কবিতা          :         পৃথিবীর জরায়ুর কাছে মৃত সন্তানের জবানবন্দি
কবি              :         শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
গ্রন্থ               :         
প্রকাশকাল   :         ৬ অগাস্ট ২০২৬ ইং
রচনাকাল     :         ৫ অগাস্ট ২০২৬ ইং

বহুল পরিচিত কবি ও সাংবাদিক শিমুল চৌধুরী ধ্রুব “পৃথিবীর জরায়ুর কাছে মৃত সন্তানের জবানবন্দি” শিরোনামের এই কবিতাটি তিনি এবস্ট্রাক্ট ফর্মে লিখেছেন। তিনি এ কবিতাটি ২০২৬ সালের অগাস্টে ঢাকার নিকেতনে বসে লিখেছেন।
পৃথিবীর জরায়ুর কাছে মৃত সন্তানের জবানবন্দি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব
পৃথিবীর জরায়ুর কাছে মৃত সন্তানের জবানবন্দি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব



পৃথিবীর জরায়ুর কাছে মৃত সন্তানের জবানবন্দি || শিমুল চৌধুরী ধ্রুব

হেরে যাচ্ছি দিন দিন।
আমার হাড়ের ভেতর এখন একটি অচেনা রাষ্ট্র বাস করে,
যেখানে প্রতিটি নাগরিক জন্মের আগেই নিখোঁজ।

পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি।
ডাকবাক্সে আর কোনো ঋতু এসে নামে না,
বৃষ্টিরা ভুলে গেছে আমার ছাদের নাম।
একটি কাক প্রতিদিন জানালায় এসে
নিজের ছায়াকে ঠুকরে রক্তাক্ত করে,
তারপর উড়ে যায় এমন এক আকাশে
যেখানে সূর্যকে বহু আগেই
একটি অন্ধ শিশু পকেটে ভরে রেখেছে।

মায়ের স্তন ইদানীং এক ফোঁটা দুধ দেয় না।
সেখানে এখন ধুসর সাহারা,
আর সেই সাহারার ভেতর আমি দেখতে পাই
আমার অনাগত শৈশবের কাঁদতে থাকা কঙ্কাল।

জরায়ুও অস্বীকার করে জন্মান্তরের ইতিহাস।
ভ্রূণেরা আদালতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে,
সন্তান হয়ে ওঠা একটি প্রাচীন ভুল।
নাভিরজ্জু কেটে ফেলার আগেই
সভ্যতা নিজের মৃত্যু সনদে
আমার নাম লিখে রেখেছিল।

আমি ঠিকানাটা চিনতে পারি না।
যে মানচিত্র খুলে বসি,
সেখানে নদীগুলো ধমনীর মতো কাঁপে,
দেশগুলো একে অপরের চোখ ধার করে ঘুমায়,
আর আমার বাড়ির জায়গায়
একটি বিশাল আয়না বসানো,
যেখানে প্রবেশ করলেই,
অসংখ্য বিলুপ্ত প্রাণীর চোখ দেখতে পাই।

যে দেবীর পায়ে প্রতিদিন সিজদাহ্ করি,
তিনি মুখ ফিরিয়ে রাখেন।
ঈশ্বরের অবজ্ঞা বর্ষিত হয় বল্লমের মতো,
আর আমি প্রতিটি ক্ষত থেকে
একটি নতুন চিরকুট কুড়িয়ে নিই।
সেখানে স্পষ্ট বর্ণমালায় লেখা থাকে,
‘করুণা আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসী মিথ্যা’।

সুবহে সাদিকের ঠিক আগে
আমি আয়নায় দাঁড়াই।
সেখানে মহাবিশ্বের সর্বনিকৃষ্ট প্রাণীটি
দাঁত বের করে হেসে ওঠে।
হুবহু আমার মতই দেখতে
আমার সব সম্ভাবনার গণকবর।

তার হাসির শব্দে
গাছের শিকড় মাটি ছেড়ে আকাশে ঝুলে যায়,
মাছেরা সমুদ্রের বদলে মানুষের চোখে ডিম পাড়ে,
আর চাঁদ প্রতিরাতে নিজের খুলি খুলে
অন্ধকারকে খেতে বসে।

আমি এখন এমন এক ভাষায় কথা বলি
যেখানে প্রতিটি শব্দের আগে
একটি শবযাত্রা হেঁটে যায়।
প্রতিটি বাক্যের শেষে
একটি নক্ষত্র আত্মহত্যা না করে
শুধু আলো ফিরিয়ে নেয়।

শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারি,
পরাজয় কোনো ঘটনা নয়,
এটি আমার দ্বিতীয় কঙ্কাল।
আমি সেটিকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাই
এক মৃত গ্রহ থেকে আরেক মৃত গ্রহে।

হয়তো একদিন
সমস্ত আয়না ভেঙে ধুলো হয়ে যাবে,
তবুও সেই ধুলোর ভেতর
একটি অদৃশ্য মুখ
আমাকে দেখে হেসে উঠবে।
আর আমি তখনও
পৃথিবীর সর্বশেষ পরিত্যক্ত সন্তান হয়ে
একটি মৃত জরায়ুর দরজায় কড়া নেড়ে বলব,

"আমাকে আর জন্ম দিও না,
আমি অনেকবার তোমার সন্তান হয়েছি।"

৫ আগস্ট, ২০২৬
নিকেতন, ঢাকা

আপনার পছন্দের কবিতা নাম কমেন্টে জানান 


 Follow Now Our Google News



লেখক সংক্ষেপ:
কবি শিমুল চৌধুরী ধ্রুব তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'নিষিদ্ধ পাণ্ডুলিপিতে' নিজের পরিচিতি সম্পর্কে লিখেছেন ❝নাম, ধাম, বয়স, জন্ম, সময়-বিবিধের বেড়াজালে আমি কোনোদিন হারাতে চাইনি এবং ভবিষ্যতেও চাইনা। বইয়ের শেষ পৃষ্টা উল্টিয়ে কবি'র পরিচয় পাওয়া কি আদৌ সম্ভব! কবি যুবক নাকি বৃদ্ধ, ধনী নাকি দরিদ্র, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিনা, এসব আমার কাছে বরাবরই অপ্রাসঙ্গিক। কবির পরিচয় নিহিত থাকে মূলত তার সন্তানসম কবিতায়। আমার পরিচয়ের কথা যদি বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে আমি অতি সাধারণ এবং নগন্য এক মানুষ। এর বাইরে দেবার মতো পরিচয় আমার নেই।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন