![]() |
| খালেদা জিয়া: দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু ও কিছু কথা || সুষুপ্ত পাঠক |
খালেদা জিয়া: দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু ও কিছু কথা || সুষুপ্ত পাঠক
খালেদা জিয়া চলে গেলেন। প্রসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন তিনি। তার মৃত্যুদিন নিয়ে চিরকাল এদেশে সন্দেহের চোখে দেখা হবে। মুঘলরা উত্তরাধিকারীদের চোখ অন্ধ করে দিতো। ইসলাম মতে অন্ধলোক দেশের শাসক হতে পারবে না। কাজেই মুঘলদের ইতিহাস ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের চোখ হারানো। তারেক জিয়াকে অনেক শর্ত মেনে দেশে আসতে হয়েছে। কবে খালেদা জিয়া মারা যাবেন, তার জানাজা কবে হবে- সেটি গেইম মেকাররা ঠিক করেছে। অতীতের গেইম মেকাররা যেমন ঠিক করেছিল ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হবার দিনটি হোক একটি জন্মদিনের আনন্দ উত্সব! এদেশের এন্টি-মুক্তিযুদ্ধ, পরাজিত শক্তি, এন্টি-আওয়ামী লীগারদের জন্য ১৫ আগস্ট ‘নাজাত দিবস’। ফলে সেই দিন যদি খালেদা জিয়া জন্মদিন পালন করে তাহলে সেই সমর্থকগোষ্ঠিরা পৈশাচিক আনন্দ লাভ করবে। ১৫ আগস্টের দিন ৩২ নম্বরে সাইন্ড বক্সে লুঙ্গি ড্রান্স গানের সঙ্গে উদ্দাম নৃত্য দেশের সেই বিভাজনের নগ্ন হস্তক্ষেপ।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঠিক নামাজকালাম পড়া নারী ছিলেন না। হুজুরদের ভাষায় পর্দা বলতে যা বুঝায় তিনি সেটি করতেন না। তবু তিনি এদেশের ইসলামিক গোষ্ঠির কাছে প্রিয় ছিলেন। এটিও তার বিশেষ কোন যোগ্যতা ছিল না। ফাতেমা জিন্নাহ যখন নির্বাচন করলেন তখন পুরো পাকিস্তানের আলেমরা তাকে সমর্থন জানালো। আলেমরা ফতোয়া দিলো, বড় পাপকে রুখতে গিয়ে ছোট পাপ জায়েজ আছে। বড় পাপ হচ্ছে আইয়ুব খান যিনি মুসলিম পার্সনাল ল’ সংস্কার করেছিলেন। আলেম ওলামাদের তাই আইয়ুবের প্রতি ক্ষোভ ছিল, তাকে ইসলামের দুশমন আখ্যা দিয়েছিল। তাই ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম জেনেও আলেমরা ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন করেছিল যেন আইয়ুবের পরাজয় ঘটে। হুজুরদের খালেদা জিয়াকে সমর্থনও ছিল যেন মুজিব কন্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়।
খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার যে ধারাবাহিকতা ছিল সেটাই ধরে রেখেছিলেন। তার শাসনকালেও পাকিস্তানকে সরকারী গণমাধ্যমে স্রেফ ‘হানাদার বাহিনী’ বলা হতো, পাকিস্তান শব্দট উহ্য রাখা হতো। মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিব বলতে যে একজন আছেন সেটি স্বীকার করা হয়নি। জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান না করে শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করা কি মুজিবের প্রতি জিয়ার ক্ষোভ ছিল? সেই একই ক্ষোভ খালেদা জিয়ারও ছিল? সামান্য একটি ঘটনার জন্য তো খালেদা জিয়া চিহ্নিত রাজাকার আল বদরদের মন্ত্রী বানাতে পারেন না? আসলে এখানেও রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ এই পেক্ষাপটের আগে ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে জনমর্থন তা ছিল পুরো বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন। সাড়ে তিন বছরের মুজিব শাসন ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে ম্যাজিক্যাল একটি শাসন ও সফল একটি সরকার। কিভাবে? কারণ ব্যাংকে একটি টাকাও নেই। সব পুড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। দেশের কোন ব্রিজ রাস্তা অক্ষত ছিল না। আন্তর্জাতিক দাতা শক্তি ছিল বাংলাদেশ বিরোধী। বাংলাদেশের কাছ থেকে কেউ কিছু কিনবে না সেরকম অঘোষিত আন্তর্জাতিক নির্দেশ ছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, অর্থনীতি শূন্য, সেই অবস্থা থেকে একটি দেশ নতুন করে গঠন করাকে কি আপনি বাংলাদেশের অন্য কোন শাসনকে তুলনা করে এগিয়ে রাখতে পারবেন? ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যাবার সময়ও ভারত ছিল অক্ষত। কিন্তু পাকিস্তানরা পূর্ব বাংলা ছেড়ে যাবার আগে সব ধ্বংস করে গিয়েছিল। ৭৫ সালে বাংলাদেশে একটি রাস্তাও পাওয়া যায়নি যা ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ১৩২টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করা গেছে।... যাক এটি বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে লেখার সময় নয়। বলছিলাম খালেদা জিয়ার কথা...
মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনকে যদি বলি চরম ব্যর্থ তবু সে কারণেই কি করে বিএনপির মত একটি সেনা ছাউনি থেকে জন্মানো দল দেশের অর্ধেক মানুষের দল হয়ে উঠল? কারণ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া ও পাকিস্তান ভাঙার পর আওয়ামী লীগের এন্টি ভোট এখানে তৈরি হয়েছিল অটোমেটিক। তাদের ভোট পেতে তাই খালেদা জিয়াকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যেতে হয়েছে। তাকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বলতে হয়েছে। কোন জাতীয় পর্যায়ে তার মত নেত্রীকে বলতে শুনেছি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে কুরবান থাকবে না, মসজিদে উলো ধ্বনি হবে, ভারত দখল করে নিবে...।
খালেদা জিয়া তবু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকবেন। ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকার জন্য। কিন্তু ২০০১ সালের পর খালেদা জিয়া পুত্র তারেক জিয়াকে রীতিমত রাজতন্ত্রের মত উত্তরাধিকার মনে করলেন। ১৭ বছর আগের তারেক সম্পর্কে আমরা জানি পাকিস্তানের আইএসআই ঘনিষ্ঠ। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল সেই আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। বলতে গেলে সেদিনই বাংলাদেশের কপালে স্থায়ীভাবে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলো। তারেক জিয়াকে মুচলেকা দিয়ে রাজনীতি ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিতে হলো। মাইনাস টু বাস্তবায়নে সুশীল চক্র প্রথম অরাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পক্ষাপত করতে কেএস হাসানকে প্রধান বিচারপতি বানানোর পরই প্রকৃত অর্থে নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে জালিয়াতির শুরু। এরপর হাসিনার ১৭ বছর ছিল এর ধারাবাহিকতা। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রেনেড মেরে হত্যা করা, ভারতের বিচ্ছন্নতাবাদীদের জন্য অস্ত্র খালাস করা- বাংলাদেশের রাজনীতিতে অশুভ ছায়া এনে ফেলেছিল খালেদা জিয়ার শাসনেই।
খালেদা জিয়া হতে পারতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষ শক্তির আরেকটি বিকল্প। তিনি মোল্লাদের সামনে কোমড় বাঁকা করে দাঁড়াতেন না। পা তুলে বসতেন। কিন্তু ধর্মের কার্ড খেলে গেছেন অবিরাম। তা কেন না এদেশে তা খেলেছে? মুজিবও খেলেছেন। মদ নিষিদ্ধ ছিল সেরকম একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। জিয়া, এরশাদ, হাসিনা সবাই ধর্মের কার্ড খেলেছে।
আজ তিনি সব কিছুর উর্ধে। এইভাবে সবাই একদিন সব কিছুর উর্ধে চলে যাবো। এখনো শেখ হাসিনা জীবিত এটি আমাদের কাছে স্বস্তির কারণ। শেখ হাসিনা কেবল তার দলের জন্য না, বাংলাদেশের কান্ডারী হতে হবে। সেটি করতে গেলে অতীতের সব রাগ ক্ষোভ ভুলে যেতে হবে। এটা শুরু হতে পারে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে শেখ হাসিনার শোক প্রকাশের মাধ্যমে। আপাতত বিএনপি আওয়ামী লীগের শত্রু না। বিএনপি তথা তারেক জিয়াকে মানতে হবে আওয়ামী লীগ তাদের শত্রু না। পৃথিবীতে সব দেশেই দুটি প্রধান দল থাকে। সেসব দেশে কোন প্রথম আলোর মত দালাল এজেন্ট মিডিয়া থাকে না যারা ‘বিকল্প দল’ নেতৃত্বের ষড়যন্ত্র করে। এটি করতে গেলে কতবড় নৈরাজ্য শুরু হয় সেটি জনগণ আশা করি বুঝেছে। কাজেই খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরবর্তী আমি মনে করি আওয়ামী লীগ বিএনপির শত্রু নয়, দেশের জন্য তারা দুটি দলই কান্ডারী এই রকম মনোভাব আনতে হবে। আমরা সেটিই দেখতে চাই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন