![]() |
| The Feminine Hour : ১০টি হাঁসের ডিম দিয়ে শুরু, এখন ১৬ একর খামারের মালিক বিবি রহিমা |
১০টি হাঁসের ডিম দিয়ে শুরু, এখন ১৬ একর খামারের মালিক বিবি রহিমা
নোয়াখালী প্রতিনিধি: প্রতিবেশীর কাছ থেকে ১০টি হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে বাচ্চা ফোটানোর জন্য নিজের ঘরে থাকা দেশি মুরগির নিচে রেখেছিলেন বিবি রহিমা। সব ডিম থেকেই বাচ্চা ফুটেছিল। এরপর এসব হাঁসের বাচ্চা পালতে শুরু করেন রহিমা। সেখান থেকেই শুরু। এখন বিবি রহিমার রয়েছে প্রায় ১৬ একরের সমন্বিত কৃষি খামার।
বিবি রহিমা নোয়াখালী সদর উপজেলার কাদিরহানিফ ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের বাসিন্দা। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে তাঁর সমন্বিত কৃষি খামার। এতে রয়েছে মাছের ঘের, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও শাকসবজি। খামারের কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন তাঁর স্বামী এবং সন্তানেরা। এ ছাড়া নিয়মিত খামারে কাজ করেন চার-পাঁচজন শ্রমিক।
জেলা শহর মাইজদী থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে বিবি রহিমার খামার। গ্রামীণ সড়ক দিয়ে কাদিরহানিফ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গনির দোকান পার হয়ে অল্প কিছুদূর সামনে গেলেই খালপাড় এলাকায় চোখে পড়ে তাঁর সমন্বিত কৃষি খামারটি। পাশে রহিমার মেয়ের নামে তৈরি করা হয়েছে নতুন একটি বসতঘর।
সরেজমিনে দেখা যায়, বসতঘরের পাশে মাছের ঘের। সেখানে দলবেঁধে চষে বেড়াচ্ছে হাঁসের দল। ঘেরের পাশে লাগানো হয়েছে পেঁপে, বরইসহ নানা দেশীয় ফলের গাছ। সারি সারি পেঁপেগাছে কাঁচা ও পাকা পেঁপে ঝুলছে। এর পাশেই চোখে পড়ে লাউ, কুমড়াসহ নানা সবজির খেত। অন্যদিকে রয়েছে গরু-ছাগলের খামার।
খামারে কথা হয় বিবি রহিমার সঙ্গে। জানান, বিয়ের পর খুবই অভাব-অনটনে দিন কাটছিল তাঁর। তাঁর স্বামী তখন কৃষিকাজ করতেন। অভাবের সংসারের স্বামীর পাশাপাশি কিছু একটা করার কথা ভাবতেন রহিমা। ঘরে একটি দেশি মুরগি ছিল তাঁর। ভাবলেন, কয়েকটা হাঁস থাকলে ভালো হতো।
রহিমা বলেন, ‘এটি প্রায় ২৩ বছর আগের কথা। তখন আমার বড় ছেলে গর্ভে। প্রতিবেশীর কাছ থেকে ১০টা হাঁসের ডিম সংগ্রহ করে আমার দেশি মুরগিটার নিচে দিলাম। ১০টি ডিম থেকেই বাচ্চা ফুটল। এর মধ্যে ৮টিই মাদি হাঁস। হাঁসগুলো বড় হয়ে ডিম দিতে শুরু করল।’
এরপর ডিম বিক্রি করে টাকা জমিয়ে একটি ছাগল কেনেন বলে জানান রহিমা। তিনি বলেন, ‘একটি ছাগী কিনেছিলাম। পরে সেটি বাচ্চা দেয়। ঘরে ছাগলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি ছাগল বিক্রি করে একটি গরুর বাছুর কিনেছিলাম। সেটিও বড় হয়ে বাচ্চা দেয়। এভাবেই আমার পশুর খামারে গরু-ছাগলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাঁস-মুরগিও একই ভাবে বেড়েছে।’
রহিমা বলেন, ‘একসময় দেখি খামারে কেবল গাভিই আছে ২১টি। তখনো গরু রাখার ঘর ছিল কাঁচা। পরে কয়েকটি গরু বিক্রি করে পাকা ঘর নির্মাণ করেছি।’
রহিমা জানান, এখন তাঁর খামারে গরু রয়েছে ৮টি। ছাগল আছে ১৩-১৪টির মতো। হাঁস রয়েছে ৫০০টির বেশি। দেশি মুরগি রয়েছে ৩৫০টি। এর বাইরে শাকসবজির খেত, ফলদ গাছের বাগান রয়েছে। তাঁর মাছের ঘেরে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছের চাষ করা হয়েছে।
রহিমা বলেন, ‘খামারের সবকিছুতেই যতটা সম্ভব নিজের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করি। বাজার থেকে সবজির চারা বা হাঁস-মুরগির বাচ্চা কিনি না। নিজের খামারেই মুরগি ও হাঁসের বাচ্চা ফুটাই। নিজেই বীজ থেকে চারা উৎপাদন করি।’ বিবি রহিমা বলেন, বাজার থেকে চারা কিংবা বাচ্চা কিনে আনলে অনেক সময় সমস্যা হয়। সে কারণে নিজের খামারেই চারা ও বাচ্চা উৎপাদন করেন তিনি।
খামারের আয়ে নিজের পরিবারের সচ্ছলতা এসেছে বলে জানালেন রহিমা। তিনি বলেন, খামারের আয় দিয়ে নিজের দুই ছেলে ও চার মেয়ের পড়াশোনা এবং পরিবারের খরচ চালিয়েছেন। চার মেয়ের মধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে এক মেয়ে স্নাতকে পড়েন, আরেকজন মাদ্রাসায় মাধ্যমিকে পড়ে।
দুই ছেলের মধ্যে একজন বর্তমানে সৌদি আরবে চাকরি করেন। স্বামীকেও খামারের আয়ে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তবে খামারের কাজে সহায়তার জন্য কয়েক বছর পর দেশে নিয়ে আসেন। এক ছেলে এসএসসি পাসের পর খামারে সহায়তা করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বসতঘরের পাশে মাছের ঘের। সেখানে দলবেঁধে চষে বেড়াচ্ছে হাঁসের দল। ঘেরের পাশে লাগানো হয়েছে পেঁপে, বরইসহ নানা দেশীয় ফলের গাছ। সারি সারি পেঁপেগাছে কাঁচা ও পাকা পেঁপে ঝুলছে। এর পাশেই চোখে পড়ে লাউ, কুমড়াসহ নানা সবজির খেত। অন্যদিকে রয়েছে গরু-ছাগলের খামার।
রহিমা জানান, নিজের আয় ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে খামারে বিনিয়োগ করেন তিনি। খামারের আয়ও এতে বেড়েছিল। তবে আয়ে প্রথম ধাক্কা লাগে করোনাকালে।
বিবি রহিমা বলেন, ‘লকডাউনের সময় হাঁস-মুরগির খাবার কিনতে পারিনি। প্রায় দুই হাজার ডিম দেওয়া মুরগি কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। ক্রেতার অভাবে কত মণ দুধ নষ্ট হয়ে গেছে হিসাব নেই। দুধ সড়ক ও খালে ফেলে দিতে হয়েছিল। তখন খাবারের অভাবে গরুগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শেষ পর্যন্ত অনেক গরু নামমাত্র দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই।’ তাঁর দাবি, করোনার মহামারিতে খামারে অর্ধকোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। এরপর আবার ঋণ নিয়ে খামার গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।
করোনার ক্ষতি সামলে খামারটি যখন আবার গুছিয়ে আনছিলেন, তখন আসে ২০২৪ সালের বন্যা। বিবি রহিমার ভাষ্য, ভয়াবহ ওই বন্যায় তাঁর ছয়টি গরু ও প্রায় দুই হাজার ডিম দেওয়া হাঁস ভেসে যায়। মারা যায় প্রায় এক হাজার মুরগি। পুকুর থেকে ভেসে যায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ পাঙাশ মাছ।
রহিমা বলেন, মাছগুলো প্রতিটি ৩৫ টাকা দরে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বন্যায় সব ভেসে যাওয়ায় বিক্রি করা আর সম্ভব হয়নি। দুই মাসের বেশি সময় ধরে বন্যার পানিতে খামারের সবকিছু ডুবে ছিল।
বিবি রহিমার দাবি, ওই বন্যায় তাঁর প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এত বড় ক্ষতির পরও কেবল কিছু কৃষিবীজ ছাড়া কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। রহিমা বলেন, ‘সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পাব আশা করেছিলাম, তা–ও পাইনি। বর্তমানে আমার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে।’
খামার পরিচালনায় এখন নতুন করে সংকটে পড়েছেন বলে দাবি করেন বিবি রহিমা। তিনি বলেন, স্থানীয় এক তরুণ একটি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিচয়ে প্রায়ই তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছেন। চাঁদা না দিলে খামারের ও পরিবারের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি ওই রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের জানানোর পর ওই তরুণের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও হুমকি বন্ধ হয়নি বলে দাবি তাঁর।
কবিয়াল/দেবযানী

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন