গোলাপী দাগ || ডা. অন্তরা বিশ্বাস
গোলাপী দাগ || ডা. অন্তরা বিশ্বাস


গোলাপী দাগ || ডা. অন্তরা বিশ্বাস



- "হ‍্যালো রূপু!"

"হ‍্যাঁ কাকিমা বলো।"

- "খুব ব‍্যস্ত!"

"না ঠিক আছে। তুমি বলো। খবর টবর সব ভালো তো!" টিফিন বক্সটা অফিস ব‍্যাগে পুরতে পুরতে বলে রূপু ওরফে রূপসা।

- "আরে! সুখবর আছে। তুই মাসী হতে যাচ্ছিস। মানাই ভোর রাতে ফোন করে জানাতে সেকি কান্ড। আনন্দে    নিজেকে আর কন্ট্রোলই করতে পারছি না! সেই থেকে ভাবছি কখন তোকে জানাবো। তুই তো শুধু ওর দিদি নোস - বন্ধুও বটে। তা হ‍্যাঁরে! তোর খবর কি! বলি, বাচ্চা টাচ্চা কি নিবি? না কি সারাজীবন চাকরির পেছনেই ছুটবি! সাত বছর তো ঘুরতে গেলো। বয়স টাও তা কম হলো না। মানাইয়ের থেকে কম করেও তুই ন-দশ বছরের বড়ো। সমস‍্যা থাকলে ডাক্তার  দেখা।বুড়ো বাপ মা'র কথাও এবার একটু ভাব! এ বাবা! ওভেনে চায়ের জল বসিয়ে এসেছি। শুকিয়ে গেলো বোধহয়। রাখি রে। মানাইও রাতের দিকে তোকে কল করবে। ভালো থাকিস তোরা।"

মানাইয়ের সাথে সম্পর্কটা মায়ের পেটের বোনের মতোই হয়েছিলো। কিন্তু, আজ এই পরিস্থিতিতে সুখবরটা আনন্দ দেওয়ার পরিবর্তে গলায় কাঁটা বেঁধার মতোই খচখচ করতে লাগলো। চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি তারা। শহরের নামী দামী ডাক্তার দেখিয়েছে। প্রচুর খরচাপাতি। বিভিন্ন টেস্ট। বড়ো কোনো সমস‍্যা সেই অর্থে নেই। তবুও, কোন এক অজ্ঞাত কারণে স্বপ্নটা অপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে।
     
রীতমও আজকাল কেমন চুপ মেরে গেছে। অথচ,কলেজে ওর মতো জলি ছেলে আর দু'টো ছিলো না। আসলে সন্তানহীনতার জন‍্য শুধুমাত্র  মেয়েটিকে নয়, ছেলেটিকেও কম বেশি সমাজের তির্যক মন্তব‍্য সহ‍্য করতে হয়।
             
   এই ছোট্ট ফ্ল‍্যাটটা একটা শিশুর কলতানিতে ভরে উঠুক। কচি গলায় "মা" বলে ডাকুক। কান্নাটা দলা পাকিয়ে উঠতে চাইছে।

- "এই রে!" সাড়ে ন' টা বাজে। দেরী হয়ে গেলো অলরেডি।" ধাতস্থ হয়ে দ্রুত পা চালায় সে।

রীতমের অফিসটা আরো দূরে। সাড়ে আটটায় বেরিয়ে যায় সে। ফিরতে ফিরতে রাত ন'টা। রূপসা ফেরে আটটায়।
  
মিটিং-এ মনিকা অনুপস্থিত। রাগী বস্ রেগে টং। পাশ থেকে পিওন রাখহরি দা স্মরণ করিয়ে দেয় - "মনিকা ম‍্যাডাম গতকালই ছুটির জন‍্য অ‍্যাপ্লিকেশন  জমা করেছিলেন।"

 - "তবে যাই বলিস ভাই! মনিকার থেকে ট্রীটটা 
আমাদের চাই।"

- "কিসের ট্রীট!" 

রূপসার কথায় চোখ সরু করে ধৃতি বলে - "সেকি মামনি! তুমি এখনো বোঝোনি। শরীর খারাপ।ওয়াশরুমে বমি। তেঁতুলের আচার। আমার মেয়ে তিনে পা দিলো। সিম্পটম্ জানি। উ‍্যই আর নাও, গোয়িং টু বি দ‍্য আন্টিজি। হাঃ! হাঃ!"

মন টা আরো ভাঙে রূপসার।

- "কেন ঈশ্বর কেন! আমার সাথেই কেন এরকম! ফুটপাথে বাচ্চা গুলো পোকার মতো কিলবিল করে।নেই তাদের কোনো যত্ন। তবু তারা জন্মায়। বড়ো হয়। কত অ‍্যাবরশন হয়। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ যারা সন্তান সন্তান করে মাথা কোটে, তাদের কোল শূণ‍্য থাকে। এ তোমার কেমন বিচার প্রভু!"
     
অন্নপ্রাশন, জন্মদিন অন‍্য যে কোনো শুভ অনুষ্ঠান সুকৌশলে এড়িয়ে যায় রূপসা। সেই তো ঘুরে ফিরে একই প্রশ্ন! "বাচ্চা হয়নি! কেন? কার সমস্যা? নাকি এখনও বাচ্চা  নিবি না!"

   রাতের দিকে জোর জ্বর। শরীরটা খুব উইক। এ অবস্থায় রূপসাকে ফেলে অফিস যেতে চাইছিলো না রীতম। তবু, যেতে হল ওর জোরাজুরিতে। অফিস পৌঁছে  সাত তাড়াতাড়ি  ফোন করে সে। 

-"ধুর রিং হয়ে যাচ্ছে। অথচ, ফোনই ধরছে না র‍ূপসা।কি জানি বাবা, মেয়েটা কেমন আছে?"

মনে তীব্র উৎকন্ঠা জাগে। এমন সময় রিং ব‍্যাক হয়। ফোন রিসিভ করতে কান্নার দমক শোনা যায়।

- "রূপু কি হয়েছে! কাঁদছো কেন? আমি এক্ষুণি ছুটি নিয়ে আসছি।"

- "তুমি হোয়াটস অ‍্যাপটা চেক করো একবার।" ফোন কেটে যায়।

রীতম তড়িঘড়ি নেট অন করে। রূপসার পাঠানো মেসেজে তখন শো করছে  দু' টো গাঢ় গোলাপী দাগ সহ প্রেগন‍্যান্সী কিটের ছবি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন