উপন্যাস : তাজমহল প্রথম খন্ড
লেখিকা : প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল : ১লা অক্টোবর, ২০২৫ ইং
লেখিকা প্রিমা ফারনাজ চৌধুরীর “তাজমহল - ১ম খন্ড” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশ করা হলো। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি ২০২৫ সালের ১লা অক্টোবর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
![]() |
| তাজমহল || প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী |
তাজমহল || প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী || প্রথম খন্ড (পর্ব - ১৫)
সকাল আটটার দিকে শাইনার দাদীমা এল নাতনিকে দেখতে। নতুন শাড়ি পরেছে। মুখে তিব্বত পাউডার মেখেছে। নতুন স্যান্ডেল পায়ে দিয়েছে।
দাদীমা দেখতে এমনিতেই সুন্দর। শাইনা তার দাদীমার মতো দেখতে হয়েছে। নাতনীকে খালি হাতে দেখতে আসেননি তিনি। এক কার্টন মিষ্টি আর নিমকিও এনেছেন।
শাইনার ঘরে তখন আত্মীয় স্বজনে ভরা। সবাই বউ দেখতে ভিড় জমিয়েছে ঘরে। শাইনাকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। শাড়ি, গয়না দেখছে। তার ভাইরা কে কি করে সব জানতে চাইছে। শাইনা সংক্ষিপ্ত আকারে উত্তর দিচ্ছে।
শাইনার দাদীমাকে তিতলি ঘরে নিয়ে এল। দাদীমা ভিড় দেখে বললেন,"সবাই তো নতুন বউ দেখছে। আমি ভুল সময়ে এলাম নাকি?"
মেহমানরা একটু সরে গেল। তিতলির মেঝ ফুপী বলল,"না চাচী। আসো। তোমার নাতিনের সাথেই গল্প করছিল সবাই।"
তিতলি সবাইকে নিয়ে গিয়েছে। তারা দাদী নাতনি কথা বলুক। দাদীমা শাইনাকে গালে হাত বুলিয়ে দিলেন। গালের সাথে গাল ঠেকিয়ে আদর করলেন। শাইনা সরে বসলো। মুখ ফিরিয়ে রাখলো। দাদীমা তার চুলের সিঁথি হাত দিয়ে মালিশ করে দিতে দিতে বললেন,"কিছু খাসনি?"
শাইনা হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,"চুল বেঁধেছি। নষ্ট করে দিচ্ছ।"
দাদীমা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। শাইনা একটু করে ফিরলো দাদীমার দিকে।
"এভাবে কি দেখছো?"
"ব্যাটা তোরে কাল রাতে কিছু দেইনাই? উপহার দেয় তো।"
শাইনা চুপ। দাদীমা আরও খোঁচালেন।
"আদর টাদরও দেয়নি? ব্যাটা তো কিপ্টা না।"
শাইনা রাগত দৃষ্টিতে তাকালো। দাদীমা বললেন,
"ওমা এমন করে তাকাস কেন? ভুল কি বলছি? হাতটাতও ধরেনাই?"
বলেই শাইনার হাত ধরলেন। শাইনা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,"তোমাকে এখানে কে আসতে বলেছে? যাও এখন। যখন তখন এখানে আসবেনা।"
"আমি লন্ডনওয়ালার সাথে কথা বলব। তারপর যাব। তোর কথায় চলে যাব নাকি?"
শাইনা বিড়বিড়িয়ে বলল,"নাটক করতে আসছে।"
দাদীমা বললেন,"রাতে ঘুমাসি? চোখের নিচে কালি পড়ছে কেন?"
শাইনা শক্ত কণ্ঠে বলল,"না ঘুমাইনি।"
"ব্যাটা ঘুমাতে দেয়নি?"
"তুমি জেনে কি করবে?"
"না জানলে শিখিয়ে দেব।"
শাইনা রেগেমেগে বলল,"তুমি এখান থেকে না গেলে আমি চেঁচাব।"
"এটা তোর বাপের বাড়ি নাকি যে চেঁচাবি? বুঝতে পারছি রাতে ঘুমাসনি তাই মেজাজ কড়া হয়ে আছে।"
"হ্যাঁ ঘুমাইনি। তো?"
"তো আবার কি? ব্যাটা তো এমনি এমনি জাগিয়ে রাখেনি তোকে। কিছু তো দিছে। দেখি দেখি মুখ ফিরা।"
শাইনার মুখ ফিরিয়ে দেখলেন উনি। শাইনা হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,"তুমি যাবে কি যাবেনা?"
দাদীমা হাসলেন।
"ব্যাটা সোহাগ টোহাগ দেয়নাই?"
শাইনা এবার রেগেমেগে দাঁড়িয়ে পড়লো। জোরে তিতলিকে ডাকলো। তিতলির বদলে তাজদার ঘরে ঢুকে এল একটা বড় সড় কাগজের কার্টন নিয়ে। পরনে কালো শার্ট। শাইনা তাকে দেখে চুপচাপ আবারও পালঙ্কে বসে গেল।
দাদীমাকে দেখলো তাজদার। কার্টনটা রেখে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে দাদীমাকে বলল,"মিষ্টি আনতে বলি?"
দাদীমা হাসলেন। পাশে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
"বসো আগে। কথা বলি। মিষ্টি পরে খাব।"
তাজদার দাদীমার পাশে এসে বসলো। শাইনা ওপাশে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। দাদীমা বললেন,"আমার নাতনিকে নাকি ঘুমাইতে দেওনাই? চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে।"
"আমাকেই তো ঘুমাতে দেয়নি।"
"কারণ কি? কাঁদাইছো? আমি ওর চোখমুখ দেখে বুঝতে পারছি। কেন কাঁদাইছো?"
"আমাকে দেখে কাঁদছে।"
"কেন কাঁদবে?"
"সেটা আমি কি করে জানব? জিজ্ঞেস করুন। আমিও একটু শুনি।"
"আমি কেন জিজ্ঞেস করবো? তুমি জিজ্ঞেস করোনাই?"
তাজদার বলল,"আমার সাথে তো কথা বলেনা।"
দাদীমা অবাক হয়ে গেলেন,
"ওকি কথা? বরের সাথে কেমনে কথা বলেনা? ও সোহাগী তুই কথা বলিস না কেন রে? তোর মুখে তো এমনিতেই খই ফোটে।"
শাইনা এমনভাবে বসে রইলো যেন সে কোনো কথা শুনতে পাচ্ছেনা। কাঁধে ব্যাথা হচ্ছে। পিন অনেকখানি বিঁধে গিয়েছিল। খিদেও লেগেছে। এখনো কেউ খেতে ডাকছেনা।
তাজদারের সাথে দাদীমা ওয়ালিমা বিষয়ক কথাবার্তা বলছেন। শাইনা হাতের চুড়ি গুলোকে নাড়াচাড়া করছে একমনে। ওদের কথায় তার মনোযোগ নেই। অনেকক্ষণ পর তাসনুভা এল। বলল,
"ভাইয়া শাইনা আর দাদুকে নিয়ে আম্মু আসতে বলছে।"
"যাচ্ছি।"
তাসনুভা শাইনার দিকে একপলক তাকিয়ে চলে গেল। দাদীমা শাইনার দিকে ফিরলেন। তার সামনে গিয়ে বললেন,
"কাঁধে নাকি ব্যাথা পাইছিস? দেখি।"
"অল্প।"
দাদীমা তার সামনে গিয়ে তার কাঁধ দেখলো। মিনি ব্যান্ডেজ লাগানো।
"জামাইকে দিয়ে তোর সেবা করাইছিস সারারাত? কপালে নাকি ঠোকাও খাইছিলি।"
শাইনা চোখ গরম করে তাকালো। বুড়ি বেশি ফটরফটর করে সব জায়গায়। দাদীমা নিজের জায়গায় এসে বসলেন। বললেন,
"এদিকে ফিরে বস। এমন করে মুখ লুকিয়ে কয়দিন থাকবি? কি আজব মেয়ে হয়ছে আমার ছেলের। আরেহ আমরা ওইকালেও এত লজ্জায় পাইনাই সোয়ামিরে।"
শাইনা তাকালো না। তবে মুখ ফিরিয়েও রাখলো না। সোজা হয়ে বসলো। মাথা নামিয়ে হাত কচলাচ্ছে অল্পস্বল্প। দাদীমা বললেন,
"আমার যেদিন বিয়ে হয়েছিল সেদিন আমি কাঁদছিলাম অনেক। তোর দাদা আমার হাত ধরে....
দাদীমা গল্প শোনাতে লাগলেন। শাইনার ইচ্ছে করছে বুড়িকে ঘর থেকে বের করে দিতে। মুখে লাগাম নেই।
দাদীমা বসে আছেন তাদের মাঝখানে।
তাজদার শরীরটা খানিকটা পেছনে হেলিয়ে বিছানার ওপর দুহাত দিয়ে ভর রেখে দাদীমার পেছনে সোজা শাইনার দিকে তাকালো। শাইনা সেই দৃষ্টি টের পেয়েই একটু চমকে উঠে তাকালো। তারপর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নিজের জায়গায় নড়েচড়ে বসে বসলো। অস্বস্তি গলার কাছে চেপে বসলো, নিঃশ্বাসটাও ভার ভার।
তাজদার সিদ্দিকী গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো। দাদীমাকে বলল,"আসুন, মেহমানকে এতক্ষণ নাশতা না খাইয়ে বসিয়ে রাখলাম।"
দাদীমা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। শাইনা দাদীমাকে ফিসফিস করে বলল,"বেয়াদব দুটো একসাথে হয়েছে।"
দাদীমা হেসে ফেললেন। যেতে যেতে তাজদারকে বললেন,"কি বলছে দেখো।"
"কি?"
"আমিও বেয়াদব, তুমিও বেয়াদব।"
শব্দ করে হাসলো তাজদার সিদ্দিকী।
"মিথ্যে নয়।"
_________
ওয়ালিমার অনুষ্ঠান রাতে। সকালে রওশনআরাকে একদফা কথা শুনিয়েছেন তাজউদ্দীন সিদ্দিকী। কারণ ওয়ালিমার যে গরু কেনা হ'য়েছে সেটা তাজদার পছন্দ করেনি। গরুটা আবার অন্যত্র বিক্রি করে নতুন একটা কেনা হয়েছে। আট হাজার টাকা লস হয়েছে। দ্বিতীয় গরুটাও তার পছন্দ হয়নি তেমন। বলেছে মোটামুটি। টাকা অনুযায়ী আরও ভালো হতে পারতো। তার বাপ চাচা কেউ গরু চেনেনা।
রায়হান খেপে গেছে তার বাছাবাছি দেখে। কোরবানির গরু হলে একটা কথা। ওয়ালিমার গরু নিয়ে এত বাছাবাছি বিরক্তির। সে রওশনআরাকে বলে দিল, তোমার ছেলের আর কোনোকিছুতে আমি নেই। বিয়ে আর কেউ করেনি? শুধু ও করছে? সবকিছুতে বাছাবাছি।
বাপ চাচা সবাই নিজেরা নিজেরা বলাবলি করছিল এইসব কথা নিয়ে। কিন্তু তাজদারকে কেউ কিছু বলেনি। তার কানে গেলে বলবে কোনো গরুই জবাই করতে হবেনা। খাসি দিয়ে চালিয়ে দাও।
গরুর ব্যাপারটা কোনোমতে মিটমাট হওয়ায় রওশনআরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
দুপুরে চলে এসেছে শাইনা মা বোনেরা।
রওশন আরা বলেছিল দুপুরে তাদের বাড়িতে চলে আসতে। ওয়ালিমা যেহেতু ক্লাবে হবে।
সবাই কথামতো দুপুরে চলে এসেছিল। শাইনা মামী, খালাম্মারা শাইনার ঘরটা ঘুরেফিরে দেখছিল। আসবাবপত্রগুলো দেখছিল। শাইনার বড় বোন শারমিলা বলল,
"আমি বলেছিলাম না ওর ঘরে আসবাবপত্রে ভর্তি। আব্বা ফার্নিচার দিলে সেগুলো বসানোর জায়গা ছিল না এখানে।"
শাহিদা বেগম শাইনাকে দেখছিলেন। দাদীমা গিয়ে উনাকে বলেছেন শাইনা নাকি জামাইয়ের সাথে কথাবার্তা বলছেনা। কাল রাতেও নাকি কথাবার্তা বলেনি। কেঁদেছে শুধু। কথাটা তিনি আফসার সাহেবের কানেও তুলেছেন।
তাদের মেয়ে জামাইয়ের সাথে কথা বলছেনা কথাটা একবার রটে গেলে যা নয় তা কথা হবে।
শাইনা গম্ভীর মুখে বসে আছে। ঘর থেকে দু একবার বের হয়েছিল সে। তিতলির ঘর অব্দি গিয়ে আবারও ফিরে এসেছে। গরু নিয়ে ঝামেলা হয়েছে সেটা তার কানে এসেছে। তাজদার সিদ্দিকী যে নিজের পরিবারের মানুষগুলোকেও কতটা যন্ত্রণায় রেখেছে সেটা শাইনা একটু হলেও বুঝতে পেরেছে।
মায়ের সাথে তেমন ভালোভাবে কথাবার্তা বললো না সে। ভাবিরা তাকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছিল হাসিঠাট্টা করে। শাইনা কারো কথার জবাব দেয়নি।
তাজদারের ফুপুরা শাইনার ফুপুদের কথায় কথায় বলল, শাইনা কাল থেকে এভাবে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। না কথাবার্তা বলছে, না ভালো করে খাওয়াদাওয়া করছে, না তার মুখে একটু হাসি আছে। শুধু শ্বাশুড়ির সাথে দু একটা কথা বললো। আর কারো সাথে না। দশটা কথার একটা জবাব দিচ্ছে। পাশের বাড়ি থেকে মেয়ে এনেছে এই কাহিনি দেখার জন্য? সে তো সবাইকে চেনে। এত লজ্জা পাওয়ার কি আছে?
শাহিদা বেগম চুপচাপ শুনলেন। শাইনার ফুপুরা জবাব দিল।
"প্রতিবেশী মানুষজন হুট করে আত্মীয় হয়ে গিয়েছে তাই লজ্জা পাচ্ছে। ঠিক হয়ে যাবে। আমার ভাইঝি মেয়ে ভালো।"
তাজদার হঠাৎ ঘরে এল। সবাই তাকে দেখে মাথায় ঘোমটা টানলো। তাজদার নিজের ঘড়িটা খুঁজছে। খুঁজে পাচ্ছে না। ঘরভর্তি মানুষ। কাকে জিজ্ঞেস করবে? শেষমেশ শাইনার দিকে তাকালো। শাইনা চোখ সরিয়ে নিয়ে তার ভাইপোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। তাজদার বালিশ সরিয়ে, জিনিসপত্র নেড়েচেড়ে ঘড়িটা খুঁজছে দেখে শাহিদা বেগম বললেন,"তাজ বোধহয় কিছু খুঁজছে।"
"হ্যাঁ ঘড়িটা।"
শাইনার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। ঘড়ি খুঁজে পাচ্ছে না?
তার পরিবারের কাউকে চোর বানিয়ে দেবেনা তো? সে আপার ছেলেমেয়েদের দিকে তাকালো। তাজদার সিদ্দিকীর মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। শাইনার শরীর খারাপ লাগছে। আবারও দমবন্ধ লাগছে। অস্থির লাগছে। শাহিদা বেগম আর শারমিলাও এদিকওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখছে ঘড়িটা কোথাও আছে নাকি। শাহিদা বেগম হঠাৎ করে শাইনার পায়ের কাছে এসে বসে পড়লো। ঘড়িটা নিচে পড়ে আছে। শাইনা মায়ের হাত থেকে ঘড়িটা কেড়ে নিয়ে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বললো। ঘড়িটা আড়াল করে ফেললো।
শাহিদা বেগম কিছু বুঝতে পারলেন না। তাজদার ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তিতলি আর তাসনুভাকে ডাকাডাকি শুরু করে দিল। রওশনআরা এসে বলল,
"ওরা গোসলে গিয়েছে। কি হয়েছে?"
"ঘড়িটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা।"
"শাইনাকে জিজ্ঞেস করেছ?"
তাজদার কোনো জবাব দিল না। রওশনআরা ঘরে এসে শাইনাকে বলল,"ওর ঘড়িটা নাকি খুঁজে পাচ্ছে না?"
শাইনা বলল,"আমি দেখিনি।"
"একটু খুঁজে দেখো।"
শাহিদা বেগম ঘর খালি করে দিয়েছেন। ঘরে শুধু শাইনা আর তিনি। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী ডাকতেই তিনি চলে গেলেন।
ঘরে তখন তাজদার ঢুকলো। শাইনা বালিশের নীচ থেকে ঘড়িটা তুলে বিছানায় ছুঁড়ে মারলো।
তাজদার ঘড়িটা নিয়ে হাতের কব্জিতে পরতে পরতে বলল,"ওটা লুকিয়ে রাখার কোনো রিজন আমি দেখছিনা। বালিশের নিচে আমি আগেই চেক করেছিলাম।"
শাইনার একটাই জবাব,"চুরি করেছি।"
বলেই সে চুপচাপ হেঁটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
_____________
ওয়ালিমার অনুষ্ঠানে শাইনা লেহেঙ্গা পরেছে। ল্যাভেন্ডার পিংক। লেহেঙ্গাটা সবার পছন্দ হয়েছে।
খাবার দাবারের এলাহি আয়োজন। সবাই তাজদার সিদ্দিকীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শাইনার ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলছে সবাই। তিক্তবিরক্ত হয়ে সবার কথা শুনলো শাইনা।
দাদীমা তাকে বোঝালো, পরের ঘর করতে হলে জেদ রাখতে নেই। এটা সেটা। শাইনা শুনলো এককান দিয়ে, বের করে দিল আরেককান দিয়ে।
তাজদার সিদ্দিকী কালো শেরওয়ানি পরেছে। নিজের হাই প্রোফাইলওয়ালা আত্মীয় আর বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়নে ব্যস্ত সে।
অনেক ছবি তোলা হলো। ভিডিও শুট হলো। আইটডোর শুটও হয়েছে। শাইনা রীতিমতো ক্লান্ত বোধ করছিল। কিন্তু তাসনুভার ক্লান্তি নেই। হিসেব করলে দেখা যাবে সে শাইনার চেয়েও বেশি ছবি তুলেছে।
তাজদার সিদ্দিকী তার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে খেয়ে ফেলেছে এক টেবিলে।
শাইনা, তার দুলাভাই আর ভাইরা এক বেঞ্চে বসেছে। তিতলি তৌসিফও এসে বসলো।
খাওয়াদাওয়া সবেমাত্র শুরু হয়েছে। তাজদার সিদ্দিকী তাসমিনের ছেলে সিনানকে নিয়ে আসছিল কথা বলতে বলতে।
সবাইকে হেসে হেসে খাওয়াদাওয়া করতে দেখে সে হঠাৎ থমকে গেল। একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। বিশেষ করে শাইনার দিকে। সে হাসছিল খাওয়ার সময়। আর একমুহূ্র্তও না দাঁড়িয়ে সে চলে গেল সেখান থেকে।
খাওয়াদাওয়া মাঝপথে তখুনি তাসনুভা এসে বলল,"শাইনা তুমি ভাইয়াকে না ডেকে খেতে বসে গেলে কেন?"
শাইনা তার বড় দুলাভাইয়ের পাশে বসেছে। বড় দুলাভাই বললেন,"তাজদার সাহেব তার বন্ধুদের সাথে বসেছেন শুনলাম। কে যেন বললো।"
তাসনুভা রাগত স্বরে বলল,"সবার আক্কেল দেখে আমি অবাক। শাইনা তুমি ওঠো। ভাইয়াকে ডেকে নিয়ে আসো।"
আনিস শান্তভাবে শাইনাকে বলল,"খেয়ে নে। কোথাও যেতে হবেনা।"
তাসনুভা ফের জেদ দেখিয়ে বলল,"শাইনা তুমি ওঠো বলছি। ওঠো।"
আনিস গর্জে বলল,"ও যাবেনা। খাওয়ার পাত থেকে উঠবে কেন? আশ্চর্য!"
তাসনুভা এবার আনিসের দিকে তাকালো।
"আপনার বোনের আক্কেল নেই? তার জেনে নেয়া উচিত ছিল না তার বর খেয়েছে কিনা? খেলেও বরকে নিয়ে খেতে বসতে হয় এটা জানেনা? নিজের লোকজন নিয়ে খেতে বসে গেছে যেন কতদিনের অভুক্ত সবাই। ডিজগাস্টিং!"
আনিস তার দিকে তাকালো ক্ষোভসমেত। তারপর ভাতের পাত থেকে উঠে গেল। তৌসিফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। দৌড়ে গিয়ে হাত ধরে ফেলে বলল,
"আনিস ভাই কেন রাগ করছেন? বসেন। রাগ করবেন না। ওর কথায় রাগ করছেন?"
বলতে বলতে তাসনুভার দিকে তাকালো খেপাটে দৃষ্টিতে। তিতলি রোস্টের গায়ে কামড় দিতে দিতে বলল,"একটু খেতে বসেছি সেখানেও শান্তি নেই।"
আনিস তৌসিফের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। শাইনার দুলাভাইরাও উঠে গেল। সবাই উঠে গেল একেএকে। শুধু শাইনা বসে রইলো। শাহিদা বেগম এসে বলল,
"জামাই খেয়েছে কিনা আগে দেখবিনা? সবাইকে নিয়ে খেতে বসলি অথচ জামাইয়ের খোঁজ করলিনা।"
রওশনআরাও এসে দাঁড়িয়েছেন পেছন। শাইনা বলল,"অত দামী মানুষ আমার সাথে বসে খাবে?"
রওশনআরা বললেন,"আনুষ্ঠানিকতা মানতে হবেনা? তিতলিকে দিয়ে একবার ডাক পাঠালে তো হতো।"
শাইনা উনার দিকে অবাক চোখে তাকালো। তাকে দোষরোপ করছে বড় আম্মুও? তাজদারের খালাম্মারা এসে বলল,
"নিজের বোনের জামাই আর ভাইদের নিয়ে খেতে বসে যেতে আমি আর দেখিনি। আমার আপা দেখেশুনে কি বউ নিয়ে এল আল্লাহ জানে। এসবও শিখিয়ে দিতে হয় মানুষকে? তার বউ তাকে রেখে সবার সাথে বসে ভাত খাচ্ছে হেসে হেসে এটা মানার মতো? তৌসিফেরও আজকে কি হলো? ভাইকে খুঁজলো না কেন সে?"
তৌসিফ বলল,"ভাই তো তার স্যারদের গাড়িতে তুলে দিতে গিয়েছিল। ভাবলাম আর ক্লাবে ফিরবেনা। বাড়ি চলে যাবে। আমি খাইনি তাই শাওনের সাথে বসে গিয়েছিলাম। এত কাহিনী হবে তা তো জানতাম না। শাইনাকেও আমরাই জোর করেছি।"
তাজদারের ফুপুরা বলল,
"দোষ তো বউয়ের। ও জামাই রেখে খেতে বসলো কেন? এতবড় মেয়ের আক্কেল নেই? কচি খুকী তো আনেনি বউ করে। জামাইয়ের সাথে ছবি তুলতে অনীহা, ভাত খেতে অনীহা। দেখতে পাচ্ছি তো সব। বেশি পেয়ে গেলে উগলে দেয় না মানুষ? এই মেয়েরও হয়েছে সেই দশা।"
শাইনা অপমানে কাঁদছিল। আনিস এসে বলল,
"আপনারা সবাই মিলে ওকে দোষারোপ করছেন কেন? ওকে তো তৌসিফ আর তিতলি জোর করায় ও খেতে বসেছে। আমরা তো সবাই ছিলাম।"
তাজদারের ফুপু, খালা, মামীরা একেকজন একেক কথা বলতে লাগলো। কথাগুলো যথেষ্ট কাউকে কাঁদানোর জন্য। এমন কথা কেউ শত্রুকেও বলেনা। তাসনুভা, তাসমিন তে আছেই সাথে। আনোয়ারা বেগমও শাইনার পক্ষে দাঁড়ালেন না। নাতি রাগ করে চলে গিয়েছে ক্লাব থেকে এটা তাদের কাছে অপমানের।
আনিস বলল,"আমার বোনের এতই যখন তখন ওকে আর আপনাদের বাড়িতে দিচ্ছিনা। এই চল।"
বলেই সে শাইনার হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো। শাবরিনকে বলল,"ওকে নিয়ে গাড়িতে ওঠ। এরা সবাই ওকে কথার বানে মেরে ফেলবে।"
রওশনআরা পেছন থেকে বললেন,"আনিস কি করছো? ঝামেলা বাড়িওনা।"
আনিস কথা শুনলো না। সাবিনাকে বলল,"ভাবি গাড়িতে ওঠো।"
সাবিনা শাইনাকে নিয়ে গাড়ির দিকে এগোচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তেজিত। এ ওকে ডাকাডাকি করছে, সে আরেকজনকে ডাকাডাকি করছে। শাহিদা বেগম বললেন,"ও আনিস এভাবে নিয়ে যেতে পারে নাকি? কথা শোন।"
তাসনুভা বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে কান্ডকারখানা দেখছে। বিরক্তির সুরে বলল,"নিয়ে যাক। আমার ভাই মরে যাচ্ছে তাদের বোনের জন্য। যত্তসব!"
শাইনাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছে আনিস। সাবিনাও উঠে বসেছে। তৌসিফ এসে বলল,"আনিস ভাই মেঝ ভাই কিন্তু এতকিছু বলেনি। মহিলারা এতসব রটিয়েছে। আপনি মেঝ ভাইয়ের সাথে কথা না বলে মাথা গরম করছেন।"
আনিস কথা শুনলো না। তেজ শুধু ওদের আছে? জেদ শুধু ওরা দেখাতে পারে? জেদ, তেজ, ঘৃণা তাদের নেই?
গাড়ি ছেড়ে দিল। শেষমুহুর্তে এসে সবাই হাল ছেড়ে দিল। মুরব্বিরা ছিল না নইলে ঘটনা আরও অনেকদূর অব্দি এগোতো।
________
শাইনা নিজের ঘরে চুপচাপ বসেছিল। ক্লাবে কি হচ্ছে সে জানেনা। তার ভয় করছে। মেঝ ভাইয়া সহজে রাগেনা। কিন্তু একবার রাগলে সহজে থামার নয়।
সাবিনা ফোনে একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে কারো সাথে। শাইনা নিজের ঘরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে। শেষমেশ শান্ত হয়ে বসে তিতলিকে ফোন করলো। তিতলি বলল ক্লাবে বাবা কাকাদের মধ্যে কথা হচ্ছে। তর্ক লেগে গেছে। পুরোনো কথা তুলে তর্কবিতর্ক আরও জোরসে লেগেছে।
শাইনা সাবিনাকে ডাকলো। সাবিনা সাড়া দিল না। কিছুক্ষণ পর তার গলার আওয়াজ শোনা গেল।
"জি, শাইনা ঘরে আছে। আসুন না।"
কে এসেছে? কৌতূহলে শাইনা দরজা খুলছিল। তার আগেই দরজা ঠেলে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে পা রাখলো তাজদার!
শাইনা শুকনো ঢোক গিলে ঘুরে দাঁড়ালো। শক্ত কণ্ঠে বলল,
"আমি যাব না। কেউ যেন আমাকে জোরাজোরি না করে। এসব নাটক দেখতে আমার ভালো লাগছেনা। আমি এখানে থাকব। সবাই বাড়ি ফিরুক। ঘরটা খালি করা হোক।"
বলেই লেহেঙ্গা তুলে হেঁটে চলে যাচ্ছিল বাইরে।
তাজদার সিদ্দিকী তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। হকচকিয়ে গেল শাইনা। তাজদারের মুখের দিকে তাকালো। তাজদার রক্তগরম চাহনিতে তাকালো। তারপর তাকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
"আছাড় মেরে তুলো বের করে ফেলবো আর একটা কথা বললে।"
আপনার পছন্দের গল্পের নাম কমেন্টে জানান
Follow Now Our Google News
চলবে ...
১৬ তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরীর গল্প ও উপন্যাস:
লেখক সংক্ষেপ:
তরুণ লেখিকা প্রিয়া ফারনাজ চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি বড়। কল্পনার ভূবনকে শব্দে রুপ দিতে লেখালেখির জগতে তার পদচারণা শুরু হয়েছে ২০২১ সালের মার্চ মাসে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রিমা পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত আছেন অনলাইনভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং পেশায়। ‘প্রিয় বেগম’ উপন্যাসের মাধ্যমে তার পরিচিতি বেড়েছে। ২০২৪ সালের একুশে বইমেলায় তার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে যা পাঠকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। শব্দের জগতে তার পথচলা এখনো চলমান। ভবিষ্যতে আরও পরিপক্ক, আরও বৈচিত্রময় লেখালেখির মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে চান তিনি।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন