মুক্তমত : জামায়াত জোটে এনসিপি: আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পাঠ
লেখক : সিরাজুল ইসলাম
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইং
রচনাকাল :
![]() |
| জামায়াত জোটে এনসিপি: আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পাঠ || সিরাজুল ইসলাম |
জামায়াত জোটে এনসিপি: আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক পাঠ || সিরাজুল ইসলাম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে রাজনৈতিক স্বপ্ন, আশা আর পরিবর্তনের ভাষা তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিল নতুন দল এনসিপি। পুরোনো রাজনীতির বৃত্ত ভাঙার প্রতিশ্রুতি, আদর্শিক সাহস আর তরুণ নেতৃত্ব— এই তিনটি বিষয় এনসিপিকে আলাদা করেছিল। বিশেষ করে তরুণ নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি দলটিকে দিয়েছিল ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্ত সেই পরিচয়কে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় একের পর এক নারী নেত্রীর পদত্যাগ, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো কিংবা নিষ্ক্রিয় হওয়ার ঘোষণা এনসিপির জন্য শুধু সাংগঠনিক ধাক্কা নয়, বরং আদর্শিক পতনের স্পষ্ট বার্তা।
তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের এনসিপি থেকে পদত্যাগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো, নুসরাত তাবাসসুমের নির্বাচনী কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিনের প্রকাশ্য মন্তব্য, যেখানে তিনি জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতাকে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ বলেছেন— সব মিলিয়ে এটি একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রতিবাদ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এরা সবাই জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা মুখ।
অর্থাৎ যাদের কাঁধে ভর করেই এনসিপি নিজেকে ‘নতুন রাজনীতি’র বাহক হিসেবে তুলে ধরেছিল, তারাই আজ দলটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এই অবস্থানের পেছনে মূল প্রশ্নটি আদর্শিক। জুলাই আন্দোলনের সময় যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছিল, সেখানে জামায়াতবিরোধিতা ছিল একটি বড় অংশ। শুধু অতীতের ভূমিকার জন্য নয়, বরং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, নারী প্রশ্ন, সংখ্যালঘু অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান তরুণ আন্দোলনকারীদের বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
সেই বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন মানে ছিল নিজের শেকড়ের সঙ্গেই আপস করা। এই আপস যে দলটির ভেতরে ভয়াবহ বিভাজন তৈরি করবে, তা বোঝার জন্য খুব গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন ছিল না। এনসিপির সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেছিল, এই দলটি পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো করে রাজনীতি করবে। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মধ্য দিয়ে সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে। এখন সমালোচকরা বলছেন, এই জোটের ফলে এনসিপি আর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
নির্বাচন, আসন বণ্টন, প্রচারণা— সব ক্ষেত্রেই বড় শরিকের চাপ থাকবে। অর্থাৎ এনসিপি কার্যত একটি সহায়ক শক্তিতে পরিণত হবে, প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন তারা দেখিয়েছিল, তা কাগুজে স্বপ্নে পরিণত হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এনসিপির জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। নতুন দল হিসেবে এই নির্বাচনে তাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি ছিল নৈতিক অবস্থান ও তরুণদের আস্থা। কিন্তু জামায়াত জোট সেই পুঁজিকেই ক্ষয় করে দিয়েছে। যে তরুণরা পরিবর্তনের আশায় রাজপথে নেমেছিল, তারা এখন প্রশ্ন করছে— এই পরিবর্তন কি শুধু ক্ষমতার অঙ্ক বদলের জন্য ছিল? নাকি আদর্শের জায়গায় আপস করাই ছিল শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য?
এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে— এই দল কি নিজের রাজনৈতিক মৃত্যু নিজেই ডেকে আনলো? যখন দলের ভেতরের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক কণ্ঠগুলো একে একে সরে যাচ্ছে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না, দলটির সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করে। রাজনীতিতে দল ভাঙে, জোট বদলায়— এগুলো নতুন কিছু নয়। কিন্তু যে দল নিজেকে ‘নতুন রাজনীতি’র প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, তার জন্য আদর্শিক বিচ্যুতি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
এনসিপির এই সংকটের সঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে— এলডিপি নেতা কর্নেল অলি আহমদের জামায়াত জোটে যোগ দেয়া। অলি আহমদের রাজনৈতিক অতীত মনে করলে এই সিদ্ধান্ত বিস্ময়করই বলতে হয়। একসময় তিনি জামায়াত জোটে থাকা নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন, প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছিলেন। সেই বিরোধিতার এক পর্যায়ে ২০০৬ সালে তিনি বিএনপি থেকে বের হয়ে নিজেই এলডিপি গঠন করেন। সেই অলি আহমদই আজ সব আপত্তি, সব অবস্থান ভুলে জামায়াত জোটে যোগ দিলেন।
এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন নিছক রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে। অলি আহমদের রাজনীতিতে এটি নতুন নয়। অতীতেও তিনি নিজের সংসদীয় আসন ও রাজনৈতিক সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, এমন অভিযোগ রয়েছে। এবারও সেই অভিযোগ আরও স্পষ্ট হলো। জামায়াত প্রার্থীকে আসন ছাড়তে না চাওয়ার যে অবস্থান একসময় তিনি নিয়েছিলেন, সেটি আদর্শের প্রশ্ন ছিল বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে তা ছিল নিজের স্বার্থ রক্ষার কৌশল। আর এবার জামায়াত জোটে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, আদর্শ নয়— নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই তার কাছে মুখ্য। মুখে শুধু তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, জামায়াত-বিরোধিতা করেন কিন্তু স্বার্থের বেলায় সব আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের কথা বিলিন হয়ে গেল।
এই দুই ঘটনা— এনসিপির ভেতরের ভাঙন এবং অলি আহমদের জামায়াত জোটে যোগ একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ প্রায়ই ক্ষমতার অঙ্কের কাছে হার মানে। নতুন দল হোক বা পুরোনো নেতা, শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয় নির্বাচনী হিসাব আর ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে। কিন্তু যে রাজনীতি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়, তার জন্য এই বাস্তবতা সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এনসিপির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো সংবেদনশীল। কারণ, এই দলটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না, এটি ছিল জুলাই আন্দোলনের প্রতীক। সেই প্রতীক ভেঙে পড়লে শুধু একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবিষ্যতের যেকোনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা। তরুণরা তখন ভাববে— নতুন দল মানেই কি শেষ পর্যন্ত পুরোনো সমঝোতা?
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন এনসিপির জন্য কৌশলগত লাভ বয়ে আনতে পারে, কিন্তু আদর্শিক ক্ষতি এরইমধ্যে স্পষ্ট। নারী নেত্রীদের সরে যাওয়া সেই ক্ষতির সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র। আর অলি আহমদের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের অবস্থান বদল দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ নয়, স্বার্থই এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় এনসিপি যদি নিজেদের পথ বদলাতে না পারে, তাহলে জুলাইয়ের যে স্বপ্ন তারা দেখিয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যাবে।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
লেখক সংক্ষেপ:
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন