কবিতা : ঠকার ধর্মগ্রন্থ
কবি : তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
গ্রন্থ :
প্রকাশকাল : ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
রচনাকাল : ১১ এপ্রিল, ২০২৬ ইং
কবি তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র লেখা ‘ঠকার ধর্মগ্রন্থ’ শিরোনামের কবিতাটি তার ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া হয়েছে। কবির অনুমতি সাপেক্ষে এই কবিতাটি কবিয়াল পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
![]() |
| ঠকার ধর্মগ্রন্থ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ |
ঠকার ধর্মগ্রন্থ || তাওহীদাহ্ রহমান নূভ
আমি ঠকতে চাই। কারণ এই দেশে সত্য নামের জিনিসটা আসলে একটা বিজ্ঞাপন—যা কেবল টিভিতে হাসে, বাস্তবে দাঁত দেখায় না। আমি অনেকদিন ধরে একটা নীল আকাশ কিনতে চাই, কিন্তু আকাশের মালিক কে? কে জমা রেখেছে মেঘের দলিল, কে বসিয়েছে তারার উপর সাইনবোর্ড—“প্রবেশ নিষেধ”? আকাশ তো এখানে মুক্ত নয়, আকাশও নিলামে ওঠে, ক্ষমতার টেবিলে, দালালের হাতে, আর শাসকের থুতু-মাখা সইতে। আমি যদি ঠিকানা পেতাম, আমি দাম নিয়ে দর কষাকষি করতাম না—আমি শুধু কিনে নিতাম, যেন নিজের বুকের উপর একটা বিশাল নীল প্রতারণা বিছিয়ে দিতে পারি।
আমার একটা অরণ্য আছে। গাছের ভিতর লুকানো মায়ের মতো সবুজতা, পাতার শিরায় শিরায় বেঁচে থাকার দাগ, পাখির ডানায় ডানায় ঘামের গান। কিন্তু আমি অরণ্য বেচে দেব, কারণ অরণ্য উপকারী, আর উপকারী জিনিস এই সমাজে বেশিদিন টেকে না। আমি চাই অরণ্যের বদলে আকাশ, কারণ আকাশ মায়া, আর মায়াই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে করে সবকিছু বাঁচিয়ে রেখে নয়—সবকিছু হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাই, যেন মানুষ নামের প্রাণীটা নিজের ভেতর কীভাবে খালি হয়, সেটা আমি নিজের শরীর দিয়েই বুঝতে পারি।
আমার আছে পাহাড়সম আত্মসম্মান—পাথরের মতো ভারী, অহংকারের মতো স্থির। সবাই বলে পাহাড় শান্ত, পাহাড় ধৈর্যশীল, পাহাড় নিরাপদ। কিন্তু পাহাড় আসলে বন্দি, নিজেরই উচ্চতার কারাগারে আটকে থাকা এক নির্লিপ্ত অহংকার। তাই আমি পাহাড় বিক্রি করে সমুদ্র কিনব। কারণ সমুদ্র অস্থির, সমুদ্র চঞ্চল, সমুদ্র প্রতিদিন নিজেকে আছড়ে আছড়ে নতুন করে ভাঙে। আমি চাই আমার বুকের ভিতরেও সেই ভাঙনের শব্দ বাজুক। আমি চাই আমার গাম্ভীর্য গলে যাক নোনা জলে, আর আমি ডুবে গিয়ে বুঝি—ডুবেও একটা মুক্তি আছে।
আমার একটা শহর আছে—ট্রাফিকের ধোঁয়া, বিলবোর্ডের হাসি, অফিসের ভেজাল সৌজন্য, পুলিশের বাঁশির তীক্ষ্ণ শাসন। শহর আমাকে নিরাপত্তা দেয়? শহর আমাকে দেয় নিয়মের নামে শিরদাঁড়া ভাঙার লাইসেন্স। শহর আমাকে দেয় ভিড়ের ভিতর নিঃসঙ্গতার পচা ঘ্রাণ। তাই আমি এই শহর বেচে দেব, বিনিময়ে কিনব একটা মরুভূমি। লোকে বলবে, “শহর ছাড়বে কেন? মরুভূমি তো তৃষ্ণা!” কিন্তু আমি সেই তৃষ্ণাই চাই, কারণ মরুভূমির তৃষ্ণা সত্যি, আর শহরের জল মিথ্যে। শহরের প্রতিটি গ্লাসে থাকে অভিনয়ের চিনি, প্রতিটি হাসিতে থাকে ভাড়াটে আলো।
সবশেষে, আমি আমার সঞ্চিত সুখও বিলিয়ে দিতে চাই। কারণ সুখ এখানে আসলে রাষ্ট্রের অনুমোদিত ঘুমের ওষুধ। সুখ মানুষকে নরম করে, চুপ করায়, ভুলিয়ে দেয় যে তার শিরায় রক্ত নয়—ঋণের কাগজ বইছে। আমি চাই একমুঠো খাঁটি কষ্ট কিনতে, যে কষ্টের ভিতর কোনো সান্ত্বনার মিথ্যে বাক্য থাকবে না, কোনো ধর্মীয় টেপরেকর্ড বাজবে না, কোনো “সব ঠিক হয়ে যাবে” নামের প্রতারণা থাকবে না। কষ্ট আমাকে পোড়াক, কষ্ট আমাকে ভাঙুক, কারণ কষ্টই মানুষকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
এই পৃথিবীতে যারা ঠকে না, তারা একদিন ঠকায়। আর আমি ঠকাতে চাই না। আমি শুধু চাই একবার—মাত্র একবার—নিজের বুকের উপর ঠকার দাগটা ইচ্ছা করে বসাতে, যেন আমি বলতে পারি: আমি পালাইনি, আমি জেনেশুনেই নেমেছি আগুনে। আমি জেনেশুনেই হারতে চেয়েছি, কারণ জয়ের ভেতরে থাকে ভণ্ডামি, আর হারের ভেতরে থাকে রক্তের মতো সত্য।
তাই আমি চিৎকার করে বলতে চাই—আমি হারাতে চাই, আমি নিঃস্ব হতে চাই, আমি নিজের সমস্ত স্বপ্নকে নিলামে তুলে দিতে চাই। কারণ জীবনে অন্তত একবার, আমি চাই আমার শরীর আর আত্মা বুঝে নিক—ঠকাও একটা স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতার স্বাদ নিতে গিয়েই আমি বলি—আমি, আমিও ঠকতে চাই।
আপনার কবিতা পাঠান - kobiyal.com@gmail.com
Follow Now Our Google News
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ’র কাব্যগ্রন্থ, গল্প ও উপন্যাস
লেখক সংক্ষেপ:
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ। জন্ম ৪ মার্চ ১৯৯৯। শব্দের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নীরব যাত্রার নাম এই তরুণ কবি। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন। সাহিত্য ও সমাজচিন্তার এই দ্বৈত পথচলা তাঁর ভাবনায় তৈরি করেছে আলাদা এক দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখালেখি ও বইপড়া তাঁর কাছে শুধু অভ্যাস নয়, এক ধরনের আত্মরক্ষা। একা ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন; নিঃসঙ্গতার ভেতরেই তিনি খুঁজে পান ভাষার অন্তরঙ্গতা। একসময় অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল, কিন্তু জীবনের ভিন্ন মোড় তাকে নিয়ে এসেছে শব্দের মঞ্চে।
অন্যের অহেতুক আলোচনা তাঁর অপছন্দ। হয়তো সেই কারণেই তাঁর লেখায় অপ্রয়োজনীয় কোলাহল নেই; আছে সংযত অনুভব, ব্যক্তিগত স্বর, আর নীরব অথচ দৃঢ় অবস্থান।
কবিয়াল
কবিয়াল’এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখা ও লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত কবিয়াল’র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কবিয়াল কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। কবিয়াল’এ প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন