মুক্তমত : ইতিহাসের ছায়ায় তারেক রহমান, ১৯৭১-এর উত্তাল স্মৃতি ও পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক
লেখক : আব্বাস নাসির
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং
রচনাকাল :
ইতিহাস কখনও কেবল রাষ্ট্রের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় তা একটি পরিবারের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়-ব্যক্তিগত স্মৃতি, বেদনা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে যায় বৃহত্তর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পাকিস্তান–বাংলাদেশ সম্পর্কের সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়কে ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছেন পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডন-এর সাবেক সম্পাদক ও কলামনিস্ট আব্বাস নাসির। বিশ্লেষণধর্মী এ লেখায় আব্বাস নাসির তুলে ধরেছেন ইতিহাস ও বর্তমান রাজনীতির এক জটিল ছায়াপথ—যেখানে পাশাপাশি অবস্থান করছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ব্যক্তিগত পারিবারিক অভিজ্ঞতা, এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তিনি স্পষ্ট করেন, ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত ইতিহাস, ব্যক্তিগত স্মৃতির ভার এবং বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস-এই তিন ধারার সংযোগস্থলেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের পাকিস্তান–বাংলাদেশ সম্পর্ক। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা এবং সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রভাবশালী কলামনিস্ট আব্বাস নাসির স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে অতীতের ঘটনাপ্রবাহ এখনো দুই দেশের রাজনীতি ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলছে, আবার একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য নতুন সমঝোতার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
ইতিহাসের ছায়ায় তারেক রহমান, ১৯৭১-এর উত্তাল স্মৃতি ও পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক || আব্বাস নাসির
কলামের সূচনাতেই আব্বাস নাসির উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতা তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে এসেছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন—এমন আলোচনা রাজনৈতিক মহলে জোরালো হয়ে উঠেছে।
এর বিপরীতে লেখক তুলে ধরেন আরেকটি বাস্তবতা। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটই লেখককে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে প্ররোচিত করেছে।
আব্বাস নাসির তার লেখায় ফিরে যান ১৯৭১ সালের উত্তাল সময়ে। সে সময় তার বোনের স্বামী ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক তরুণ ক্যাপ্টেন, যিনি চট্টগ্রাম বন্দরের এমবারকেশন হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ছিলেন। একই সময়ে চট্টগ্রামেই দায়িত্ব পালন করছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান, যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন।
লেখক বর্ণনা করেন, মার্চ ১৯৭১-এ অস্ত্রবোঝাই জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ ঘিরে বিদ্রোহ ও তীব্র গোলাগুলির মধ্যে কীভাবে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করেন তার ভগ্নিপতি। সেই সংঘর্ষে পরিবারের সদস্যরা দিনের পর দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। পরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর সহায়তায় তারা উদ্ধার পান।
এই স্মৃতিচারণায় উঠে আসে এক গভীর মানবিক দৃশ্য। লেখকের অন্তঃসত্ত্বা বোন করাচিতে ফিরে আসছেন যার কাঁধে ঝোলানো ৯ এমএম পিস্তল। আব্বাস নাসির লেখেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধে ধর্ষণ, নির্যাতন ও অঙ্গচ্ছেদ ছিল পরিকল্পিতভাবে ব্যবহৃত অস্ত্র। আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই তার বোনকে অস্ত্র চালানো শিখতে হয়েছিল। এই বর্ণনা কেবল একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা নয়; বরং যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতার এক নির্মম দলিল।
কলামে উঠে আসে আরও কয়েকটি বিস্ময়কর ঐতিহাসিক সমাপতন-১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড,পরবর্তীতে চট্টগ্রামেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৭৯ সালে লেখকের ভগ্নিপতির আকস্মিক মৃত্যু, যেদিন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর হয়। এই ঘটনাগুলো আব্বাস নাসির দেখেছেন খুব কাছ থেকে-একই সঙ্গে ইতিহাসের সাক্ষী এবং ব্যক্তিগতভাবে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত একজন মানুষ হিসেবে।
লেখার শেষভাগে আব্বাস নাসির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহারে পৌঁছান। তিনি লেখেন, ১৯৭১ ছিল আরেকটি দেশ, আরেকটি সময়। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে অনেক ক্ষত শুকিয়েছে, অনেক বিদ্বেষ ঝরে গেছে।
তার মতে, তারেক রহমান যদি সত্যিই বাংলাদেশের নেতৃত্বে আসেন, তাহলে তিনি পাকিস্তানের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে পারেন। আর সেই হাত, লেখকের ভাষায়-‘গ্রহণ করা উচিত-দৃঢ়ভাবে।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আব্বাস নাসির কেবল রাজনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলেননি; বরং ইতিহাসের ভার বহন করেও ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি নৈতিক আহ্বান জানিয়েছেন।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
লেখক সংক্ষেপ:
আব্বাস নাসির (Abbas Nasir) হলেন একজন প্রখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক, যিনি ডন (Dawn) পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক এবং বিবিসি এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের এক্সিকিউটিভ এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন; তিনি বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে (যেমন আল জাজিরা, দ্য ওয়ার) কলামিস্ট ও বিশ্লেষক হিসেবে লিখছেন, যেখানে তিনি পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং সাময়িক ঘটনাবলী নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করেন।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন