মুক্তমত : এআই দৌড়ে বাংলা ভাষা এতো দূর্বল কেনো?
লেখক : শেখ শাহরুখ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ৩ জানুয়ারি, ২০২৬
রচনাকাল :
![]() |
| এআই দৌড়ে বাংলা ভাষা এতো দূর্বল কেনো? || শেখ শাহরুখ |
এআই দৌড়ে বাংলা ভাষা এতো দূর্বল কেনো? || শেখ শাহরুখ
ডিজিটাল বিপ্লব ও বর্ধনশীল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে ভর করে বাংলাদেশ সতর্ক পায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে প্রবেশ করছে। তবে দৈনন্দিন জীবনে এআইভিত্তিক টুলের ব্যবহার বাড়লেও নিজস্ব এআই সিস্টেম উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ—উন্মুক্ত ও উচ্চমানের বাংলা ভাষার ডেটাসেটের তীব্র ঘাটতি।
কর্মক্ষেত্র, শ্রেণিকক্ষ ও স্মার্টফোনে এআইয়ের উপস্থিতি বাড়লেও বাংলাদেশ মূলত ব্যবহারকারীর ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ, নির্মাতার নয়। বিশ্লেষকদের সতর্ক করে বলছেন, উন্মুক্ত বাংলা ডেটাসেট না থাকলে বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
এআই ব্যবহারে প্রবৃদ্ধি, স্থানীয় উন্নয়ন সীমিত
স্টার্টআপ বাংলাদেশ’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০টির বেশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে এআই ব্যবহার করছে—গ্রাহকসেবা অটোমেশন থেকে শুরু করে ডেটা অ্যানালিটিক্স পর্যন্ত।
ঢাকার বাইরে সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতেও সীমিত পরিসরে এআইভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। তবে এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই বিদেশি এআই মডেল ও প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজস্ব এআই সিস্টেম খুব কম প্রতিষ্ঠানই তৈরি করছে।
স্থানীয় ভাষাভিত্তিক কম্পিউটিংয়ে যুক্ত এক প্রযুক্তি গবেষক বলেন, “এআই মডেল যতটা ভালো, ততটাই ভালো তার প্রশিক্ষণ ডেটা। বড় ও উন্মুক্ত বাংলা ডেটাসেট ছাড়া বাংলাদেশের জন্য কার্যকর চ্যাটবট, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, অনুবাদ টুল বা সিদ্ধান্ত-সহায়ক সিস্টেম তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।”
শিক্ষা: সম্ভাবনা বেশি, বাস্তবায়ন দুর্বল
শিক্ষা খাতে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি হলেও বাস্তব প্রয়োগ এখনো সীমিত। মুক্তপাঠ, টিচার্স পোর্টাল ও দীক্ষার মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষা ডিজিটালাইজেশনে সরকার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিলেও এআইভিত্তিক শিক্ষণ টুল এখনো মূলত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
সম্প্রতি, ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদনে বড় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে—বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার থাকলেও মাত্র ৫৩ শতাংশে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। এই ডিজিটাল বৈষম্যই শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে।
২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার এআই–সম্পর্কিত গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও সেগুলোকে ব্যবহারিক টুলে রূপান্তর করা এখনও চ্যালেঞ্জ। একটি পাইলট প্রকল্পে এআইয়ের মাধ্যমে একটি বাংলা গণিত পাঠ্যবই ইংরেজিতে অনুবাদ করা হলে তাতে ভুলে ভরা, সাংস্কৃতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক ও শিক্ষাগতভাবে দুর্বল কনটেন্ট তৈরি হয়।
এই অভিজ্ঞতা বলে দেয়, পর্যাপ্ত স্থানীয় ভাষার ডেটা না থাকলে বৈশ্বিক এআই মডেল কার্যকর ফল দিতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ লোকালাইজেশন ছাড়া আন্তর্জাতিক এআই সিস্টেম শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য কমানোর বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিভিন্ন খাতে ভাষা প্রযুক্তির ঘাটতি
উন্মুক্ত বাংলা ডেটাসেটের অভাব শুধু শিক্ষাখাত নয়—স্বাস্থ্য, কৃষি, শাসনব্যবস্থা ও জনসেবাকেও প্রভাবিত করছে। এসব খাতে এআই বিস্তারের জন্য প্রয়োজন অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (ওসিআর), বানান পরীক্ষক, সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস, স্পিচ রিকগনিশন ও প্রাকৃতিক ভাষা বোঝার ডেটাসেট।
আইসিটি বিভাগের অধীনে ‘এনহ্যান্সিং বাংলা ল্যাঙ্গুয়েজ ইন আইসিটি’ (এফবিএলআইসিটি) প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলা ওসিআর ইঞ্জিন, বানান পরীক্ষক ও সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইজারসহ বেশ কিছু টুল তৈরি করা হয়েছে। তবে এসব টুলের পেছনের ডেটাসেটগুলো মূলত বন্ধ অবস্থায় থাকায় গবেষক, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবকদের পুনঃব্যবহারের সুযোগ সীমিত।
আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভাষার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এসব ভাষার অনেকগুলোর মানসম্মত লিপি, ডিজিটাল ফন্ট বা গঠিত করপাস নেই। ফলে এআই উন্নয়ন তো দূরের কথা, মৌলিক ডিজিটাল সংরক্ষণও খুব সীমিত।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আইএমএলআই) কিছু নথিভুক্তকরণ উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—এআই ডেটাসেট থেকে ভাষাগত বৈচিত্র্য বাদ পড়লে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ডিজিটাল উপস্থিতি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
অবকাঠামো ও ডিজিটাল বৈষম্য
এআই উন্নয়ন অনেকাংশে ভৌত ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল—যেখানে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়লেও দেশের মাত্র ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। শহরে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৬৬ দশমিক ৮ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র আটটি ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং বৈশ্বিক ডেটা অবকাঠামো সূচকে দেশের অবস্থান নিচের দিকে। অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, সীমিত উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের উচ্চ খরচ বড় পরিসরে এআই গবেষণা ও প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না করলে উন্নত এআই নীতিমালাও কার্যকর ফল দিতে পারবে না।
বাড়ছে ব্যবহারকারী, কিন্তু অসম
সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশে এআই ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। টেলেনর এশিয়ার সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এআই টুল ব্যবহার করেন, যার মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করেন। কর্মক্ষেত্রে এআই গ্রহণের হার ৪৪ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ও ভিডিও রিকমেন্ডেশন থেকে শুরু করে চ্যাটবট, বিনোদন, অনুবাদ, সময় ব্যবস্থাপনা, বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা ও ভ্রমণ পরিকল্পনায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
তবে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য স্পষ্ট—সাধারণ ও কর্মক্ষেত্র উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষ ব্যবহারকারীর সংখ্যা নারীদের তুলনায় বেশি।
বাংলাদেশের জন্য ইউনেসকোর রোডম্যাপ
ইউনেসকোর ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এআই ব্যবহার ও সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা ভাষার কিছু টুল থাকলেও উন্মুক্ত ডেটাসেটের অভাবকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি দ্রুত জাতীয় এআই নীতিমালা চূড়ান্ত করা, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, স্বচ্ছ সরকারি এআই ক্রয়প্রক্রিয়া এবং তথ্য অধিকার আইন হালনাগাদের সুপারিশ করেছে। রোডম্যাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলা ও আদিবাসী ভাষার ডেটাসেট উন্নয়ন।
সামনে পথ
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল এআই ব্যবহারকারী বাজারগুলোর একটি হয়ে উঠছে। তবে ভাষা ডেটা, অবকাঠামো ও গভর্ন্যান্সে মৌলিক বিনিয়োগ ছাড়া দেশটি বৈশ্বিক এআই প্রযুক্তির নীরব ভোক্তায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে একমত—ডেটা ছাড়া এআই অন্ধ। যতদিন না বাংলা ডেটা উন্মুক্ত, সহজলভ্য ও স্কেলযোগ্য হচ্ছে, ততদিন বাংলাদেশের এআই অগ্রগতি সীমাবদ্ধই থাকবে।
তারা বলছেন, উচ্চমানের উন্মুক্ত বাংলা ডেটাসেট উন্মোচন এখন আর বিকল্প নয়—এটি একটি জাতীয় অপরিহার্যতা।
মুক্তমত বিভাগে লেখা পাঠাতে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল ঠিকানা- kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
লেখক সংক্ষেপ:
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন