুগছে, ভীষণ ডিপ্রেশনে, যে কোনও মুহূর্তে আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে। কোনও ভরসা নেই। ঝিলের পাড়ে বসে থাকা খুব ভালো লক্ষণ নয়। আমার কোনও উদ্দেশ্যই নেই জুলেখার সঙ্গে তার সম্পর্ক চালিয়ে যেতে বলা। চালিয়ে গেলেই যে তার ডিপ্রেশন চলে যাবে তা আমি মনে করি না। আমার উদ্দেশ্য ওর একঘেয়ে জীবনটা থেকে একটু ছুটি দেওয়া। দূরে কোথাও, দূরে দূরে কে না যেতে চায়? ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠো বললেই কেউ কাটাতে পারে না। স্যাঁতসেঁতে জীবনটায় একটু রোদ্দুর চাই। একটু যা ইচ্ছে তাই চাই। কেউ কেয়ার করে, কেউ ভালোবাসে চাপও, চাই। কোনও সম্পর্ক কি আছে, মুক্তির সম্পর্ক, এমন কিছু আজ দিতে চাইছি সুরঞ্জনকে। আকাশ দিতে চাইছি। যেদিকে দুচোখ চাইছি দিতে। সব ভুলে সব ফেলে হারিয়ে যাওয়া চাইছি দিতে। আমার আচরণে আমার ইচ্ছের কতটুকু কী প্রকাশ পায় আদৌ পায় কিনা কে জানে।
আটটার দিকে একটা চায়ের দোকানের কাছে থামিয়ে চা খাই দুজন। সামনে বিস্তৃত সবুজ ক্ষেত। প্রচুর তালগাছ এ দিকটায়। নারকেল গাছ তো আছেই। গ্রাম চিরকালই আমাকে টানে। যখনই ঘন সবুজ আর নির্জনতার কাছে আসি, ভাবি প্রায়ই আসবো, প্রায়ই আর আসা হয় না। হয় না হয় না, কত হয় না নিয়ে বাঁচতে হয়! হওয়ালে এভাবেই হওয়াতে হয়। সাত সকালে তুড়ি। চল। যাই। যেদিকে দুচোখ যায়। যেদিকে দুচোখ যায় আমার ছোটবেলা থেকেই আমার রক্তে। কলেজ থেকে ফিরে ইয়াসমিনকে রিকশায় তুলে বেরিয়ে পড়তাম। রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করতো, কোথায় যাবেন? বলতাম, যান। বলতো, যাবো কোথায়? যেদিকে আপনার ইচ্ছে সেদিকে চলুন। রিকশাঅলা অবাক, বলে, মানে? তখন খোলাসা করে বলতাম, যেদিকে দুচোখ যায়, যান। তখন সে পায়ে প্যাডেল মারতো। এই জিনিসটা রিকশাঅলারাও পছন্দ করতো। নিজের পছন্দমতো জায়গা দিয়ে চলা ওদের মনে ফুর্তি জাগাতো।
বিদায় দাও খেলার সাথি, গেল যে খেলার বেলা ... গানটা যখন বাজে, তখন সামনে অনন্ত পথ আর ঘিরে ধরা দুধার্যের সবুজ। কেউ কোনও কথা বলি না অনেকক্ষণ। এক সময় বলি সুরঞ্জনকে, কথা বলো।
- কী কথা?
- যা ভালো লাগে তাই। যা ইচ্ছে করে।
সুরঞ্জন বলে না কিছু।
- কী ইচ্ছে করে? রাজনীতি নিয়ে বলবে?
সুরঞ্জন হা হা করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে, না।
- অর্থনীতি?
- না।
- মেজরিটি মাইনরিটি রিলেশন?
- না।
- হিন্দু-মুসলমান? একটুও না!
সজোরে মাথা নাড়ে সুরঞ্জন।
- তোমার বাবা-মা-বোন, বোনের বাচ্চাগুলো?
- না।
- বন্ধুবান্ধব?
- না।
- জুলেখা।
মাথা নাড়ে সুরঞ্জন। না।
- নিউ ফ্রেন্ড সোবহান?
সুরঞ্জন চোখ ছোট করে হাসে। বলে, না।
- বেগবাগান? বেলঘরিয়া? টিউশনি? স্টুডেন্টস?
- না।
- বাংলাদেশ?
- না।
ওরে বাবা। তাহলে তো কিছুই বলবে না তুমি সুরঞ্জন।
সবকিছুতেই ওর অনীহা বলে কথা বলবে না। আমাকে বলতে হয় সিট বেল্টের কথা। সিট বেল্ট সে বাঁধতে না চাইলেও বাঁধতে বাধ্য করি। আমাকেও সে বাধ্য করে আধ ঘণ্টা পর পর গাড়ি থামাতে। তার সিগারেটের তৃষ্ণা। গাড়ির ভেতর খাওয়া নিষেধ। সুতরাং গাড়ি থামাও।
পাঞ্জাবি ধাবায় সকালের নাস্তা হয়। বর্ধমানের কাছে গিয়ে দুপুরের খাবার। না, ওসব নিয়ে আমরা কিছু কথা বলি না। সবই যা দেখছি চোখের সামনে, যা খাচ্ছি, যা শুনছি, তা নিয়ে। অতীত নেই। ভবিষ্যৎ নেই। আমাদের তখন শুধু বর্তমান। আমরা দুটি মানুষ জন্ম নিয়েছি সকাল ছয়টায়। তার পর থেকে জীবন কাটাচ্ছি। কেবল কি সুরঞ্জনের জন্য, এই বেরিয়ে পড়াটি আমার জন্য দরকার ছিল না কি! ছিল।
খামোখা পথ ভুল করে আবার পথ চিনে চিনে শান্তিনিকেতনে ফিরে আসি। কোপাই-এর ধার ধরে হাঁটি দুজন। অনেকক্ষণ। কোনও গাছের এলিয়ে পড়া, নদীর ভেঙে পড়া দেখলে দাঁড়াই। রাঙামাটির পথে হাঁটা পাশাপাশি। গাইতে গাইতে গান। গানগুলো ছিল ভেতরে। স্রোতের মতো বেরিয়ে আসে যেন। সাঁওতাল এলাকায় হেঁটে বেড়াই। মাটির বাড়িগুলোর ভেতরে ঢুকে ওদের জীবন যাপন দেখি। সুরঞ্জন কোনও দিন সাঁওতাল পল্লিতে আসেনি। অবাক হয়ে দেখে সব। সোনাঝুরি বনে হাঁটতে থাকি আর বলতে থাকি সাধারণ কথা। অনেকক্ষণ হয়তো হাঁটছি বা বসে আছি, বা শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখছি, কথা বলছি না। নৈঃশব্দ্যও যে আশ্চর্য সুন্দর হতে পারে। শুধু পাখির আওয়াজ শুনি দুজন বসে বসে। ধীরে ধীরে, একটু একটু করে, অন্ধকার যেমন পড়ে আমাদের ওপর, একই সঙ্গে আলো পড়তে থাকে। এ কী! আকাশ আমাদের দিকে বড়, মায়ায় তাকিয়ে থাকে। যেন গোটা আকাশটা জুড়েই চাঁদ, এমন চাঁদ। আজ যে পূর্ণিমা, কে জানতো? সোনাঝুরি বনে সাঁওতাল রমণীরা আগুন জ্বেলে হাড়িয়া খেয়ে নাচছে। ওদের কাছ থেকে চেয়ে হাড়িয়া নিয়ে খেল সুরঞ্জন। ওদের সঙ্গে নাচলোও। হাড়িয়া খাওয়া সুরঞ্জন আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আগুনের সামনে দাঁড় করিয়ে বললো, তুমিও নাচো।
এ সুরঞ্জন নয়, এ হাড়িয়া। সুরঞ্জন আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করে না।
- কী ব্যাপার, তুমি আমাকে তুমি বলছো কেন?
পাশে দাঁড়িয়ে রমণীদের তালে তালে নাচতে নাচতে বললো, তুমি আমাকে তুমি বলো কেন?
- শোধ নিচ্ছ?
- হ্যাঁ, শোধ নিচ্ছি।
সুরঞ্জন হা হা করে জোরে প্রাণ ফাটিয়ে হাসতে থাকে। এও কি হাড়িয়া? সুরঞ্জন নয়? আমার বিশ্বাস হতে থাকে এ প্রাণ খুলে হাসছে ছেলেটি সুরঞ্জন।
আমার খুব ভালো লাগতে থাকে। সোনাঝুরি বনটা পূর্ণিমায় দিনের মতো দেখতে লাগে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় এ জগৎটাতে বুঝি নেই আমি। যেন অন্য কোনও অপরূপ দেশে কারও ডানায় করে উড়ে এসেছি। সুরঞ্জন একটা সাঁওতাল মেয়ের সঙ্গে এলিয়ে পড়েছে। সে কি চুমু খেতে চাইছে কাউকে? থাক, আজকের এই অসাধারণ চাঁদের আলোয় যা ইচ্ছে তাই করা যায়। রাত একটার দিকে ফাঁকা হয়ে আসে সব। বাড়ি ফিরে যায় ওরা। আমি আর সুরঞ্জন চাঁদের আলোয় শুয়ে থাকি সাদা বালিতে। চারদিকে গলে পড়তে থাকা চাঁদ আর হু হু হাওয়া। কেউ আমরা ঘরে ফেরার কথা উচ্চারণ করি না। যেন এ জীবনের বাইরে আমাদের আর কোনও জীবন নেই। চোখ যখন মেললাম, ভোর হবে হবে করছে। তখনই গাড়িতে স্টার্ট দিই। সোনাঝুরি বনের পাশ দিয়ে রাঙামাটির পথ ধরে কলকাতার দিকে। পথে সূর্যোদয় পড়লো। সবুজের ওপর রক্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়লো, সাক্ষী হয়ে রইলাম। পথে সুরঞ্জন একবারও জিজ্ঞেস করে না, কেন তাকে নিয়ে এসেছিলাম, কোনও জরুরি কথা ছিল কিনা।
- চল চা খেতে থামি।
- ওদিকটা কী সুন্দর সবুজ। চল দাঁড়াই।
এ রকম আমরা কলকাতার বাইরে পল্যুশনের বাইরে ঘিঞ্জি গলির স্যাঁতসেঁতে জীবনের বাইরে, একটানা যাপন করা একঘেয়ে জীবন থেকে বাইরে বেরিয়ে একটু শ্বাস নিয়ে আসি। এর মানে এই নয়, আমাদের জীবন পুরোপুরি পাল্টে গেল। আমাদের জীবনে সামান্য একটু হাওয়া বইলো। সুরঞ্জনকে সুখ দিয়ে, এই হাওয়া দিয়ে আমার কী লাভ, যে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে। নিজেকেও শুধোতে পারি, কেন?
এই কেনর উত্তর খুব জটিল কি? সুরঞ্জনকে আমার খুব আপন মনে হয়। আপন কেন মনে হবে? সুরঞ্জন তো আমার সৃষ্টি কোনও চরিত্র নয়। ওর একটা অস্তিত্ব আছে। আমি তাকে তার চলাফেরা, তার কথা, তার চিন্তা—কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তার পরও মনে হয় তার ওপর আমার অধিকার আছে। উপন্যাস লেখার কারণে সেটা হয়তো জন্মেছে। আর সুরঞ্জনের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, যে পক্ষপাত, তাকে অন্তর দিয়ে বোঝার যে চেষ্টা সেটাকে একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না।
কলকাতায় ঢোকা মানে একশহর দূষণের মধ্যে, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, আর অশ্লীল ট্রাফিকের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেলাম, যেখানে হাওয়া ঢোকার কোনও জায়গা নেই। বেগবাগানে সুরঞ্জনকে নামিয়ে দিয়ে বলি, অ্যাই শোনো, একদিন বালিগঞ্জ লেকের পাড়ে যাবো তুমি আর আমি। ঠিক আছে?
— হঠাৎ লেক?
— হ্যাঁ, লেক। ওখানে সাঁতার কাটা যায় না? সাঁতার কাটবো।
— সাঁতার?
— হ্যাঁ, সাঁতার।
সুরঞ্জন মাথা নাড়ে। হ্যাঁ বা না, কিছু হবে একটা। আমি আর জানতে চাই না। গাড়ি ঘুরিয়ে নিই।
জীবন কী সুন্দর! চল বেঁচে থাকি। ঝিলের ধারে যাও কেন? মরতে? এসব বলে কোনও সমস্যার সমাধান হয় না। আমার মাঝে মাঝে মরতে ইচ্ছে করতো। জীবন আমার কাছে একটা ফালতু জিনিস হয়ে উঠেছিল। আত্মহত্যারও ইচ্ছে হতো আমার। তখন কে যেন, খুব আপন কেউ যে তার নয়, কাঁধে হাত রাখলো ভালোবাসার সঙ্গে। ওই কাঁধে হাত রাখাটা আমাকে বড় বিহ্বল করে তুলেছিল। জীবন যে কত সুন্দর! ওই স্পর্শটুকু না পেলে হয়তো বোঝা হতো না আমার।
এরপর কয়েক দিন সুরঞ্জনের সঙ্গে আমার কথাও হয় না। দেখাও হয় না। সুরঞ্জন এখন আর মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না। যেটা ছিল, সেটা সে একবার শুনি মায়াকে দিয়ে দিয়েছে, আরেকবার শুনি কিরণময়ীকে দিয়েছে। এত ধোঁয়া আমি সরাতে পারি না। একটা চরিত্রে এত অপরিচ্ছন্নতা থাকলে চলে কী করে?
একদিন জুলেখার কাছে সুরঞ্জনের খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি সে নাকি বাংলাদেশে গেছে। বাসে। কার নাকি দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতালে আছে। খবর পেয়েছে কী করে তা জুলেখা জানে না।
- কে? কী নাম? আমার কণ্ঠ কাঁপে।
জুলেখার সঙ্গে কোনও কথা হয়নি। সে শুনেছে সোবহানের কাছ থেকে।
- বন্ধুটি কে? পুলক?
- না।
- কাজল?
- না। এ রকম নাম না।
- রত্না?
- উঁহু।
- কে? অঞ্জন? সুভাষ?
জুলেখা ওপাশ থেকে বলে, আমি সোবহানের কাছ থেকে জেনে তোমাকে জানাচ্ছি।
দশ মিনিট পর সে ফোন করে।
- ওর বন্ধুর নাম হায়দার।
- হায়দার?
- জুলেখার শান্ত কণ্ঠস্বর। হ্যাঁ, হায়দার।
ফোন রেখে দেওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ যেখানে বসে ছিলাম, বারান্দায়, বসেই থাকি। সামনে বিশাল একটা আকাশ ছাড়া আর কিছু থাকে না।
চলবে.......
২৮ তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
লেখক সংক্ষেপ:
জনপ্রিয় প্রথাবিরোধী লেখিকা তসলিমা নাসরিন ১৯৬২ সালের ২৫ আগষ্ট ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৭৮ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস পাস করেন। তসলিমা নাসরিন ১৯৯৪ সাল অবদি চিকিৎসক হিসেবে ঢাকা মেডিকেলে কর্মরত ছিলেন।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে লেখালেখি নয়তো চাকুরি ছাড়তে বললে তিনি লেখালেখি ছাড়েন নি। বরং সরকারি চিকিৎসকের চাকুরিটিই ছেড়ে দেন তিনি। তখন এই লেখিকাকে কেন্দ্র করে উগ্র মৌলবাদীদের আন্দোলনে উত্তাল ছিলো পুরো দেশ। বেশ কিছু মামলাও হয়েছিলো তার বিরুদ্ধে। শেষে এককথায় বাধ্য হয়েই দেশত্যাগ করেন নারীমুক্তির অন্যতম অগ্রপথিক তসলিমা নাসরিন। এরপর তিনি নির্বাসিত অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন