কবিতা          :         প্রিয় ক্রিতো
কবি              :         অ্যান কারসন
গ্রন্থ               :         রং নর্মা (২০২৪)
অনুবাদ        :         গৌরাঙ্গ মোহান্ত
প্রকাশকাল   :         ২০২৪ ইং
রচনাকাল     :         

অনুবাদক পরিচিতি: ড. গৌরাঙ্গ মোহান্ত বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক, যিনি বর্তমানে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ১৯৬২ সালের ৭ জানুয়ারি লালমনিরহাটে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার চিত্রকল্প ও প্রতীক নিয়ে উচ্চতর পিএইচডি গবেষণা করেন। সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধনে বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা ও মননশীল প্রবন্ধ রচনার জন্য তিনি সুপরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য মৌলিক ও অনূদিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘এনট্রপি’, ‘আধিপ্রান্তর জুড়ে’, ‘করোটিমঞ্চে খেমটাওয়ালি’ এবং ফরাসি কবি জঁ-মিশেল মোলপোয়ার কবিতার সফল ভাষান্তর।

সামান্য কোলাহল || অ্যান কারসন
সামান্য কোলাহল || অ্যান কারসন


প্রিয় ক্রিতো || অ্যান কারসন


প্রিয় ক্রিতো, আজ এসো না। যদি আসো তাহলে আমাকে ঘুমিয়ে থাকার ভান করতে হবে, অথবা লজ্জিত হওয়ার ভান করতে হবে, অথবা কেন আমি আমার স্ত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। চোখের জল তো যে কাঁদছে তারই ব্যাপার, তাই না? আমার মেয়েটার অনেক বুদ্ধি। সে এখানে এসেছিল, চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, এ জায়গাটা সত্যিই স্যাঁতসেঁতে, তোমার একটা টুপি দরকার, আধঘণ্টা পর সে গত শীতে তুমি আমাকে যে পশমের টুপিটা দিয়েছিলে, সেটা নিয়ে ফিরে এলো। ব্যাবহারিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে আমি পছন্দ করি। তিনদিন পরই আমার মৃত্যুর ক্ষণ ধার্য হয়েছে। তোমার কিছুই করার নেই। তবে হেমলক জোগাড় করে দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে দাও। জানি, ঘুস আর করের খরচ মিটিয়ে ওটা সস্তায় জোগাড় করা যায়নি—এ দেশে ওরা জিনিসটা নিজেরাই চাষ করতে পারে না কেন?—কিন্তু ঈশ্বরের দোহাই, অন্য পদ্ধতিটার চেয়ে এটা অনেক ভালো, সেই তথাকথিত রক্তপাতহীন ক্রুশবিদ্ধকরণ, যেখানে কাঠের খুঁটি আর লোহার বেড়ি ব্যবহার করা হয়। এভাবে আরেকজন মানুষকে মরতে কেউ দেখতে চায় না—ক্রিতো, তুমি বছরের পর বছর দুঃস্বপ্ন দেখে বেড়াতে। আর একেবারে অবশ হয়ে যাওয়ার ধারণাটাও আমার কিছুটা ভালোই লাগে। আমার স্ত্রীর মতে আমি নাকি বছরের পর বছর ধরেই অনুভূতিহীন—ওকে সহ্য করার একমাত্র উপায় ছিল সেটা, আহা, কথাটা নিষ্ঠুর হয়ে গেল। আমি বছরের পর বছর নিষ্ঠুর আচরণ করে এসেছি, অন্তত বাড়িতে, মজার ব্যাপার নিজের সবচেয়ে খারাপ সত্তাটা সেখানেই বেরিয়ে আসে।

আমার জীবন তো বন্ধুদের নিয়েই, তুমি জানো! বন্ধু আর মদ্যপান। আমি বক্তা। কথাবার্তায় আমার বিশ্বাস রয়েছে—সমস্ত ঢাকনা খুলে ফেলো! সমস্ত থলের বিড়ালকে বেরিয়ে আসতে দাও!—যদিও আমার বলা কথার বেশির ভাগই স্রেফ সাধারণ বুদ্ধির কথা। আমি কি মানুষকে ভয় পাইয়ে দিই? যখন বলি, পেছনের দেয়াল বলে কিছু নেই? তোমার আর তোমার অন্তরের অন্ধকারের মাঝখানে কিছুই নেই? কিংবা যদি কিছু থেকেও থাকে, তুমি তার কাছে প্রার্থনা করতে পারবে না, তাকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারবে না, তার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতাও করতে পারবে না। সেখান থেকে ভয়ংকর সব পরিকল্পনা আর অস্তিত্বহীনতার গন্ধ বেরোয়। দুঃখিত, নাটকীয় হয়ে গেল। ভয়ংকর পরিকল্পনার কথা যখন উঠলই, প্লেটোকে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে দিও না। সে পুরোনো দিনের আমার বলা কথাগুলো উদ্ধৃত করতে শুরু করবে, সেসব শুনতে গেলেই আমার গা শিউরে ওঠে। অথবা সে আইনকানুন নিয়ে ভাষণ দেবে। আপনাকে আইন মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে না, দিচ্ছে আইনজীবীরা, সে বলবে আর আমি বলব, পার্থক্যটা তবে চমৎকার। তারপর সে রাজহাঁস অথবা শরীরচর্চা নিয়ে অথবা কে জানে আর কী নিয়ে বকবক করতে থাকবে, বলতেই থাকবে, বলতেই থাকবে, বলতেই থাকবে—আমাদের প্রিয় প্লেটোর সঙ্গে যখনই কথা বলি, মনে হয় আমি যেন অনন্তকালের দিকে ভেসে চলেছি, তুমি জান আমি কী বলতে চাই। অথবা না-ও জানতে পার। তুমি অদ্ভুত ধরনের মানুষ, ক্রিতো। তোমার ছোট্ট সোনালি চোখ আর লিকলিকে হাত দেখে বব ডিলানের কথা মনে পড়ে। আর তুমি তর্ক করতে দারুণ ভালোবাসো, ঠিক বলছি তো? কবে থেকে তর্কবিতর্ক নিয়ে ভাবনা-চিন্তা থামিয়ে দিলাম? কারণ সত্যিই, আমি থেমে গেছি। আমার মনটা এখন পাউরুটির মতো ফাঁকা। হয়তো এখানকার একটানা গুনগুন শব্দটার জন্যই এমন হচ্ছে। ওই গুনগুনানি, শুনতে পাচ্ছ? শব্দটা কি দেয়ালের ভেতর রয়েছে, নাকি আমার কানের ভেতর? কণ্ঠস্বর, কণ্ঠস্বর, সব সময়ই এগুলো আছে, কথাহীন কণ্ঠস্বর। সেই গুনগুনানি অন্য সব ধ্বনিকে চাপা দিয়ে রাখে। পুরোনো দিনের কথা মনে আছে যখন বন্দিদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য সারা রাত ইগি পপের গান বাজানো হতো? তখন যুদ্ধ চলছিল; এখন সেই জানোয়ারটা ঝিমোচ্ছে। যা হোক, তুমি এখানে থাকলে হয়তো তোমার কথা আমি ঠিকমতো বুঝতেই পারতাম না—আবার অন্যদিকে, আমার প্রিয় ক্রিতো, যদি তুমি এসেই পড়ো, ওই পশমের টুপিগুলোর আরেকটা কি নিয়ে আসতে পারবে? আমার টুপিটা প্রহরীকে দিয়েছি। তাকে দুর্দশাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল। এ জায়গাটা সত্যিই স্যাঁতসেঁতে।
(কারাগার থেকে সক্রেটিসের লেখা চিঠি)

আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com 


 Follow Now Our Google News

অ্যান কারসন’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
  • ইরোস দ্য বিটারসুইট
  • অটোবায়োগ্রাফি অভ রেড (১৯৯৮)
  • দ্য বিউটি অভ দ্য হাজব্যান্ড (২০০১)
  • নক্স (২০১০)
  • রং নর্মা (২০২৪)

লেখক সংক্ষেপ:
অ্যান প্যাট্রিশিয়া কারসন (জন্ম: ২১ জুন, ১৯৫০) একজন প্রখ্যাত কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, ধ্রুপদী সাহিত্যের গবেষক এবং ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী এই পণ্ডিত দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ম্যাকগিল, মিশিগান, নিউ ইয়র্ক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদী ও তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যাপনা করেছেন। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ ও পাণ্ডিত্যের প্রথাগত সীমানা ভেঙে তিনি সমকালীন সাহিত্যে এক অনন্য ও সাহসী ধারা তৈরি করেছেন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের গভীর জ্ঞানকে তিনি আধুনিক জীবনের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছিন্নতা এবং শোকের প্রেক্ষাপটে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে শব্দ ও ভাষার ব্যুৎপত্তির (Etymology) প্রতি তার গভীর অনুরাগ তার প্রতিটি সৃষ্টির মূল অনুপ্রেরণা।

এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একত্রিশটি, যার মধ্যে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তত্ত্ব ও কাব্যের অনন্য বিশ্লেষণ 'ইরোস দ্য বিটারসুইট' তাকে প্রথম সাহিত্যিক মহলে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তীতে তার লেখা অনন্য পদ্য-উপন্যাস 'অটোবায়োগ্রাফি অভ রেড' (১৯৯৮), জন কিট্‌সের কবিতার মেলবন্ধনে লেখা 'দ্য বিউটি অভ দ্য হাজব্যান্ড' (২০০১) এবং ভাইয়ের অকালমৃত্যুর শোক গাঁথা নিয়ে প্রথাবিরোধী বক্স-বই 'নক্স' (২০১০) বিশ্বজুড়ে বিপুল প্রশংসা কুড়ায়। তার সাম্প্রতিকতম জনপ্রিয় সংকলন 'রং নর্মা' ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যজগতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সম্মানজনক টি. এস. এলিয়ট পুরস্কার, পেন/নাবোকভ পুরস্কার, দুইবার গ্রিফিন কবিতা পুরস্কার এবং ম্যাকআর্থার ও গুগেনহাইম বৃত্তিসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছেন। ২০০৫ সালে তাকে 'অর্ডার অব কানাডা'র সদস্য করা হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালে নোবেল কমিটি তাকে "ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে ক্রীড়াময় সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন নতুন রূপ সৃষ্টি করা সাহসী ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের জন্য" বিশ্বের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে। বর্তমানে তিনি কানাডা ও আইসল্যান্ডের দ্বৈত নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করছেন।

কবিয়াল
 
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন