উপন্যাস : তাজমহল প্রথম খন্ড
লেখিকা : প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল :
রচনাকাল : ১লা অক্টোবর, ২০২৫ ইং
লেখিকা প্রিমা ফারনাজ চৌধুরীর “তাজমহল - ১ম খন্ড” শিরোনামের এই ধারাবাহিক উপন্যাসটি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ‘কবিয়াল’ পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি পর্ব আকারেই প্রকাশ করা হলো। লেখিকা অনবদ্য এ উপন্যাসটি ২০২৫ সালের ১লা অক্টোবর থেকে লেখা শুরু করেছেন।
![]() |
| তাজমহল || প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী |
তাজমহল || প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী || প্রথম খন্ড (পর্ব - ২৮)
সকালে নানরুটি আর ডাল খেয়েছে তাজদার। অন্যদিন সে খায় না। আজ খেয়েছে। ঝাল ঝাল ডাল দিয়ে নানরুটি ভালো লাগছিল। সবাই একটু অবাকই হয়েছে। তিতলি আরও কয়েকটা দিয়েছিল তার প্লেটে। বড়ো ছিল রুটিগুলো তাই দুটোর বেশি খাওয়া অসম্ভবই ছিল।
তৌসিফ বেশ কৌতূহলী হয়ে দেখছিল তাকে। তাসনুভা আশেপাশেও নেই। সকালের নাশতা করেনি এখনো। তিতলি ডেকেছিল। সাড়া দেয়নি। রওশনআরাকেও রান্নাঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি।
রায়হান আর তৌসিফ রাতে হাসপাতালে গিয়েছিল শাইনাকে দেখতে। তাসনিমের স্বামীও এসেছিল ওইদিক থেকে। হাসপাতালেই অনেক কথা কথা-কাটাকাটি লেগে গিয়েছিল। শাইনার ভাইরা কেউ কিচ্ছু বললো না। তবে সবার মুখভার ছিল। শাইনার দুলাভাইরা যা বলার বলেছে। এতে রায়হানের মাথা হেঁট হয়েছে। মেয়েটা অসুস্থ শরীর নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল কেউ খেয়াল করেনি? বাড়ি ফিরে সে তিতলিকে ইচ্ছেমতো বকেছে। তৌসিফ তাকে সরিয়ে ফেলেছিল ভাগ্যিস।
তাজদারের খাওয়া শেষ হতে না হতেই রায়হান এসে খেতে বসলো। ঝিমলি এসে তাকে খাবার বেড়ে দিতে লাগলো। কক্সবাজার থেকে আসার পর রায়হানের সাথে তাজদারের মুখোমুখি বসে তেমন কথাবার্তা হয়নি। বাড়িতে যা হচ্ছে মনে হচ্ছে কোনো কুরুক্ষেত্র। দাদীমাও এলেন সেখানে। তাঁর ইশারায় রায়হান নিজ থেকে কথা বললো তাজদার চলে যাওয়ার সময়।
"শাইনাকে দেখে আসিস।"
তাজদার তার দিকে ফিরলো। সে জানে কাল রাতে অনেক কিছু হয়েছে দুই বাড়ির মধ্যে। রুম থেকে রায়হানের গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল রাতে। কিন্তু কি নিয়ে কথা হচ্ছিল সেটা সে জানেনা। তাই কপাল কুঁচকে রায়হানের দিকে চেয়ে রইলো।
"বুঝিনি।
রায়হান খাওয়া শুরু করলো। খেতে খেতে বলল,
"শাইনাকে বিজিসি ট্রাস্টে এডমিট করা হয়েছে। জ্বর খারাপের দিকে চলে গিয়েছে। পেটব্যাথা ছিল। ডায়রিয়া, বমি একসাথে। আজ ওকে দেখতে ওদিক থেকে বোধহয় মামারা আসবে। আমি বলেছি দুপুরে এদিক থেকে ভাত যাবে সবার জন্য। ওরা যেন আয়োজন না করে। তৌসিফ বাজারে যা, কাঁচাকলা পেলে নিয়ে আসিস।"
দাদীমা বলল,"হ্যাঁ, এখন কাঁচাকলার তরকারি খেলে একটু পেট ধরবে।"
তৌসিফ খেতে খেতে মাথা দোলালো।
তাজদার কপাল কুঁচকে সবার কথা শুনলো। দাদীমা তাড়া দিয়ে বলল,
"দাদুভাই তুমি গোসল করে নাও। ওকে দেখতে না গেলে কথা রটে যাবে। বউ অসুস্থ দেখতে যেতে তো হবে। এখন রাগারাগি করার সময় নয়। তোমার আরও সবার আগে যাওয়া উচিত ছিল। আর আফসারকে ওই কথাটা বলা উচিত হয়নি। মেয়ে অসুস্থ তারউপর ওই ধরনের কথা নেওয়া একটা বাবার পক্ষে সহজ না। এখন যাও রেডি হয়ে নাও। তুমি গেলে ওরা খুশি হয়ে যাবে। না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।"
তাজদার ঘুরে দাঁড়ালো ঘরে যাওয়ার জন্য। পথিমধ্যে তিতলি তাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো। তাজদার কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকালো। আস্তেধীরে প্রশ্ন করলো,
"ও বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সময় তুমি, নুভা আম্মু কোথায় ছিলে? সারাক্ষণ ফোন নিয়ে এমন কি করো যে দিনদুনিয়ার হিসেব থাকেনা?"
তিতলির পেট মোচড় দিচ্ছে ভয়ে। ভাইয়ের ধারালো শীতল কণ্ঠে তার ভয় আরও বেশি করে বাড়ছে। সে আমতাআমতা করে বলল,
"ও তো শুয়েছিল ঘরে। আমিও ওকে বিরক্ত করিনি। যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছি কোথায় যাচ্ছ। বললো বাড়িতে। আমি বেশি প্রশ্ন করতে পারিনি। ও চলে গিয়েছিল। আম্মুও বললো ঘুরে আসুক।"
তাজদার বিরক্তির সাথে ঘরের দিকে রওনা দিল। তিতলি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
তাজদার ঘরে গিয়ে শাইনার ফোনে কল দিল। রিং পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে রিসিভ হলো। রিসিভ করেছে শাইনার বড় বোন।
"আসসালামু আলাইকুম।"
তাজদার গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
"ওয়ালাইকুমুস সালাম, শাইনা কোথায়?"
"ঘুমোচ্ছে এখন।"
শারমিলা নিজ থেকে আর কিচ্ছু বললো না। তাজদার বলল,"আচ্ছা, ফোন রাখলাম।"
ফোন কেটে দেওয়ার পর শারমিলা শাহিদা বেগমকে বলল,
"এখনো কথা বলছে কেমন গোঁয়ারের মতো।"
শাহিদা চুপ হয়ে আছেন তখন থেকে। মেয়েটা এত অসুস্থ হয়ে গেল ওই বাড়ির কেউ একটু দেখলো না? জামাইটাও না। লন্ডনে গেলে তো....
আফসার সাহেব বাটন ফোনটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এলেন। বললেন,"আমি একদম ধুইয়ে দিয়েছি রায়হানের মা'র ভাইকে। বলেছি তার ভাগ্নে আমার সাথে কিভাবে কথা বলেছে। বলেছি আমার মেয়েকে আমি হাসপাতাল বাড়ি নিয়ে যাব। আমার মেয়ে কি ফেলনা? একটা মেয়ে এতটা অসুস্থ ছিল কেউ একটু স্যালাইন বানিয়েও খাওয়ালো না। মশকরা পেয়েছে? আমার মেয়েটা আমাকে দেখামাত্র কেঁদে উঠলো। আমার আদরের মেয়ে। আমার মেয়েকে কি খাওয়ানোর অভাবে বিয়ে দিয়েছি আমি? রায়হানের মা কেমনে একটু দেখলো না। আমি মাফ দেব না এজন্য।"
শাওন বলল,"এখানে চিল্লিওনা আব্বা। এটা তোমার ঘর নয়। আর ওর সামনে আজেবাজে কথা বলিওনা।"
আফসার সাহেব বললেন,"তুই আমাকে শান্ত হতে বলিস না। আমি ওই ছেলের সাথে কোনো কথা বলবো না। তার মামা চাচাদের সাথে বলবো যা বলার। জিজ্ঞেস করবো তাদের হাতে মেয়ে তুলে দিয়ে কি ভুল করেছি আমি। আমার মেয়ে কেন এত অযত্নে থাকবে? বাড়ি দূরে হলে কি হতো? কাছে বলে সাহস করে চলে এসেছে মেয়েটা।"
শাইনার স্যালাইন চলছে একটার পর একটা। পুরো মড়ার মতো ঘুমিয়ে আছে সে।
আনিস আসছিল দেখে শাহিদা বেগম বলল,"আনিসটার সামনে আজেবাজে কথা বলিওনা তো। ছেলেটার মাথা গরম। কখন কাকে কি বলে ফেলে। আগে আমার মেয়েটা সুস্থ হোক। তারপর বাকি কথা।"
আনিস চা সিঙ্গারা সমুচা এনেছে সাথে আপেল আর মাল্টা। শারমিলাকে বলল,
"তোরা এগুলো খেয়ে নে। ও ঘুম থেকে উঠলে এখান থেকে ফল কেটে দিস। আর দুপুরে মনে হয় ওই বাড়ি থেকে সবার জন্য ভাত আসবে। আমাকে তৌসিফ মানা করেছে ভাত না কিনতে।"
আফসার সাহেব বলে উঠলো,"আমার মেয়েকে না দেখে এখন ভাত পাঠ....
শারমিলা থামিয়ে দিল,"আব্বা কি শুরু করলে?"
আনিস শারমিলাকে বলল,"তাজ কি ফোন-টোন করেছে নাকি এখানে?"
শারমিলা বলল,"হ্যাঁ, শুধু শাইনা কেমন আছে জিজ্ঞেস করেছে আর কিছু বলেনি।"
আনিস চুপ করে রইলো। কিছু বললো না। শারমিলা ভয় পাচ্ছে। কে জানে মুখোমুখি হলে কি ঝামেলা লেগে যায়।
___
তাজদার যখন এল তখন সবাই কেবিনের ভেতর বসে ভাত খাচ্ছিল। শাইনার মুখেও ভাত তুলে দিয়েছে শাহিদা বেগম। তাজদার হুট করে ভেতরে ঢুকে আসামাত্রই সবাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। কেউ বসা থেকে উঠে পড়লো। কেউ মাথায় কাপড় টানলো। শাইনার গায়ে ওড়না ছিল না। শারমিলা তার মাথায় ওড়না দিয়ে দিল বাঁ হাতে। তাজদার বেরিয়ে যাচ্ছিল। শারমিলা বলল,
"ভাইয়া বসেন.. সমস্যা নেই।"
তাজদার ফলমূলের ব্যাগটা একপাশে যত্ন করে রেখে বলল,"ভাত তো আজানের আগে এসেছে। এখন কেন খাচ্ছ? আড়াইটা বাজে এখন।"
শারমিলা হাত ধুয়ে টুল টেনে তাকে বসতে দিতে দিতে বলল,"ও ঘুমিয়েছিল। সবাই একসাথে খাব ভাবছিলাম।"
তাজদার একপলক শাইনার দিকে তাকালো। গায়ে সাদা রঙের একটা ঢিলেঢালা কুর্তা। না আঁচড়ানো চুলে বেণীটা অবিন্যস্ত। চোখের নিচে একগাদা কালি।
শাহিদা বেগম বাসন নিয়ে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছেন। ওখানে খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা আছে যদিও। শাইনা লোকমাটা ধীরেধীরে চিবোচ্ছে। একরাতের মধ্যেই মনে হচ্ছে সে শুকিয়ে এতটুকুনি হয়ে গেছে।
শারমিলাও বেরিয়ে গেল। আফসার সাহেব বললেন,
"এসেছে নাকি?"
শারমিলা বলল,"হ্যাঁ, তুমি এখন যেওনা। ওরা কথা বলুক।"
"আমি দুটো কথা বলবো।"
শাহিদা বেগম বললেন,"আহা এখন না। বাড়াবাড়ি করো না তো।"
শাইনা পিঠের নিচে বালিশ রেখে বসেছে। আরও আরামদায়ক করার জন্য শাহিদা বেগম ওড়নাকে পুঁটলি বেঁধে পিঠের পেছনে রেখেছে।
তাজদার গলা ঝেড়ে কথা শুরু করলো,"এখন কেমন লাগছে?"
শাইনা ডান হাতের ভেতর পুঁটিমাছ ভাজা। সে একটা একটা কামড় দিয়ে খাচ্ছিল ওটা। তাজদার চলে আসায় ওটা হাতের মুঠোয় থেকে গেছে। ওটা কচলাতে কচলাতে মৃদুস্বরে বলল,
"ভালো।"
আর কোনো কথা নেই। শাইনা নিজের মতো বসে আছে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পাশে এমন রোবটের মতো কেউ বসে থাকলে সেটা প্রায় অসম্ভব।
অস্বস্তি সামলে সে এবার তাজদারের দিকে তাকালো। গায়ে মেরুন রঙের শার্ট। কব্জিতে ঘড়ি। টিপটপ গোছগাছ সব দিক থেকে।
তাজদার তাকে তাকাতে দেখে বলল,
"তোমার ফোনটা কোথায়?"
শাইনা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,"আছে।"
"ওখানে আমার নাম্বার নেই?"
"আছে।"
"তাহলে তোমার শরীর খারাপ লাগছে সেটা আগে কাকে বলবে?"
"যাকে বললে সিরিয়াসলি নেবে।"
তাজদার তার দিকে চেয়ে রইলো। চোখমুখ শক্ত হতে যেয়েও হলো না। শাইনা একটুপর তার দিকে তাকালো। জানতে চাইল,
"আপনি এখানে কতক্ষণ থাকবেন?"
তাজদার একটা আপেল বের করলো। সেটা ধুয়ে নিয়ে চাকু দিয়ে কাটতে কাটতে বলল,
"তুমি কতক্ষণ চাও?"
শাইনা তার আপেল কাটার দিকে চেয়ে বলল,"আপনি আপেল কার জন্য কাটছেন?"
"আমার জন্য। আমি ভাত খাইনি। সোজা চলে এসেছি এদিকে।"
শাইনা লজ্জিত হলো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"কোনো দরকার ছিল না, না খেয়ে এখানে আসার।।"
তাজদার আপেলটা কাটা বন্ধ করে বলল,
"সরি, আমি নিজেকে খুব ভালোবাসি। তুমি কি বলো সেটা দেখার জন্য মিথ্যে বললাম। আমি খেয়েদেয়ে এসেছি। রিল্যাক্স!"
শাইনা চুপ করে বসে রইলো। কালকের সব কথা মনে পড়লো। কিভাবে যে সে হেঁটে গিয়েছিল তাদের বাড়িতে সে নিজেও জানেনা।
তাজদার আপেলটা কাটলো। শাইনা কয়েক টুকরো খেল। তাজদার নিজেও খেল। হালকা টুকটাক কথাবার্তা বলে বেরিয়ে গেল। তার মামারা এসেছে। শাইনা মাথায় ভালো করে ঘোমটা টেনে বসেছে। সবাই আসার পথে ফলমূল নিয়ে এসেছে। শাইনার সাথে দেখা করতে এল সবাই। তাজদারকে বলল,
"একরাতের মধ্যে শুকিয়ে গেছে। কাল হয়েছিলটা কি? বাড়িতে কেউ ছিল না?"
আফসার সাহেব সাহস পেয়ে গেলেন। বললেন,
"সেসব কথা বাদ দেন ভাইসাব। আপনার ভাগ্নে আমাকে ফোন দিয়ে কি বলেছে সেটা একবার জিজ্ঞেস করুন সবার সামনে। আমি তো আমার মেয়ে আর দেব না।"
শাইনার বড় মামা আফসার সাহেবকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলল,"আশরাফের বাপ শান্ত হও, এত মেজাজ দেখাতে নেই সব জায়গায়। উনারা কি বলে দেখো।"
তাজদারের বড় মামা বলল,"আমার কথা হচ্ছে মেয়েটার শরীর খারাপ লাগছে এটা বাড়ির কেউ জানলো না এটা তো অবিশ্বাস্য!"
তৌসিফ বলল,"সবাই জানতো ওর জ্বর হয়েছে হালকা। মেঝ ভাইয়ের গায়েও জ্বর এসেছিল।"
তাজদারের বড় মামা বলল,"ওর যখন জ্বর বেড়ে গেল তখন ওর তো তাজদারকে ফোন করা উচিত ছিল। তাই নয় কি? তাজ তোমার বউ তোমাকে ফোন দিয়েছে?"
তাজদার শাইনার দিকে তাকালো। কিছু বললো না। দুজনেই চুপ। আফসার সাহেব বললেন,
"ওর শরীর খারাপ লাগছিল। অতকিছু করার মতো অবস্থায় ছিল নাকি ও? সাহস করে আমাদের কাছে চলে এসেছিল ওটাই তো বেশি। আপনারা কালকে ওর অবস্থা দেখলে বুঝতে পারতেন। ওর মায়ের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করেন...
শাহিদা বেগম বোরকার ওড়না মুখে টেনে কেঁদে উঠে বলল," আমি তো ভাবছিলাম বড় অঘটন ঘটে যাবে.. এত অযত্ন কেউ করে?"
পেছন থেকে একেকজন সান্ত্বনা দিতে লাগলো,
"আশরাফের মা কান্নাকাটি করলে কিছু হবেনা, কথা বলতে দাও। এগুলো সমাধান হয়ে যাওয়া ভালো। বেশি ঘাঁটলে সমস্যা আরও বাড়ে।"
বড়রা সবাই অনেক কথাবার্তা বললো। শাইনা আর তাজদার চুপ করে শুনলো। তাজদার সিদ্দিকী ধৈর্য সহকারে এত কথা শুনেছে দেখেই তৃপ্তি লাগছিল আফসার সাহেবের।
তাজদারের বড় মামা, ছোট মামা তাকে ডেকে নিয়ে গেল একপাশে। বলল,
"তোমার মা আমাকে সবটা বলার পর আমি ছুটতে ছুটতে চলে এসেছি। দেখো মামা রাগ দেখাতে পারবে বউয়ের উপর। তার পরিবারের উপর নয়। তার বাবাকে কি বলেছ সেটা ধরে বসে আছে ওরা। তোমাদের মধ্যে নাকি ঝামেলা হয়েছে তাই তোমার বউ তোমাকে ফোন দেয়নি। বিয়ের শুরুতেই কীসের এত ঝামেলা? পছন্দ করে বিয়ে যখন করেছ তখন শ্বশুরবাড়ির গলাবাজি শুনতে হবে। আর বউটাকে তোমাকেই একটু দেখেশুনে রাখতে হবে। তোমার মা বললো তুমি ওর সাথেও নাকি চেঁচামেচি করো। তুমি লন্ডনে নিয়ে যেতে চাইলে তোমাকে তো আগে ওর ভরসাস্থল হতে হবে। সংসার জীবন আর অবিবাহিত জীবনের মধ্যে ফারাক আছে মামা। তোমার শ্বশুরের কথায় কিছু মনে করো না। আমি ম্যানেজ করে নিচ্ছি আজকের মতো।"
তাজদার রুক্ষ স্বরে বলল,"ওরা বললেই হলো নাকি? কথায় কথায় মেয়ে দেবেনা ভয় দেখায় কেন? না দিয়ে দেখাক। বিয়ে দিয়ে দিয়েছে এখন আবার এত দেমাক কীসের? তাদের মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে সেটা আমি জেনে কথা শুনিয়েছি?"
সবাই তাকে দেখছে দূর থেকে।
শাহিদা বেগম ফিসফিস করে বললেন,"ব্যাটা তো দেখছি মামুর উপর রাগ ঝাড়ছে। কতবড় গলা! এই আশরাফের বাপ তুমি ওদিকে যেওনা।"
বড়মামা শান্তভাবে বললেন,
"তুমি আবার রেগে যাচ্ছ তাজ। বারবার করে বলছি রাগবে না। তোমার বউ একটা বাচ্চা মেয়ে। ওকে যে যেরকম বোঝাবে সে সেটাই বুঝবে। তুমি যা বোঝাবে সে সেটাই বুঝবে। ওর সংসারধর্ম বুঝতে আরও সময় লাগবে। তুমিও যদি অবুঝের মতো আচরণ করো তাহলে তো কিছু করার নেই আমাদের।"
তাজদার সাফ সাফ জানিয়ে দিল,"আমি ওকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। স্যালাইন শেষ হয়েছে। বাকি চিকিৎসা ওখানে হবে। ওদের মাথা খারাপ হবেই কারণ এই হসপিটালের খরচ অনেক বেশি। ওদের বলে দাও খরচটা আমি দেব। আর যেন প্যানপ্যান না করে।"
"আনিস মানা করেছে আমাকে তুমি যেন একটা টাকাও না দাও।"
তাজদার রাগে কাঁপছে ভেতরে ভেতরে। আফসার সাহেব তার সিদ্ধান্তে অনঢ়। তিনি রওশনআরা আর তাজউদ্দীন সিদ্দিকীর সাথে কথা না বলে মেয়ে এত সহজে ছাড়বেনা।
সন্ধ্যায় শাইনাকে নামিয়ে দেয়া হলো। বাড়ি ফিরে শাইনা উঠোনে তাজদারকে দেখলো তৌসিফের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলতে। ওই বাড়িতে অনেক মেহমান এসেছে। শাইনা তাজদারের দিকে একপলক তাকিয়ে বাপ ভাইদের সাথে বাড়ি চলে গেল।
রাতে সবাই ছোটখাটো পারিবারিক বৈঠক বসলো। তাজদার তখন একটা কাজে বেরিয়েছিল।
কখন কি হয়েছে কি হয়নি বৈঠকে সব উঠছে একের পর এক। শাইনার এইসব তামাশা ভালো লাগছেনা। সে রুমে শুয়ে আছে। শাহিদা বেগম এসে বলল,
"ওরা বলছে তুই নাকি কারো সাথেই ভালো করে কথাবার্তা বলিস না। একঘরে হয়ে থাকিস। তোর অসুখ লাগছে এটাও নাকি জানাসনি। তোর চাচী শ্বাশুড়ি বলছে তুই নাকি মুখ ফুলিয়ে রাখিস। কারো সাথে মিশিশ না। জামাইয়ের সামনে ঝগড়া করিস সারাক্ষণ। এইসব সত্যি?"
শাইনা চুপ করে শুয়ে থাকলো। শাহিদা বেগম বলল,
"বিয়ের মাত্র ক'টাদিন গিয়েছে তারমধ্যেই এইসব। মানুষে কি বলবে? আগে তো তুই এমন ছিলি না। বিয়ের আগে একরকম ছিলি এখন অন্য রকম হয়ে গেছিস। সবাই ওটা বলবে না?"
আফসার সাহেব এসে বলল,"ওকে কিছু বলবে না। ও এখানেই থাকবে। বিয়ের একমাসও ভালো করে যায়নি তারমধ্যে বিচারসভা কুড়াচ্ছে আমার মেয়ের নামে। আমার মেয়ে ভালো না খারাপ সেটা আমি জানিনা? দেব না আমি মেয়ে। ওই ছেলে কথা শুনিয়েছে এখন আবার ওরা সবাই মিলে শোনাচ্ছে। সবাই পেয়েছেটা কি? আমাকে এত কথা শুনিয়েছে। আমার মেয়েকে কতগুলো শুনিয়েছে?"
শাইনা শোয়া থেকে উঠে বসলো। আফসার সাহেবকে বলল,"তোমাদের কে বলেছে এইসব বৈঠক করার জন্য? আমি তোমাদের কিছু বলেছি? তোমরা বৈঠক কুড়িয়েছ তাই ওরা দোষ বোঝাচ্ছে। আমি ওই বাড়িতেও যাব না। এখানেও থাকতে চাই না। আমাকে কোথাও রেখে আসো। এইসব জঞ্জাল আমার ভালো লাগছেনা।"
আফসার সাহেব বলল,"ওই ছেলে বললো তুই যেন ওই বাড়ির চৌকাঠে পাও না মাড়াস। কতবড় কথা! এখন আর কিছু না পেয়ে তোর দোষ খুঁজছে। তুই একদম ওই বাড়িতে যাবিনা। থাক এখানে। আশরাফের মা ওকে বিরক্ত করবানা।"
শাইনা ভাত খাওয়ার পর ঔষধ খেল। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লো দাদীমার পাশে। দাদীমা তাকে জড়িয়ে ধরতেই শাইনা হঠাৎ চমকে উঠলো। দাদীমা হেসে উঠলেন,
"হাত শক্ত নয় বলে চমকালি নাকি? ব্যাটা এমন টেমন করে জড়াইয়া ধরতো?"
শাইনা বলল,"তুমি সবসময় রসিকতা করবানা। আমার মন মেজাজ ভালো নেই।"
"বুঝি বুঝি।"
"মাথা বোঝো। আমার শরীর খারাপ। ঘুমাতে দাও।"
"ওই বাড়িতে মনে হচ্ছে তুফান চলতেছে।"
শাইনা প্রশ্ন করলো,"কেন?"
"ওমা বউ নাই তাই।"
শাইনা প্রশ্ন করলো,"তোমার কি ওই লোকটাকে বউপাগল মনে হয়?"
"মনে হয়।"
________
"ওই বাড়িতে সবাই গিয়েছে কি কারণে? কে বলেছে বৈঠক করতে? তোমাদের সো কল্ড বৈঠকের মিনিং কি আমি জানিনা? পাড়ার মাসিপিসিদের মতো ওই খোঁচাখুঁচি, আর এরওর দোষ খুঁজে বের করা। বাড়ির মধ্যে নিজেদের ছেলের দোষ ধরছো ভালো কথা। আবার ওই বাড়িতে গিয়েছ ওদের মেয়ের দোষ ধরতে? আমি তোমাদের বলেছি যেতে? কে বলেছে তোমাদের সবাইকে ওখানে গিয়ে একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে আসতে?"
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী শান্তভাবে বললেন,"ঝামেলা তুমি বাঁধিয়েছ। তুমিই বলেছ ওই বাড়ির মেয়ে যেন এই বাড়ির চৌকাঠ না মাড়ায়। আমাদের মুখ কোথায় থাকলো আর? তাই আমাদের যা বলার প্রয়োজন ছিল তাই তাই বলেছি। দোষ তো তোমার।"
তাজদার রাগে কথা বলতে পারছেনা। সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
"দোষ আমার। আমি ম্যানেজ করে নিতাম। তোমাদের কে বলেছে ওখানে গিয়ে কথা শুনিয়ে আসার? সমস্যাটা কি তোমাদের? এই এরা এইসব করছে তুই আমাকে জানালিনা কেন?"
শেষের কথাটা তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললো তাজদার। তৌসিফ বলল,
"আমি তো কথা কাটাকাটি তীব্র হওয়ার পর গিয়েছি। কিছু জানতাম না।"
তাজদার কর্কশ স্বরে বলল,
"এবার সবাই যেভাবে পারো সেভাবে ওকে নিয়ে এসো। আমি আর একটা কথাও বলবো না এখানে।"
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বললেন,"না এলে আমাদের কি? না আসুক। এত তেল দিতে পারব না। ঘাড় মোটা করে দিয়েছ ওদের মেয়েকে বিয়ে করে। নইলে ওরা কোনোদিন আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে কথা বলতে পেরেছে? ওদের মেয়ে এখানে না এলে আমাদের কিছু যায় আসবে না। এইসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাবো না। এই খেতে দাও তো । এইসব আর ভালো লাগছেনা।"
তাজদার চলে যাচ্ছিল। কথাটা শুনে থেমে গেল। রাগে সে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছেনা। রওশনআরার দিকে তাকালো। রওশনআরা চুপচাপ চলে যেতে লাগলেন। তাজদার উনাকে থামিয়ে বলল,
"আমি ওকে আনতে যাব না। তোমরা সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছ। তাই তোমরা আনতে যাবে। কালকের মধ্যেই এইসব সমাধান না করলে আমি এই বাড়িকে লাথি মেরে চলে যাব। আমার কথাই শেষ।"
কেউ পাত্তা দিল না তার কথাটাকে। তাজদার ঘরে গিয়ে ব্লেজারটা ছুঁড়ে বিছানায় বসে দুহাত দিয়ে মুখ মুছলো। শাইনার ফোনে কল দিল। রিসিভ হয়ে গেল সাথে সাথেই। তাজদার নিজ থেকে ফোনটা কেটে দিল। সাথে সাথে রিসিভ হওয়ার ব্যাপারটা অতি আশ্চর্যের!
আপনার পছন্দের গল্পের নাম কমেন্টে জানান
Follow Now Our Google News
চলবে ...
২৯তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন
প্রিমা ফারনাজ চৌধুরীর গল্প ও উপন্যাস:
লেখক সংক্ষেপ:
তরুণ লেখিকা প্রিয়া ফারনাজ চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি বড়। কল্পনার ভূবনকে শব্দে রুপ দিতে লেখালেখির জগতে তার পদচারণা শুরু হয়েছে ২০২১ সালের মার্চ মাসে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রিমা পড়াশোনার পাশাপাশি যুক্ত আছেন অনলাইনভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং পেশায়। ‘প্রিয় বেগম’ উপন্যাসের মাধ্যমে তার পরিচিতি বেড়েছে। ২০২৪ সালের একুশে বইমেলায় তার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে যা পাঠকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। শব্দের জগতে তার পথচলা এখনো চলমান। ভবিষ্যতে আরও পরিপক্ক, আরও বৈচিত্রময় লেখালেখির মাধ্যমে পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে চান তিনি।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন