![]() |
| স্বাধীনতার প্রশ্নে গণমাধ্যম || মো. কামরুল ইসলাম |
স্বাধীনতার প্রশ্নে গণমাধ্যম || মো. কামরুল ইসলাম
প্রতি বছর মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন, কতটা দায়বদ্ধ এবং কতটা নিরাপদ?
গণতান্ত্রিক সমাজে মুক্ত গণমাধ্যম কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মতপ্রকাশের সেতুবন্ধন। দিনটি শুধু সাংবাদিকদের জন্য প্রতীকী কোনো উদযাপন নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের পরিবেশ মূল্যায়নের দিন।
গণমাধ্যমকে সাধারণত রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে গণমাধ্যম এমন একটি শক্তি, যা রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নজরদারি করে, দুর্নীতি ও অনিয়ম উন্মোচন করে, নাগরিকের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে এবং জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম এখন বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে।
আজকের পৃথিবীতে সংবাদমাধ্যম এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় পরদিনের সংবাদপত্রের জন্য মানুষ অপেক্ষা করতো এখন একটি স্মার্টফোন হাতে থাকলেই মুহূর্তে সংবাদ পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তথ্যপ্রবাহের এই গতি যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি নতুন সংকটও তৈরি করেছে।
মুক্ত গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার ভারসাম্য রক্ষা করা সবসময় সহজ নয়। রাষ্ট্র প্রায়ই জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা বা আইনশৃঙ্খলার যুক্তি দেখিয়ে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম মনে করে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ জনস্বার্থবিরোধী এবং স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত করে।
এই টানাপোড়েন নতুন নয়, তবে ডিজিটাল যুগে তা আরও জটিল হয়েছে। কারণ এখন তথ্য নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু সংবাদপত্র বা টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিকল্প তথ্যপ্রবাহকেও প্রভাবিত করা।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো, তথ্যের প্রাচুর্যের ভেতর সত্যের সংকট। আজ তথ্যের অভাব নেই; বরং অতিরিক্ত তথ্যের ভিড়ে সত্যকে শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত ব্লগ, অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার—সব মিলিয়ে গুজব, অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এখন জনপরিসরের বড় হুমকি।
এই বাস্তবতায় মূলধারার সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সংবাদ প্রকাশের গতি বাড়লেও সাংবাদিকতার মূলনীতি বদলায়নি—সত্যতা, নিরপেক্ষতা, ভারসাম্য ও জনস্বার্থ।
বাস্তবতা হলো, ‘সবার আগে’ সংবাদ দেওয়ার প্রতিযোগিতা, ক্লিকনির্ভর আয়, রাজনৈতিক চাপ, কর্পোরেট স্বার্থ এবং ডিজিটাল অ্যালগরিদমের প্রভাব অনেক সময় সাংবাদিকতার নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
ক্লিকভিত্তিক আয় মডেল নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনেক সংবাদমাধ্যম পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম, অতিরঞ্জিত কনটেন্ট বা চাঞ্চল্যকর উপস্থাপনার দিকে ঝুঁকছে। এতে সাংবাদিকতার মূল দর্শন—সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থ—কখনো কখনো আড়ালে পড়ে যায়।
মুক্ত গণমাধ্যম মানে সীমাহীন স্বাধীনতা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত আছে গভীর দায়বদ্ধতা। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা জনস্বার্থ রক্ষা করে, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে।
অন্যদিকে, স্বাধীনতার অপব্যবহার করে যদি যাচাইহীন তথ্য, চরিত্রহনন বা বিভাজনমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হয়, তবে সেটি সাংবাদিকতার চেতনার পরিপন্থি।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সাংবাদিকরা এখনো নানামুখী চাপের মধ্যে কাজ করেন। কখনো রাজনৈতিক মেরুকরণ, কখনো আইনি জটিলতা, কখনো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবার কখনো ডিজিটাল হুমকি ও অনলাইন হয়রানি তাদের পেশাগত স্বাধীনতাকে সীমিত করে। একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সমাজও প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়।
রাজনৈতিক চাপ, মামলা, অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল নজরদারি, আর্থিক অনিশ্চয়তা—এসব অনেক দেশে সাংবাদিকদের কাজকে কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কাজ করলে সাংবাদিকরা প্রায়ই হুমকি বা চাপের মুখে পড়েন। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায়, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়; অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপননির্ভর আয়, কর্পোরেট প্রভাব, মালিকানার কেন্দ্রীকরণ—এসব কারণে অনেক সময় সম্পাদকীয় স্বাধীনতা সীমিত হয়।
একটি সংবাদমাধ্যম যদি আর্থিকভাবে টেকসই না হয়, তবে তার পক্ষে স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখা কঠিন। তাই ডিজিটাল সাবস্ক্রিপশন, পাঠকনির্ভর মডেল ও বহুমুখী রাজস্ব কাঠামো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদক হিসেবে আমি মনে করি, গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিনির্ভর নয়, আস্থানির্ভর। পাঠক বা দর্শক কেন একটি সংবাদমাধ্যমকে অনুসরণ করবে?
কারণ তারা বিশ্বাস করবে—এখানে যাচাইকৃত তথ্য আছে, বিশ্লেষণ আছে, দায়িত্বশীল অবস্থান আছে। প্রযুক্তি বদলাবে, প্ল্যাটফর্ম বদলাবে, পাঠাভ্যাস বদলাবে; কিন্তু আস্থা হারালে সংবাদমাধ্যমের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের শুধু উদযাপনের দিন নয়, আত্মসমালোচনারও দিন। আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে— সংবাদ কি যথেষ্ট যাচাই করে প্রকাশিত হচ্ছে?
আমরা কি সত্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছি? আমরা কি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি? আমরা কি ভিন্নমতকে যথাযথ স্থান দিচ্ছি? আমরা কি তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করছি? ভুল হলে সংশোধনের সংস্কৃতি কি আছে?
মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের পেশাগত দাবি নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত।
আমি বিশ্বাস করি, গণমাধ্যমের শক্তি ক্ষমতার নৈকট্যে নয়, সত্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিতে।
স্বাধীন সাংবাদিকতা মানে শুধু স্বাধীনভাবে লেখা নয়; সত্য প্রকাশের সাহস, ভুল সংশোধনের সততা এবং জনস্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার। যে সমাজ মুক্ত সংবাদমাধ্যমকে রক্ষা করতে পারে, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও নাগরিক স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।
আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—গতি নয়, সত্য আগে। জনপ্রিয়তা নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা আগে। চাপ নয়, নৈতিকতা আগে।
মুক্ত সংবাদমাধ্যমের শক্তি সত্যে, আর সত্যের শক্তি স্বাধীনতায়। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষা করা মানে কেবল একটি পেশাকে রক্ষা করা নয়—একটি সমাজের বিবেককে রক্ষা করা।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
লেখক সংক্ষেপ:
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন